Home » বেগারি প্রথার প্রতিবাদে গুলিতে প্রাণ দিয়েছিলেন পাঁচজন বনবস্তিবাসী। তাদেরই শহীদ মিনার তৈরীর দাবি ডুয়ার্সে

বেগারি প্রথার প্রতিবাদে গুলিতে প্রাণ দিয়েছিলেন পাঁচজন বনবস্তিবাসী। তাদেরই শহীদ মিনার তৈরীর দাবি ডুয়ার্সে

সময় কলকাতা ডেস্ক:- প্রায় ৫৪ বছর আগের কথা। সালটা ছিল ১৯৭১ যখন এক দিকে পূর্ব পাকিস্তানের শেখ মুজিবর রহমানের ডাকে সাড়া দিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের বলিদানে স্বাধীন হয়েছিল বাংলাদেশ। অন্যদিকে ঠিক সেই সময় ডুয়ার্সের বিভিন্ন বনবস্তি বাসিরা নিজস্ব স্থায়ী বাসস্থানের দাবিতে একত্রিত হয়ে জমি আন্দোলনে নেমেছিলেন। বনবস্তিবাসীরা মহিলা পুরুষ সকলে মিলে একত্রিত হয়ে বনদপ্তর এর বিরুদ্ধে গণআন্দোলনে নেমে পড়েন। শুধুমাত্র যে নিজস্ব জমি দখলের লড়াই তা নয়। তৎকালীন সময়ে বনবস্তি বাসীদের বন বিভাগের কাজে বিনা পারিশ্রমিককে শ্রমদান করতে হত। যাকে প্রচলিত ভাষায় বেগারি বলা হয়।

তাদের উপর হয়ে আসা দীর্ঘদিনের অত্যাচার ও এই বেগারি প্রথা মেনে নিতে না পেরে ১৯ ৬১ সাল থেকেই বস্তিবাসীরা তৎকালীন ফরওয়ার্ড ব্লকের নেতৃত্বে বেগাড়ি প্রথার অবসান ঘটানোর স্বার্থে সুদূর দিল্লিতে পাড়ি দেন। যার মুখ্য নেতৃত্বে ছিলেন সে সময়ের দাপটে রাভা জনজাতির উজ্জ্বল মুখ তথা সরকার কর্তৃক প্রাপ্ত বঙ্গভূষণ সম্মানের আধিকারী গোনাথ রাভা। তিনি একমাত্র ডুয়ার্সের জলপাইগুড়ি জেলা থেকে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। পাশাপাশি নেতৃত্বে ছিলেন আলিপুরদুয়ার জেলার ধীরেন সরকার ,এমএল কুজুর, কোচবিহার জেলা থেকে দুর্গেশ নিয়োগী প্রমুখরা। আজ ১০ জুন। জলপাইগুড়ি বনবিভাগের গোসাই হাট বন বস্তির মানুষের কাছে এক অন্ধকার যন্ত্রণাময় অতীত।

১৯৭১ সালের আজকের দিনটিতে অর্থাৎ ১০ জুন বন বিভাগ ও পুলিশের যৌথ আক্রমণে ডুয়ার্সের জলপাইগুড়ি জেলার ধুপগুড়ি ব্লকের মোরাঘাট রেঞ্জের গোসাইহাট ব্লক বস্তির পাঁচজন আন্দোলনকারী কে গুলি করা হয়। প্রত্যক্ষদর্শী তথা সহযোদ্ধা পশ্চিমবঙ্গ সরকার কর্তৃক বঙ্গভূষণ সম্মানে ভূষিত গোনাথ রাভার দাবি ওইদিনের ওই পাঁচ জন শহীদের আত্ম বলিদানের কারণেই আজ গোটা গোসাইহাটবাসী এত সুখ স্বাচ্ছন্দ নিয়ে ফরেস্ট বস্তিতে বসবাস করার সুবিধা লাভ করছে। শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে আজকের দিনটিতে গোটা বনববস্তির মানুষ গোসাইহাট বিএফপি প্রাথমিক বিদ্যালয় সংলগ্ন রাস্তার পাশের একেবারে অগোছালো ছোট্ট কংক্রিটের শহীদ বেদীতে মাল্যদান করে দিনটিকে স্মরণীয় করে রেখেছেন। যেখানে বর্তমান প্রজন্ম এই ইতিহাসকে ভুলে যেতে বসেছে।

বলাবাহুল্য অনেকের কাছেই এই ইতিহাস অজানা। ওইদিনের সেই বিভীষিকাময় রাত্রে একদিকে বনদপ্তরের আধিকারিকদের মুখোমুখি তো অন্যদিকে পুলিশের মুখোমুখি হতে হয়েছিল গোসাইহাট বন বস্তির রাভা ও আদিবাসী সম্প্রদায়ের পুরুষ মহিলাদের। নিজের জীবনকে বাজি রেখে রুখে দাঁড়িয়েছিলেন সেদিনের সেই রাতে। কিন্তু তৎকালীন সময়ে পশ্চিমবঙ্গের কোয়ালিশা সরকার জমিদারের আশ্বাস ও রাভা আদিবাসীদের উপর বেগারি প্রথা তুলে নেবার প্রতিশ্রুতি দিলেও বছরের পর বছর অতিক্রান্ত হয়েও সুরাহা সমাধান না পেয়ে ক্ষুদ্ধ বনবাসীরা রেঞ্জ অফিসে হানা দেয়। তৎকালীন রেঞ্জারকে রেঞ্জ অফিস থেকে বাইরে বের করে গোটা খট্টিমারি এলাকা জুতোর মালা পরিয়ে ঘুরিয়ে বিক্ষোভ দেখায়। যার কারণে ওই দিন রাতেই প্রচন্ড ঝড় বৃষ্টির সময় পুলিশের সহায়তায় গোসাইহাট বনবস্তিতে বন দপ্তরের বিরাট বাহিনী হানা দিয়ে স্থানীয় নয়জনকে আটক করে নিয়ে যায়।

