সময় কলকাতা ডেস্ক:- বুধবার আমেরিকায় যাচ্ছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। দু’দিনের সফরে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে সাক্ষাৎও করবেন তিনি। অবৈধবাসী ভারতীয়দের ফেরত পাঠানো, ভারতের উপর শুল্ক চাপানো নিয়ে ট্রাম্পের হুমকি— এই আবহে মোদি সফর খুবই গুরুত্বপূর্ণ। মোদি-ট্রাম্পের বন্ধুত্বের প্রসঙ্গ টেনে এসে ভারতীয়দের বিতারণ, শুল্ক হুমকি নিয়ে বিরোধীদের নানান অভিযোগের মাঝেই ট্রাম্প-মোদি বন্ধুত্বে ভারতের লাভ সীমাহীন এবং সেটা একান্তই প্রধানমন্ত্রীর কৃতিত্ব, তা তুলে ধরাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মুখ রক্ষাই এখন চাপ নরেন্দ্র মোদির কাছে
মার্কিন মুলুকের নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আমন্ত্রণে আমেরিকা সফরে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। স্বাভাবিকভাবেই সফরের আগে থেকেই দিল্লির সাউথ ব্লকে বিদেশ মন্ত্রকের আমেরিকা ডেস্কের কর্তাব্যক্তিরা প্রধানমন্ত্রীর মার্কিন সফর নিয়ে চূড়ান্ত ব্যস্ততার মধ্যে। তাঁদের সামনে মস্ত বড় চ্যালেঞ্জ হল নরেন্দ্র মোদির মার্কিন সফরকে দেশে-বিদেশে এমন ভাবে তুলে ধরা যাতে বোঝানো যায় যে ট্রাম্প-মোদি বন্ধুত্বে ভারতের লাভ সীমাহীন এবং সেটা একান্তই প্রধানমন্ত্রীর কৃতিত্ব।
গত ২০ জানুয়ারি আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হিসাবে দ্বিতীয় মেয়াদ শুরু হয়েছে ট্রাম্পের। সেখানে মোদির প্রতিনিধি হিসাবে হাজির ছিলেন বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর ।গত ৭ নভেম্বর আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ট্রাম্পের জয়ের পরেই তাঁকে ফোন করে অভিনন্দন জানিয়েছিলেন মোদি। গত ২৭ জানুয়ারি ট্রাম্প ফোন করেছিলেন মোদিকে। দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের নানা দিক নিয়ে দু’জনের দীর্ঘ আলোচনা হয়েছিল। পরের দিন ট্রাম্প জানিয়েছিলেন, ফেব্রুয়ারিতেই মোদির সঙ্গে তাঁর বৈঠক হতে পারে। কবে মোদি আমেরিকায় যেতে পারেন, তা নিয়ে জল্পনা চলছিল। তবে গত সপ্তাহেই আনুষ্ঠানিক ভাবে মোদির সূচি ঘোষণা করে ভারতের বিদেশ মন্ত্রক।
তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল
মোদির সঙ্গে ট্রাম্পের ব্যক্তিগত স্তরেও সম্পর্ক বেশ মসৃণ। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পরিস্থিতি বদলেছে। দ্বিতীয় বার ক্ষমতায় আসার আগে থেকেই ট্রাম্প বেশ কিছু নীতিগত পরিবর্তনের কথা বলতে শুরু করেন। কুর্সিতে বসার পর পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেন ট্রাম্প। তিনি ঘোষণা করেন, আমেরিকার স্বার্থকেই অগ্রাধিকার দিয়ে দেখা হবে। তার পর ভাবা হবে অন্য দেশের কথা! সেই লক্ষ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই বেশ কিছু পদক্ষেপও করতে শুরু করেছে ট্রাম্প সরকার। তারমধ্যেই উল্লেখ্যযোগ্য কিছু সিদ্ধান্ত হল, আমেরিকায় থাকা অবৈধবাসী ভারতীয়দের ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া ইতিমধ্যেই শুরু করেছে ট্রাম্প প্রশাসন।যেমন কথা, তেমনই কাজ। প্রথম দফায় ১০৪ জন ভারতীয়কে আমেরিকা থেকে ফেরত পাঠানো হয়েছে।
বিদেশসচিবের দাবি
