Home » সিঙ্গাবাদ জমিদারবাড়িতে আজও বন্দুকের আওয়াজে ঘোষিত হয় দেবীর আগমন বার্তা

সিঙ্গাবাদ জমিদারবাড়িতে আজও বন্দুকের আওয়াজে ঘোষিত হয় দেবীর আগমন বার্তা

সময় কলকাতা ডেস্ক, ১২ অক্টোবর : দুর্গাপুজোর রীতি দীর্ঘদিনের। কথিত আছে,ত্রেতাযুগে স্বয়ং ভগবান রামচন্দ্র রাবণ বধের জন্য অকালে এই পূজা করেছিলেন। আর কলিযুগে আনুমানিক ৫৪৩ বছর আগে,১৪৮০ সালে,রাজা কংস নারায়ণ এই পুজোর আয়োজন করেন। যদিও অনেক ঐতিহাসিক মনে করেন, কংসনারায়ণ সম্রাট আকবরের আমলে ১৫৮২ খ্রিস্টাব্দের শরৎকালে আধুনিক পদ্ধতিতে উৎসবের আয়োজন করেন।যাই হোক না কেন, বারো ভুঁইয়ার অন্যতম রাজা কংসনারায়নকে আধুনিক সময়ে প্রথম দুর্গাপুজোর প্রচলনকারী বলা হয়। অধুনা বাংলাদেশের রাজশাহীর তাহেরপুরের আয়োজন করা পুজো ও মহাযজ্ঞের রীতিতে নতুন মাত্রা যোগ হয়ে দুর্গাপুজো আজ সর্বজনীন হয়ে উঠেছে। যদিও আবহমান কাল ধরে রয়ে গিয়েছে বনেদী বাড়ির বহু পুজো । রাজা কংস নারায়ণের বহু যুগ পরে মালদার সিঙ্গাবাদে ব্যবসায়ী থেকে জমিদার হয়ে ওঠা অবোধ নারায়ণ রায়ের আমল থেকে চলে আসছে দুর্গাপুজো। এই সিঙ্গাবাদ জমিদারবাড়ির পুজোর গরিমা জড়িয়ে আছে বঙ্গের দুর্গা পূজার ইতিহাসে।

বঙ্গে বিভিন্ন রাজ্য থেকে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন জাতির মানুষ এসেছেন যারা আজ মিশে গিয়েছেন বাঙালিয়ানায়। তাঁদের রক্তে আজ বঙ্গের জলবায়ুর প্রভাব তবুও তাঁরা পূর্বপুরুষের ঐতিহ্য ভোলেন নি । মালদা জেলা জুড়ে দেখতে পাওয়া যাবে বিহার ও উত্তর প্রদেশ থেকে একসময় ব্যবসা ও আর্থিক সমৃদ্ধি খুঁজতে বঙ্গে এসেছিলেন বিভিন্ন ব্রাহ্মণ সম্প্রদায়। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য মৈথিল ব্রাহ্মণ, কনৌজ ব্রাহ্মণ ও ভূমিহার ব্রাক্ষণ যারা এখন আর বাঙালিদের পৃথক নন। এরকমই এক ভূমিহার ব্রাহ্মণ ১৮০০ খ্রিস্টাব্দের কিছু আগের ডালের ব্যবসা করতে মালদার একটি ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত আইহো- বুলবুলচন্ডী-হবিবপুর অঞ্চলের প্রান্তিক এলাকা সিঙ্গাবাদের তিলাসন এলাকায় আসেন। তাঁর নাম অবোধ নারায়ণ রায়।তাঁর ব্যবসার সামগ্রী ছিল ডাল যা নৌকা করে দক্ষিণবঙ্গ ও পূর্ববঙ্গে যেত। ডালের ব্যবসায় সমৃদ্ধি লাভ করে তিনি কিছুদিনের মধ্যে লক্ষ লক্ষ বিঘার জমিদারি কিনে নেন। হয়ে ওঠেন এলাকার সার্বভৌম জমিদার। পরিবারের ইতিহাস বলে, ১৮০১ সালে জমিদার অবোধ নারায়ণ প্রথমবার সিঙ্গাবাদে দুর্গা পুজোর আয়োজন করেন। দেশ বিভাগের পরে জমিদারি প্রথা তো বিলোপ হয়ই , পাশাপাশি সীমান্তবর্তী এলাকার জমিদার অবোধ নারায়ণ রায়ের বংশধরেরা বড় ক্ষতির সম্মুখীন হন। দেশভাগে বংশের পাঁচভাগের চারভাগ সম্পত্তি বাংলাদেশে পড়ে যায়।তবুও সিঙ্গাবাদে যা ছিল তা কম নয়। ফলে সিঙ্গাবাদ জমিদার বংশের গৌরব আজও যেন পুরোপুরি অস্তমিত নয়।রেওয়াজ, আদব কায়দা রয়ে গিয়েছে আজও।সপ্তমীর দিন বন্দুকের গুলি শূন্যে চালিয়ে যে পুজো এতদিন হয়ে এসেছে জমিদার অবোধ নারায়ণ রায়ের বংশধরেরা আজও তা বজায় রেখেছেন। জমিদারবাড়ির নাটমহলের মন্দিরে পুজোর পরম্পরা অক্ষুন্ন আজও মালদার সিঙ্গাবাদে।আজও গানফায়ারে দেবীর আগমন বার্তা ঘোষণা করা হয়, পুজোয় রীতিমত পত্র সহকারে ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে আমন্ত্রণ জানানো হয়, যারা আমন্ত্রিত নন এরকম শতাধিক মানুষকে আন্তরিক আতিথেয়তায় পুজোর প্রসাদ- অন্ন দিয়ে আপন করে নেওয়া হয়।

