Home » হিংসার ভোট বঙ্গ জুড়ে,পঞ্চায়েত নির্বাচনে রক্তগঙ্গা

হিংসার ভোট বঙ্গ জুড়ে,পঞ্চায়েত নির্বাচনে রক্তগঙ্গা

সময় কলকাতা ডেস্ক,৮ জুলাই : হিংসার ভোট, অশান্তির ভোট, বাতাসে ছড়িয়েছে মৃত্যুর ঘ্রান।  পঞ্চায়েত নির্বাচনে একের পর এক  প্রাণ ঝরে পড়েছে বঙ্গ জুড়ে। বেলাগাম হিংসার আবহে সম্পন্ন হয়েছে ২০২৩ সালের পঞ্চায়েত নির্বাচন। হিংসার ভোট পর্ব মেটার আগে অবস্থান পাল্টেছে নির্বাচন কমিশন। যিনি কেন্দ্রীয় বাহিনীকে ছাড়াই শান্তিতে ভোট করানোর বিষয়ে আত্মবিশ্বাসী ছিলেন  তিনি হিংসার ভোট মেটার আগেই ঢাল করেছেন কেন্দ্রীয় বাহিনীকে।নির্বাচনের  প্রায় শেষ লগ্নে এসে রাজ্য নির্বাচন কমিশনার  রাজীব সিনহা জানিয়েছেন, যত সংখ্যক কেন্দ্রীয় বাহিনী আসার কথা ছিল তা পাওয়া যায় নি। তিনি নিশানায় রেখেছেন কেন্দ্রীয় বাহিনীকে।  সন্ত্রাস ও হিংসা দমনে ব্যর্থতা ছিল ২০২৩ সালের পঞ্চায়েত নির্বাচনের  চালচিত্র। ভোট লুঠ, ব্যালট বাক্স নষ্ট করা, ভোটারদের ভীতি প্রদর্শনের পাশাপাশি সকাল থেকেই প্রাণহানির খবর  এসেছে তামাম বঙ্গ থেকে। সবচেয়ে অশান্ত ছিল  মুর্শিদাবাদ।সকালেই খড়গ্রামে খুন হয়ে যান তৃণমূল সমর্থক। নিহতের নাম সত্তরউদ্দিন শেখ। তাঁর ছেলে আবদুল্লা শেখ, কংগ্রেস কর্মী ফুলচাঁদ শেখ খুনের অন্যতম অভিযুক্ত। খুনের বদলা খুনের অভিযোগ তোলে নিহতের পরিবার। খড়গ্রাম থেকেই শুরু হয় মৃত্যুর মিছিল যা ক্রমশ দীর্ঘতর হয়েছে আর ছড়িয়ে পড়েছে বঙ্গ জুড়ে । তবে হিংসার ভোট সবচেয়ে ডানা ছড়ায় মুর্শিদাবাদে।মৃত্যুর মিছিল যেখান থেকে শুরু হয়েছিল যেখান থেকে কার্যত নতুন করে দফায় দফায় মৃত্যু মিছিল পরিক্রমা করেছে। গোলা গুলি, বোমাবাজি, ভোটলুঠ, ছাপ্পা, ভোটারদের ভয় দেখানো কোনও কিছুই বাদ ছিল না আর এরমাঝেই ঘন্টায় ঘন্টায় এসেছ মৃত্যুর খবর। সন্ধ্যের পরেও মুশিদাবাদ থেকে আসে গুলিবিদ্ধ হওয়ার খবর।

এক দফার পঞ্চায়েত নির্বাচনের ঠিক এক মাস আগে ভোটের দামামা বেজে ওঠার পরে মনোনয়ন পর্ব জুড়ে ছিল হিংসা ও সন্ত্রাস।  হিংসার ভোট শুরু হওয়ার আগেই বলি হয়েছেন একের পর একে রাজনৈতিক কর্মী। ভোটের দিন ছবিটা আরও ভয়ঙ্কর হল। সন্ধ্যে হতে না হতেই  ঝরে পড়ে ১৬ টি প্রাণ। খড়গ্রাম-রেজিনগর-মানিকচক-চাপড়া, বাসন্তী, কাটোয়ায় খুন হলেন ১০ তৃণমূল কর্মী। লালগোলা-আউশগ্রামে সিপিএম, নওদা ও ইসলামপুরে খুন হন কংগ্রেস কর্মী,  খুন হন দুই বিজেপি কর্মী যার মধ্যে কোচবিহারের ফলিমারিতে খুন হন বিজেপির পোলিং এজেন্ট।

ভোটের দিন সকালে মালদার মানিকচকে ভোটে প্রাণ হারান এক তৃণমূল কর্মী।গোপালপুর গ্রাম পঞ্চায়েতের বালুটোলা গ্রামে তৃণমূল কর্মীকে গুলি করে, বোমা মেরে খুনের অভিযোগ ওঠে। নিহত শেখ মালেক তৃণমূলের অঞ্চল সভাপতির আত্মীয়। ভোট শুরুর আগে সকাল থেকে তৃণমূল-কংগ্রেস সংঘর্ষে বোমাবাজি শুরু হয়। গুলিও চলে বলে অভিযোগ। উভয়পক্ষের একাধিক আহত হন।

রেজিনগরে খুন হয়ে যান তৃণমূল কর্মী। রেজিনগরের ঝিকরায়, ইয়াসিন শেখ এক তৃণমূল কর্মীকে বোমা মেরে খুনের অভিযোগ উঠল কংগ্রেসের বিরুদ্ধে।  নিহতের পরিবারের অভিযোগ , রাত ১টা নাগাদ বাড়ির সামনেই তাঁকে লক্ষ্য করে বোমা মারা হয়।

