Home » অভিজাত্য আজও জড়িয়ে আছে কাটোয়ার মুহুরীবাড়ির পুজোয়

অভিজাত্য আজও জড়িয়ে আছে কাটোয়ার মুহুরীবাড়ির পুজোয়

সময় কলকাতা ডেস্ক, ১২ অক্টোবর :”- ওঁ দেবি প্রপন্নার্ত্তি হরে প্রসীদ প্রসীদ মাতর্জ্জগতো ’খিলস্য।প্রসীদ বিশ্বেশ্বরী পাহি বিশ্বং ত্বমীশ্বরী দেবি চরাচরস্য।।”- মাতৃপক্ষে সর্ববিপত্তিনাশক মা আসছেন। বাঙালির প্রাণের উৎসব দুর্গাপুজো। বাঙালির কাছে দুর্গাপুজো আসে শরৎকালের নীল আকাশে সোনা রঙের রোদ হয়ে, আসে কাশফুল আর শিউলি ফুলের মধ্যে দিয়ে, আসে ঢাকের বাদ্যির মধ্যে দিয়ে, আসে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের কণ্ঠে মহালয়ার ভোরে। ত্রেতাযুগে শ্রীরামচন্দ্র দুর্গাপুজো করেছিলেন আর কলিযুগে দুর্গা পুজোর চল রাজা কংসনারায়ণের সময় থেকে ১৪৮৭ বঙ্গাব্দ বা মতান্তরে ১৫৮০ বঙ্গাব্দ থেকে। ধীরে ধীরে ১৭৯৩ সালে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত প্রবর্তন হওয়ার পরে প্রায় প্রতিটি জমিদার বাড়ির রেওয়াজ হয়ে ওঠে দুর্গাপুজো । মোগল আমলে জমিদাররা অভিজাত বর্গের অংশ ছিলেন এবং সম্রাট আকবর তাঁদের মনসবদারি দিয়েছিলেন। চিরস্থায়ী বন্দোবস্তর পরে জমিদাররা সর্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী হয়ে ওঠেন। যে দুর্গাপুজো চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের পরবর্তী সময় জমিদার বাড়িতে শরৎকালে ধুমধামের সঙ্গে পালিত হত, কিছু কিছু অভিজাত শ্রেণীর সমৃদ্ধশালী পরিবারের আভিজাত্যের অঙ্গ হিসেবে তা দেখা দিয়েছিল মোগল আমলেই। এরকমই দুর্গাপুজো হয়ে আসছে কাটোয়ার এরকম এক বনেদি বাড়িতে , যা কাটোয়া তো অবশ্যই, পূর্ব বর্ধমান তথা অখণ্ড বঙ্গের অন্যতম প্রাচীন পুজো।

প্রায় সাড়ে তিনশো থেকে চারশো বছর আগের কথা।চৈতন্য-উত্তর অখণ্ড বঙ্গ যখন বৈষ্ণবমতের জোয়ারে ভাসছে তখন রামধন বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর মাকে নিয়ে কাটোয়া শহরে আসেন। তিনি ব্যবসার মাধ্যমে আর্থিক সমৃদ্ধি লাভ করেন এবং প্রভূত ভু সম্পত্তির অধিকারী হয়ে ওঠেন । রামধন বন্দ্যোপাধ্যায় প্রথম নাটমন্দির নির্মাণ করে দুর্গা পুজোর আয়োজন করেন। বন্দ্যোপাধ্যায় মুহুরী বংশের বর্তমান প্রজন্মের ভট্টাচার্য বংশের দাবি, রামধন বন্দ্যোপাধ্যায় ৩৫৮ বছর আগে পুজোর সূচনা  করেন। এই ব্রাক্ষণ বংশের সমৃদ্ধি চূড়ান্ত বৃদ্ধি পায় তাঁর বংশধর রামমোহন মুহুরীর আমলে। মুর্শিদাবাদের নবাব আলীবর্দী খাঁ-র কাছে তিনি মুহুরী উপাধি পান। এসময় তাঁরা কার্যত জায়গিরদার হয়ে ওঠেন এবং অতি অল্প সময়ে আরও প্রতিপত্তি বাড়ে। তাঁরা অখণ্ড বঙ্গ জুড়ে ৫২ টি মহালের অধিকারী হয়ে ওঠেন।

কালের সাথে সাথে জমিদারী প্রথা লোপ পেয়েছে। এখন মুহুরী পরিবারের কন্যাপক্ষ ভট্টাচার্যরা মাতৃপক্ষে মাতৃপুজোর আয়োজন করে থাকেন। এখন জমিদারী আয় বা দেবোত্তর সম্পত্তি না থাকায় নিজেরাই বর্তমান ব্যক্তিগত উপার্জন থেকে পুজোর আয়োজন করে থাকেন কাটোয়ার মুহুরীবাড়ির পুজোর আয়োজক ও বর্তমান ভট্টাচার্য বাড়ি।

বাঙালির বারো মাসে তেরো পার্বণ আর বন্দ্যোপাধ্যায়- বাবু -মুহুরী বাড়ির পুজোর বর্তমান প্রজন্ম ভট্টাচার্যরা জানালেন, সারা বছর ধরে তাঁদের পুজো চলতে থাকে। পুজোপার্বণ লেগেই থাকে এই বনেদি বাড়িতে যার মধ্যে সবচেয়ে বড় পুজো বলাবাহুল্য দুর্গা আরাধনা।

এখানে পুজোর বেশ কিছু বিশেষত্ব আছে।আজও বেয়ারারা মাকে বহন করে আনে ।এখানে আজও বলির প্রথা চালু আছে। পাঁঠা ও নিরামিষ উভয় ধরণের বলি চলে পুজোর প্রতিদিন। শাস্ত্রীয় আচার মেনে হয় পুজো।

বঙ্গের অন্যতম প্রাচীন পরিবারেরা তাঁদের বনেদিয়ানার যে দিক গুলি ধরে রেখেছে তার মধ্যে অন্যতম দুর্গাপুজো।সেভাবেই পুজোর আদিকাল থেকে পরম্পরা মেনে পুজোর বর্তমান সময় পর্যন্ত একই রীতিনীতি মেনে পুজো হয়ে চলেছে কাটোয়ার সম্রান্ত বাবুমুহুরী পরিবারে। ঐতিহ্য নিরন্তর, বহমান।

মর্যাদা আর আভিজাত্য মেনে বিভিন্ন সর্বজনীন পুজোর সাড়ম্বরের মধ্যে আপন মহিমায় ৩৫৮ বছর ধরে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে কাটোয়ার প্রাচীনতম এই পুজো। হাতিশালে হাতি নেই, ঘোড়াশালের ঘোড়াও নেই ,তবুও দুর্গাপুজোয় আজও অম্লান রয়েছে ঐতিহ্য আর চিরাচরিত বনেদিয়ানার সৌরভ।।

About Post Author