এই খবর চাউর হতেই গোটা বস্তিবাসী তীর ধনুক নিয়ে পুলিশ ও বনদপ্তরের বিরাট বাহিনীর সাথে খন্ড যুদ্ধে লিপ্ত হয়। আর সেখানেই গুলিবর্ষণে প্রাণ যায় আজমন রাভা, ছান্দু উরাও, সাধু উরাও, মোংরা উরাও ও জ্যাঠা রাই-এর। এরা প্রত্যেকেই গোসাইহাট বনবস্তির বাসিন্দা। পাঁচজনের মৃত্যুতেও শান্ত থাকেনি পুলিশ ও বনদপ্তর। গ্রামের অনেককেই গ্রেফতার করে নিয়ে যাওয়া হয় পুলিশের তরফে। নিহত পাঁচ জনের পোস্টমর্টেম রিপোর্ট অবধি দেওয়া হয়নি প্রশাসনের তরফে এমনটাই দাবি গোনাথ বাবুর।

দীর্ঘ রক্তক্ষয়ী আন্দোলনকে দমাতে সফল হলেও বস্তিবাসীদের আন্দোলনের লক্ষ্যকে অস্বীকার করতে পারেনি তৎকালীন সরকার। অবশেষে শেষ পর্যন্ত বেগারি প্রথার অবসান ও জমি দখলের লড়াইয়ে সাফল্য পায় বস্তিবাসীরাই। কিন্তু এই সাফল্যের পিছনের চাপানউতর ইতিহাসের ৫৪ বছর পেরিয়ে গিয়েও গোটা ইতিহাস যেন স্মৃতির পাতায় জমে কোথাও ছিড়ে পড়ে আছে। কেবল রয়ে গিয়েছে পাঁচ জন আন্দোলনকারীর একমাত্র শহীদবেদী। সারা বছর জঙ্গলে আগাছায় ঢেকে থাকলেও এই বিশেষ দিনটিতে চকচকে হয়ে ওঠে। ছোট্ট কংক্রিটের পিলারের গায়ে সাদা রংয়ের প্রলেপ পড়ে। আর সাদা রঙের উপরে লাল রঙ দিয়ে এই পাঁচজন বিপ্লবীর নাম খোদাই করা হয়। আজ ১০ জুন তথাকথিত মাত্র কয়েকজন গুণী ব্যক্তির একান্ত ইচ্ছায় কয়েকটা ফুল আর পাঁচটি মালা ব্যাস এই নিয়েই তাদের স্মরণ করা হল।

পেশায় অধ্যাপক একজন স্থানীয় বাসিন্দার কথায়, বছরের এই বিশেষ দিনটিতে মাত্র কয়েকজন মিলে শহীদ বেদিতে মাল্যদান ও পুষ্পস্তবক দেওয়া হয়। এর বাইরে কোনও কিছুই করতে আগ্রহ দেখায় না কেউ। তবে এটা আমাদের লজ্জা যে আমরা যে পাঁচটি প্রাণের বিনিময়ে আজ এই জন্মভূমির উপর বিরাজ করছি সেই পাঁচজনকে মনে রাখার মত সময় নেই আমাদের।

স্থানীয় রাভা, আদিবাসী, নেপালি জনজাতির স্থানীয় মানুষদের দাবি, আমরা খেটে খাওয়া দিনমজুর মানুষ, আমরা চাই আমাদের এই পাঁচজন বীর শহীদের সুবিশাল মূর্তি না বানালেও যেন একটা ভালো শহীদ বেদী তৈরি করে দেওয়া হয়। যাতে করে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম ইতিহাসটা ভুলে না যায়।

পশ্চিমবঙ্গ রাভার ডেভেলপমেন্ট কাউন্সিলের জেনারেল সেক্রেটারি তথা সংশ্লিষ্ট গ্রাম পঞ্চায়েতের উপপ্রধান রবি রাভা, অত্যন্ত মর্মাহত হয়ে জানায়, আমাদের বস্তিবাসীর আন্দোলন কেন গুরুত্ব পেল না কেন কেউ এ নিয়ে মাথা ঘামালো না এটা অত্যন্ত বেদনার। আজ অব্দি আমরা কোনও স্মৃতিসৌধ নির্মাণে সক্ষম হয়নি। গ্রামের উপপ্রধান হবার সুবাদে গ্রামবাসীদের এই দাবিকে উপরমহল পর্যন্ত তুলে ধরার আপ্রাণ চেষ্টা করব।

About Post Author