সময় কলকাতা ডেস্ক : রাজশেখর বসু বা পরশুরাম যেনামেই ডাকা হোক সৌরভই বিতরণ করবেন তিনি। সে ব্যঙ্গমিশ্রিত হাস্যরস হোক, অভিধান বা অনুবাদ অথবা প্রবন্ধ যাই হোক না কেন তা হয়ে উঠেছে অনন্য। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁকে একবার জিজ্ঞেস করেছিলেন এত রস তুমি পাও কোথায়? তৎক্ষণাৎ তিনি উত্তর করেছিলেন “আপনি ভুলে যাচ্ছেন, আমি রসায়নের লোক!”
আজ রাজশেখর বসুর জন্মদিন।১৮৮০ সালে আজকের দিনে তাঁর জন্ম। বর্ধমান জেলার বামুনপাড়া গ্রামে তার মাতুলালয়ে জন্মগ্রহণ করেন। তার পৈতৃক নিবাস ছিল পশ্চিমবঙ্গের নদিয়া জেলার বীরনগর গ্রামে। রাশভারী রাজশেখর বসুর লেখায় ছিল ভরপুর মজা, ব্যঙ্গ। তাঁর লেখায় ছিল ঘুনধরা সমাজের ছবি। হাসিঠাট্টা আর বিদ্রুপে ভরা কষাঘাতের মধ্যে দিয়ে জীবনের নির্মম সত্য ফুটিয়ে তোলার দর্শন তাঁর লেখায় । তাঁর প্রথম গল্প ‘সিদ্ধেশ্বরী প্রাইভেট লিমিটেড’ তিনি যখন লিখেছিলেন তাঁর তখন ৪২ বছর বয়স। সেখানে গল্পের কুশিলবরা সকলেই যেন সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন চিট ফান্ডের আলোচিত চরিত্র।আমৃত্যু জীবনেরবাকি সময় তিনি যা লিখেছেন সবই যেন সমাজের আয়না। ‘বিরিঞ্চি বাবা’র গল্প একইভাবে ভন্ডদের স্বরূপ প্রকাশ । পাশাপাশি, চিকিৎসা সংকটের মত নির্মল হাস্যরসের গল্পও তাঁর সৃষ্টি।

বিজ্ঞানের প্রতি প্রবল টান ছিল বরাবরই । রসায়ন ও পদার্থবিদ্যায় স্নাতক হন। তারপর রসায়ন নিয়ে স্নাতকোত্তর পরীক্ষায় একেবারে প্রথম হন। এরপরই আইন পড়ার শুরু। আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের সঙ্গে সঙ্গে জুড়ে গেল বেঙ্গল কেমিক্যাল। প্রথমে রসায়নবিদ হিসেবে যোগ দিয়ে, অবসর নিলেও, মৃত্যুর আগে পর্যন্ত ছিলেন বেঙ্গল কেমিক্যালের টেকনিকাল অ্যাডভাইসার।

পরশুরামের গল্প কাহিনীর প্রতি আকর্ষণ গত একশো বছরে একটুও কমে নি। বিষয়বস্তুও অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। সত্যজিত রায়ের ‘পরশপাথর’ বা ‘কাপুরুষ মহাপুরুষ’মূল কাহিনী রাজশেখর বসুর কালজয়ী সাহিত্য থেকে নেওয়া। পরশুরামের সৃষ্টি একের পর এক চরিত্র বাংলা সাহিত্যে অনন্য স্থান করে নিয়েছে।
পাশাপাশি,রামায়ণ-মহাভারতের অনুবাদ ও অভিধান রচনাও রাজশেখর বসুর উল্লেখযোগ্য সাহিত্যকীর্তি । নিজের সম্পর্কে একটি সভায় রাজশেখর বসু বলেছিলেন, “আসলে আমি আধা মিস্ত্রি, আধা কেরানি। অভিধান তৈরি ও পরিভাষা নিয়ে নাড়াচাড়া মিস্ত্রির কাজ। রামায়ণ মহাভারত অনুবাদ কেরানির কাজ।” ব্রজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের উৎসাহে ও অনুরোধে ‘চলন্তিকা’ অভিধানের কাজ শুরু করেন। সঙ্গে পান সুরেশচন্দ্র মজুমদার ও শৈলেন্দ্রকৃষ্ণ লাহাকেও। লক্ষ্য ছিল একটাই, বাংলা বানানের একটা আধার তৈরি করা। সেখানে স্থান পায় পরিভাষাও। এই বিশাল কাজে মতামতের জন্য চলে গিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্র, প্রমথ চৌধুরী, হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর মতো মানুষদের কাছে। সুবৃহৎ অভিধান রচনা সুসম্পন্ন হওয়ার পরে রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন , “এতদিন পর বাংলা ভাষার অভিধান পাওয়া গেল।”তবে এতকিছুর শেষেও আপামর বাঙালির কাছে তিনি বিশেষ সমাদৃত তাঁর সরস ছোট গল্পের জন্যই।লেখকের জন্মের ১৪২ বছর পরেও যার কদর একফোঁটাও কমে নি।।


More Stories
বাংলা নববর্ষের ইতিহাস
“ইতিহাসের পাতা থেকে” কালজয়ী : সাহিত্যের মণিমুক্তো
প্রয়াত রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী অর্ঘ্য সেন