তবে ভারতের বিদেশসচিবের দাবি, ট্রাম্প প্রশাসন আরও ৪৮৭ জন অবৈধবাসী ভারতীয়কে ভারতে পাঠানোর পথে হাঁটছে।এছাড়াও আমেরিকার পড়শি মেক্সিকো, কানাডা এবং আমেরিকার বৃহত্তম বাণিজ্য সহযোগী চিনের বিরুদ্ধে নতুন শুল্কনীতি প্রয়োগের সিদ্ধান্তের পর পরবর্তী নিশানা কারা হবে, তা নিয়ে ইতিমধ্যেই জল্পনা তৈরি হয়েছে বিশ্ব জুড়ে। তাৎপর্যপূর্ণ ভাবে সেই তালিকায় রয়েছে ভারতের নামও। কারণ, আমেরিকার নতুন প্রেসিডেন্ট যে দেশগুলির পণ্যের উপর বাড়তি শুল্ক বসিয়েছেন তাদের সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতি রয়েছে ওয়াশিংটনের। ঘটনাচক্রে, ভারতের ক্ষেত্রেও রয়েছে ঘাটতি। এই পরিস্থিতিতে বন্ধু ট্রাম্পের আমন্ত্রণে আমেরিকা সফরে মোদি। আসলে মোদি এমন সময়ে আমেরিকা যাচ্ছেন, যখন এই সফরের আমন্ত্রণ তাঁর প্রত্যাখ্যান করার কথা।
ট্রাম্প প্রশাসন পাত্তা দেয়নি ভারতের বিদেশ মন্ত্রককে
অন্তত অনুগামীরা যখন তাঁকে ‘বিশ্বগুরু’ দাবি করছে, তখন ভারতকে আমেরিকার এত অপমানের পর প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে সেটাই কাঙ্ক্ষিত ছিল। তার আগে উচিত ছিল মার্কিন সামরিক বিমানটিকে অমৃতসরের মাটিতে নামতে না দিয়ে ফেরত পাঠিয়ে দেওয়া। এমনটাই করেছিলেন কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট। ট্রাম্প প্রশাসন বেআইনি অভিবাসীদের বিমানে তুলে দিলে সে দেশের প্রেসিডেন্ট সেটি নামতে দেননি। সাফ জানিয়ে দেন, তাঁর দেশের নাগরিকদের সম্মানের সঙ্গে ফেরত পাঠাতে হবে। কলম্বিয়া থেকে বিমান পাঠিয়ে অভিবাসীদের ফেরত আনেন তিনি। স্বাভাবিকভাবেই ভারতের অভিবাসীদের ক্ষেত্রেও তেমনই হওয়ার কথা ছিল।
গত মাসে ট্রাম্পের শপথ অনুষ্ঠানে যোগ দিতে গিয়ে বিদেশমন্ত্রী জয়শঙ্কর মার্কিন কর্তাদের জানিয়ে এসেছিলেন, বেআইনি ভারতীয় অভিবাসীদের ভারত সরকার দফায় দফায় ফিরিয়ে নেবে। বিষয়টি নিয়ে হইচই না করতেও অনুরোধ করেছিলেন। কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসন ভারতের বিদেশমন্ত্রীর অনুরোধে কর্ণপাত করেনি। হাতে-পায়ে বেড়ি পরিয়ে মিলিটারি বিমানে তুলে দেয় ১০৪ জন অভিবাসীকে। তাঁদের চল্লিশ ঘণ্টার দুঃসহ বিমানযাত্রার কথা এখন দেশবাসীর জানা হয়ে গিয়েছে। তাঁরা আশা করেছিলেন, দেশকে এমন অপমানের জবাব দেবেন প্রধানমন্ত্রী। কিন্তু বিশ্বগুরু মোদি সে পথে হাঁটলেন না।
এখন মুখ রক্ষাই প্রধান লক্ষ্য
মোদি বন্ধু ট্রাম্পের আমন্ত্রণে মার্কিন মুলুক সফর বাতিল করেননি। তবে মোদির কাছে এটা প্রত্যাশিত ছিল না। মোদি প্রমাণ করলেন তিনি কতটা ভীত-সন্ত্রস্ত। এবার প্রশ্ন হল, এত ঘটনার পরেও মোদির ট্রাম্পকে কেন পাশে চাই ? এর নেপথ্যে বেশ কয়েকটি কারণ রয়েছে। এক হল, মোদির গ্লোবাল লিডার হওয়ার স্বপ্ন পূর্ণ করতে ট্রাম্পের স্বীকৃতি, প্রশংসা জরুরি। দ্বিতীয় হল, বাণিজ্যে সুবিধা না দিলে ট্রাম্পও আগের বাইডেন সরকারের মতো সংখ্যালঘুর বিপন্নতা, তাদের উপরে নিপীড়ন, নির্যাতন এবং মানবাধিকার, গণতন্ত্রের মতো স্পর্শকাতর বিষয়ে ভারত সরকারকে প্যাঁচে ফেলতে পারেন। তাই ট্রাম্প ফোঁস করলে যে ভারতের পক্ষে তা ভাল না, বিশ্বগুরু মোদির ইমেজের ক্ষেত্রেও তা ক্ষতিকারক, তা একপ্রকার স্পষ্ট।
হোয়াইট হাউসে ট্রাম্পের প্রত্যাবর্তনে মোদি এবং বিজেপির লাভ নিয়ে সংশয় নেই। বিশেষ করে সংখ্যালঘু নিপীড়ন, মানবাধিকার হরণের মতো ইস্যুতে বাইডেন প্রশাসনের মতো ট্রাম্প প্রশাসন প্রশ্ন তুলবে না। বর্তমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট এসব নিয়ে মাথা ঘামান না। তাঁর কাছে ব্যবসাই শেষ কথা। আর মাথা ঘামান আমেরিকার শ্রেষ্ঠত্ব নিয়ে। তাই বিশ্বগুরুর তকমা পেতে মরিয়া মোদি খানিকটা মাথা ঝুঁকিয়েই আমেরিকা সফরে।


More Stories
গ্রেফতার অজি ক্রিকেট তারকা ওয়ার্ণার
মনসুরেহ খোজাস্তেহ বাঘেরজাদেহ : মার্কিন -ইজরায়েল হানায় খামেনির আহত স্ত্রীর মৃত্যু
আয়াতুল্লাহ খামেনি কি নিহত?