সিঙ্গাবাদ জমিদার বাড়ির পুজোয় আড়ম্বর নেই। ষষ্ঠী থেকে দশমীর প্রতিমা নিরঞ্জন পর্যন্ত পুজো চলে সাবেকি প্রথা মেনে।সপ্তমীতে কলাবউ, কুলদেবী, দুর্গাপুজোর ঘট ভরে আনা হয় পুনর্ভবা নদী থেকে। পুজো বনেদী হলেও এই পুজো চরিত্রগতভাবে কিছুটা হলেও সর্বজনীন কারণ গ্রামের সব মানুষ ভাবেন, ভেবে এসেছেন যে দুর্গা পুজো শুধু জমিদারবাড়ির নয়,তাঁদেরও। সিঙ্গাবাদে যে পুজো দেখতে চেয়েছিলেন স্বয়ং নেতাজী সুভাষচন্দ্র বোস, সেই জমিদার বাড়ির পুজোর বর্তমান প্রজন্মের প্রধান আয়োজক রাকেশ রায় বা গ্রামবাসীদের কাছে পাপ্পু বা পাপ্পু দার মত গ্রামের সাধারণ মানুষদের প্রত্যেকেই পুজোর দিন গুলিতে জমিদার বাড়িরই যেন সদস্য হয়ে ওঠেন। পুজো হয়ে ওঠে সকলের।

দশমীতে পুনর্ভবা নদীতে দেবীর নিরঞ্জন হলেও পুজোর রেশ থেকে যায় কারণ জাঁকজমকহীন হলেও এই পুজোর পাঁচদিনের আনন্দ বাকি একটি বছর অপেক্ষা করার রসদ দিয়ে যায়। সিঙ্গাবাদের তিলাসনের জমিদারবাড়ির সপ্তমীর বন্দুকের শব্দের অপেক্ষা করতে তাই বছরভর কান পেতে থাকেন গ্রামবাসীরা।

বঙ্গের দুর্গাপুজোর আবহে গেটওয়ে অফ নর্থ বেঙ্গল মালদার অন্যতম প্রাচীন দুর্গাপুজোর সাথে জড়িয়ে আছে ইতিহাস। জড়িয়ে আছে কিছু সাবেকি রীতিনীতি। বাঙালির দুর্গোৎসবে অনন্য মাত্রা বাহী সিঙ্গাবাদের জমিদার রায়বাড়ির পুজো।।

About Post Author