সময় কলকাতা ডেস্ক, ২৪ অক্টোবর : নারীমুক্তি নিয়ে কবি মল্লিকা সেনগুপ্ত লিখে গিয়েছেন “আশ্বিনের এক প্রাগৈতিহাসিক সকালে / শ্রীরামচন্দ্র যে দুর্গার বোধন করেছিলেন /স্বর্গের দেবপুরুষগণ যুদ্ধে পরাজিত হয়ে যে রণদেবীকে অসুর নিধনে পাঠিয়েছিলেন।সেই দুর্গাই একুশ শতকে নারীর ক্ষমতায়ন।”
শিবের কোঠার দুর্গাপুজো ও নারীমুক্তি
দুর্গাপুজোয় নারীর অংশগ্রহণ ও পুজোর আয়োজন আজ দুর্গাপুজোকে যেমন করে তুলেছে অন্য মাত্রাবাহী, তেমনই নারীদের অধিকারকে পুজোয় অনেক পরিবার বহুদিন ধরে প্রাধান্য দিয়ে দুর্গাপুজোকে সামাজিক আন্দোলনের রূপ দেওয়ার পথে এগিয়েছে । নারীমুক্তি ও সামাজিক বিপ্লব নতুন দিশা পেয়েছে কিছু পারিবারিক পুজোয়। আমরা এমনই এক দুর্গাপুজোর আলোচনা করব যা ইতিহাসখ্যাত এবং বহুপ্রাচীন তবুও পুজোর আয়োজনের মধ্যে রয়েছে নারীমুক্তির সৌরভ। প্রতিবেদনে আলোচনা করা হবে -নারীমুক্তির সুবাসে ও সর্ব-আঙ্গিকে কেন অনন্য বারাসাত শিবের কোঠার ইতিহাসখ্যাত চট্টোপাধ্যায় পরিবারের দুর্গাপুজোর ছবি।
“খণ্ড খণ্ড মানচিত্রে বাংলা বিহার রাজস্থানে
সাধারণী নমস্তুতে!” বারাসাতে শিবের কোঠার চট্টোপাধ্যায় বাড়ির রাজসেনাপতি শঙ্করের সূচনা করা দুর্গা পুজো সম্পর্কে এই মন্ত্রোচ্চারণ ছাড়া এবাড়ির পুজোর যেন আলোচনা করা অসম্ভব। এই পুজোর পরতে পরতে ইতিহাস। আর এই বাড়ির চারশোর বেশি বছর ধরে চলা দুর্গাপুজোর ইতিহাস জুড়ে বারোভূঁইয়া, প্রতাপাদিত্য, মানসিংহ, মোগল আমল, জাহাঙ্গীর, মানসিংহ, যোধাবাঈয়ের নাম এসে পড়ে।ইতিহাস নিশ্চিত করে বলে না যোধাবাঈয়ের প্রকৃত পরিচয়, যদিও মোগল রাজমহিষীর নাম এই বাড়ির পুজোর সঙ্গে অঙ্গাঙ্গী ভাবে জড়িয়ে।আর সেই আলো আঁধারির ইতিহাস থেকে এক স্বপ্নের উড়ান চট্টোপাধ্যায় বাড়ির নারীদের যা ভারতীয় সমাজের প্রেক্ষাপটে অকল্পনীয়। এই বাড়ির সাধারণীরা হয়ে ওঠেন অ-সাধারণী। তাঁরা শঙ্কর চট্টোপাধ্যায়ের সূচনা করা দুর্গাপুজোর ইতিহাস ও গৌরবের কথা বলেন আর বলেন তাঁরা নিমিত্ত মাত্র জ্ঞান করেন। বিনয়ের সঙ্গে তাঁরা বলেন,বংশে বর্তমান প্রজন্মের পুরুষ না থাকায় কন্যাসন্তান হিসেবে দুর্গাপুজোর আয়োজন ও জোগাড়যন্ত্র করেন। তাঁরা একবারও ঘুনাক্ষরে বলেন না যে, পুজো তাঁদের বাড়ির বরং তাঁরা মনে করেন চট্টোপাধ্যায় বাড়ির দুর্গাপুজো এলাকার সকলের, বারাসাতের ঘনবসতিপূর্ণ দক্ষিণপাড়ার এক বিরাট অংশের। অথচ পুজোর মুল আয়োজন ও প্রাণকেন্দ্রে আছেন বাড়ির মেয়েরা। তাঁরা পুরুষদের স্থান করে দেন পুজোর আয়োজনে অথচ নারীরাই এই পুজোর চালিকা-শক্তি।

তবে এটুকুই নারীদের ক্ষমতায়নের শেষ কথা নয়। এর চেয়ে গভীর আরও কিছু কথা রয়েছে যা চট্টোপাধ্যায়ের বাড়ির পুজোকে অনন্য করে তুলেছে। এখানে সিঁদুর খেলা হয় যখন, সেই ছবি অন্য মাত্রাবাহী। তাৎপর্যপূর্ণভাবে হিন্দু ধর্মের প্রথা অনুযায়ী কেবলমাত্র সধবারা সিঁদুর খেলায় অংশগ্রহণ করে থাকেন, সেই প্রথাকে চট্টোপাধ্যায় বাড়ি এক লহমায় ভেঙে এক সামাজিক নারী আন্দোলনের চেহারা দিয়েছিল দীর্ঘযুগ আগে। শুধু তাই নয়, বেড়া-অঞ্জলি তেও বিধবারা অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ।
যখন নারীশিক্ষা ছিল সীমাবদ্ধ, নারীরা অনেক ক্ষেত্রে ছিল পর্দানসীন তখন থেকেই বিধবাদের সমান অধিকার ও আনন্দযজ্ঞে সমানভাবে অংশ নেওয়ার ছাড়পত্র দিতে শুরু চট্টোপাধ্যায় পরিবার। আর শিবের কোঠার পরিবারের নারীরা সর্বাগ্রে এগিয়ে এসেছিল সেই অচলায়তন ভাঙ্গার দুর্গা হয়ে।তাঁরা আমার দুর্গা, তাঁরাই আমাদের দুর্গা।আজ বিধবাদের সিঁদুর খেলায় অংশ নেওয়া স্বাভাবিক হয়ে উঠেছে আর এখানেই অসামান্য রূপ নিয়েছে ইতিহাসবিশ্রুত এই পুজো। নারীমুক্তি এখানে যেন অকৃত্রিম এবং স্বাভাবিক ।।
শিবের কোঠার দুর্গাপুজো ও নারীমুক্তি #শিবের কোঠার দুর্গাপুজো ও নারীমুক্তি


More Stories
হর্ষ-বিষাদে পালিত ঈদ-উল-আযহা
বাংলা নববর্ষের ইতিহাস
চিকিৎসকের বঙ্গসংস্কৃতির উদযাপন নববর্ষে