পুরন্দর চক্রবর্তী,সময় কলকাতা, ১৫ জানুয়ারি : কাজী নজরুল লিখেছিলেন কেউ ভোলে না কেউ ভোলে। কিছু কিছু জিনিস আবার ভোলা যায় না। কালজয়ী হয়ে থেকে যায়। কালজয়ী শব্দবন্ধের অর্থ চিরন্তন, শাশ্বত, বা চিরদিনের জন্য স্থায়ী ও প্রাসঙ্গিক। “ইতিহাসের পাতা থেকে ” কালজয়ী নিবন্ধমালা তাই একই সাথে স্থায়ী ও প্রাসঙ্গিক যা চৌধুরী সুধীরথের কলমে তা যেন ছড়িয়ে যায় ধুসর কোষে ও মননে। এবার বইমেলার আগেই পাঠকরা হাতে পেয়ে ঐতিহাসিক ও প্রাবন্ধিক চৌধুরী সুধীরথের “ইতিহাসের পাতা থেকে” কালজয়ী দ্বিতীয় খন্ড। কোন বৃহৎ পরিসরে চৌধুরী সুধীরথ একাত্ম হয়েছেন ইতিহাস তুলে ধরতে, তার মর্ম বুঝতে হলে গভীরে যেতে হবে, তাঁকেও বুঝতে হবে। অখণ্ড ও খণ্ডিত বঙ্গের পাশাপাশি বুঝতে হবে চট্টগ্রামকে যে মাটির সঙ্গে সুধীরথের নাড়ির যোগ।
চট্টগ্রামের মাটি স্বাধীনতা সংগ্রামের আঁতুরঘর বলেই পরিচিত। চট্টগ্রামের স্বাধীনতা সংগ্রামের কথা বলতে গিয়ে প্রথম যে নামটি মনে আসে তার নাম সূর্য সেন।বহু বিপ্লবী চট্টগ্রামের মাটিতে জন্মে ভারতীয় উপমহাদেশে ব্রিটিশ বিরোধী সংগ্রামের মুখ হয়ে উঠেছিলেন ।তাঁদের কারাবাস করতে হয়েছে,প্রাণ দিতে হয়েছে । বিপ্লবীদের মধ্যে অনেকেই যুক্ত ছিলেন বামপন্থী ভাবধারার সঙ্গে । তাঁদের কথা বলতে গেলে অনন্ত সিংহের কথা বলতে হয়, তিনি চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার আক্রমণের অন্যতম প্রধান নায়ক। তিনি পরবর্তীতে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির রাজনীতির সাথে যুক্ত হন।বলতে হয় গণেশ ঘোষের কথা তিনি ব্রিটিশ বিরোধী সশস্ত্র বিপ্লবে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন এবং পরবর্তীকালে কমিউনিস্ট আন্দোলনে যোগ দেন।তিনি ১৯৫১ থেকে ১৯৬৭ সাল পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার সদস্য হিসেবে কাজ করেছেন।কল্পনা দত্ত ছিলেন সূর্য সেনের অন্যতম সহযোদ্ধা এবং প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারের ঘনিষ্ঠ বন্ধু। অম্বিকা চক্রবর্তীও পরবর্তী জীবনে কমিউনিস্ট পার্টির সাথে যুক্ত হন। এঁদের অনেকেই ছিলেন সুলেখক। এই তালিকায় সুধীরথ চৌধুরীও রয়েছেন প্রবলভাবে। বামপন্থী মতাদর্শে আজীবন বিশ্বাসী থেকেছেন তিনি। পুঁজিবাদ, সাম্রাজ্যবাদ ও ঔপনিবেশিকতার বিরুদ্ধে শোষণহীন, ধর্মনিরপেক্ষ, সাম্য ও মানবতায় গড়ে তোলা এক সমাজের স্বপ্ন দেখেছেন তিনি। কৈশোরে ব্রিটিশ পুলিশের রোষানলে পড়ে প্রথমবারের জন্য কারাবরণ করতে হয় তাঁকে। ১৯৩৭ সালে ১৯৩৯ সাল থেকে দুবছর কারাবাস করতে হয় তাঁকে। অতঃপর দেশভাগের ক্ষত ও যন্ত্রণা নিয়ে সময়ের সময়ের সরণি ধরে চলেছেন সুধীরথ চৌধুরী। দেখেছেন মুক্তিযুদ্ধ, যার সাথে নিজেকে মিশিয়েছেন কর্মে ও চেতনায়। স্বপ্ন ও ক্ষত বুকে নিয়ে এসেছেন এপার বাংলায়। পাহাড়ে জঙ্গলে দিনের পর দিন কাটিয়ে বৈপ্লবিক চেতনাকে, প্রতিবাদী রক্তিম আদর্শকে লেখার ও কর্মের মধ্যে দিয়ে ফুটিয়ে তুলেছেন তিনি, মুক্তি পেয়েছে ভাবনা। চৌধুরী সুধীরথ নামে কলম ধরেছিলেন তিনি। গ্রন্থ রয়েছে একাধিক যার ছত্রে ছত্রে বিপ্লব স্পন্দিত অক্ষরমালা। দৈনিক কালান্তর, আজাদী, প্রথম আলো সহ একাধিক পত্রপত্রিকায় তার নিয়মিত লেখা বেরিয়েছে। তাঁর পুত্র তাপস চৌধুরী তাঁর প্রয়াণের পরে পিতার রেখে যাওয়া পান্ডুলিপিকে নিষ্ঠা ভরে একত্রিত করেছেন। ইতিহাসের পাতা থেকে তুলে আনা খন্ড-অখন্ড ভারতের মানুষের বর্ণময় অক্ষরমালার মধ্যে ছবির মত ফুটে উঠেছে অজস্র বিস্মৃত ছবি। প্রথম খন্ড হাতে পেয়ে যারা সমৃদ্ধ করতে পেরেছেন নিজেদের, সেই পাঠকরা আরও একবার মণিমুক্তো দিয়ে সাজানো রত্নভান্ডার উপহার পেতে চলেছেন। অভিজ্ঞতালব্ধ তথ্যসমৃদ্ধ কালজয়ী ফসল যেখানে পাঠক খুঁজে পান যা তাঁরা চেয়ে এসেছেন। সময়ের ও ভূগোলের বেড়াজাল ছাড়িয়ে রচনা যেন মনকেমনের জগত ছুঁয়েছে। এ যেন অশ্বমেধের রথ। কিছুই হারায় না, চৌধুরী সুধীরথের ইতিহাসের স্মরণ থেকে যায় কালজয়ী হয়ে – কালজয়ী লেখকের কলম আবিষ্ট করে যায়, মন ছুঁয়ে যায়।।
More Stories
রাজ্যসভায় নীতিশ, বিহারের মুখ্যমন্ত্রী কে এবার?
ধর্নায় মুখ্যমন্ত্রী, বিরোধী দলনেত্রীর প্র্যাকটিস চলছে, বললেন সুকান্ত
কেন পদত্যাগ করলেন রাজ্যপাল সিভি আনন্দ বোস?