লালগোলায় ভোট-সংঘর্ষে খুন সিপিএম সমর্থক। মৃতের নাম রওশন আলি। অভিযোগ, লালগোলার ময়া ছাতিয়ানি প্রাইমারি স্কুলের বাইরে সংঘর্ষে জড়ান তৃণমূল ও কংগ্রেস কর্মীরা। কংগ্রেস কর্মীদের বাঁচাতে গিয়ে গুরুতর জখম হন সিপিএম কর্মী রওশন আলি। মুর্শিদাবাদ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে তাঁকে মৃত বলে ঘোষণা করেন চিকিৎসকরা।

বেলা বাড়তে থাকলে মৃত্যুর সংবাদ আসতে থাকে রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে। দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার বাসন্তী আবার রক্তস্নাত হয়।বাসন্তীতে মৃত্যু হয় তৃণমূল কংগ্রেস প্রার্থীর আত্মীয়র।বাসন্তীর ফুলমালঞ্চ গ্রাম পঞ্চায়েতে ৯২ নম্বর বুথের ভিতরে বোমাবাজি। ফুলমালঞ্চ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভোট দিতে এসে বোমার আঘাতে মৃত্যু হল তৃণমূল প্রার্থী রফিয়া ওস্তাগরের দেওর আনিসুর ওস্তাগরের। তৃণমূলের অভ্যন্তরীণ  দ্বন্দ্বের    ফলশ্রুতি এই মৃত্যু বলে অভিযোগ ওঠে। এখানে বিক্ষুব্ধ তৃণমূল ও তৃণমূলের মধ্যে বেশ কিছুদিন ধরে সংঘর্ষ জারি ছিল।

কাটোয়ায় খুন হয়ে যান তৃণমূল কর্মী গৌতম রায় খুন। সিপিএমের বিরুদ্ধে খুনের অভিযোগ । অভিযোগ কাটোয়ার সাংগঠনিক জেলার তৃণমূল সভাপতি রবীন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায়ের। বুথের বাইরে বার করে এনে পিটিয়ে খুনের অভিযোগ ওঠে।

নওদার মধুপুর গ্রাম পঞ্চায়েতের গঙ্গাধারি গ্রামে কংগ্রেস কর্মীকে খুনের অভিযোগ ওঠে । মৃতের নাম লিয়াকত শেখ। অভিযোগ, ভোট দিতে যাওয়ার সময় কংগ্রেস কর্মীদের লক্ষ্য করে বোমা ছোড়ে তৃণমূল আশ্রিত দুষ্কৃতীরা। বাকিরা পালিয়ে প্রাণে বাঁচলেও প্রবীণ কংগ্রেস কর্মী লিয়াকত শেখ পালাতে পারেননি। বোমার আঘাতে গুরুতর জখম কংগ্রেস কর্মীকে হাসপাতালে নিয়ে গেলে তাঁর মৃত্যু হয়।

নদীয়াও মৃত্যুর খবর বয়ে নিয়ে আসে দুপুরের আগেই।চাপড়ার কল্যাণদহে কংগ্রেস-তৃণমূল সংঘর্ষে তৃণমূল কর্মীর মৃত্যু। আহত হয় আরও দশ জনের বেশি তৃণমূল কর্মী। তৃণমূলের দাবি, ভোট দিতে যাওয়ার পথে, কংগ্রেসের দুষ্কৃতীরা ধারাল অস্ত্র নিয়ে চড়াও হয়। তৃণমূল কর্মীদের এলোপাথাড়ি কোপানো হয়।

শেষ লগ্নে মুর্শিদাবাদ কে হিংসায় প্রায় টেক্কা দিতে দেখা যায় উত্তর দিনাজপুরকে। এই জেলার চাকুলিয়ায় তৃণমূল প্রার্থীকে কুপিয়ে খুনের অভিযোগ ওঠে।বিদ্যানন্দপুর গ্রাম পঞ্চায়েতের ভেবরা অঞ্চলের ১৯২ নম্বর বুথের প্রার্থী মহম্মদ শাহেনশাকে বুথের বাইরে কংগ্রেসের দুষকৃতীরা তৃণমূল প্রার্থীকে কুপিয়ে খুন করে বলে অভিযোগ তৃণমূলের।

সন্ধ্যে হতে না হতে না হতেই উত্তর দিনাজপুর আবার অশান্ত হয়ে ওঠে। খালি রাজনৈতিক দল আলাদা। গোয়ালপোখোরে  মৃত জামিরুদ্দিন নামে কংগ্রেসের কর্মীর মৃত্যু হয় বোমার আঘাতে।।

নদীয়াতে কেন্দ্রীয় বাহিনী গুলি চালালেও ভোট-পর্ব চলার সময় আধা সামরিক বাহিনীকে আসতে দেখা যায়। ভোট পর্ব শেষ হওয়ার কিছু আগে কেন্দ্রীয় বাহিনীর আগমন নিয়ে স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন উঠেছে বিভিন্ন রাজনৈতিক মহল থেকে। আর এরমধ্যে বিভিন্ন ধরনের এমন ঘটনা যার ব্যাখ্যা সাংবিধানিকভাবে মেলেনা। সবকিছুকেই ছাপিয়ে গিয়েছে হিংসা।।

 

About Post Author