পুরন্দর চক্রবর্তী, সময় কলকাতা : সময়টা চল্লিশের দশক,স্থান -সঙ্গীতের শহর লখনৌ। অনেক শিল্পী সমাহারে অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছেন মরিস কলেজ অফ মিউসিকের অধ্যক্ষ পণ্ডিত শ্রীকৃষ্ণ রতন ঝংকারজি। কয়েকটি গান শেষ হতেই এক তরুণ তাঁর শাস্ত্রীয় রেওয়াজ সমৃদ্ধ মধুর গলায় পেশ করতে শুরু করলেন তাঁর শাস্ত্রীয় নিবেদন।সুরের লহরী ভেসে যেতে থাকল যেন ভুবন জুড়ে । মঞ্চে তাঁর গান শেষ হতেই যে নিস্তব্ধতা নামল হলঘরে,তার অবসান ঘটালেন স্বয়ং ভাতখন্ডের মরিস কলেজ অফ মিউজিকের অধ্যক্ষ।তিনি জানালেন,অনুষ্ঠানে আজ আর কেউ এরপরে গান করলে তা হবে সুরদেবীর অপমান। তাঁর গানে আবিষ্ট শ্রোতারা অনুষ্ঠানের মাঝপথে অনুষ্ঠান শেষ হলেও ফিরলেন প্রশান্ত চিত্তে, কানে যুবকের শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের রেশ। সেদিনের সেই যুবক চিন্ময় লাহিড়ী পরবর্তীতে শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের জগতের এক দিগন্ত হয়ে ওঠেন ।
“রজনী ফুরালো যে পথপানে চাহিয়া, কেমনে নয়নবারি রাখি ওগো ঢাকিয়া ” গানটি তাঁর কণ্ঠে শুনে অনেকেই মুগ্ধ হয়েছেন, বিভোর হয়েছেন। শাপমোচন চলচ্চিত্রে প্রতিমা বন্দোপাধ্যায়ের সঙ্গে তাঁর গাওয়া ‘ত্রিবেণী তীর্থপথে কে গাহিল গান ” রাগপ্রধান গান হিসেবে জনপ্রিয়তা লাভ করে। তিনি ছিলেন শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের দিকপাল। বাংলার যে কয়েকজন শিল্পী শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে শ্রেষ্ঠত্বর চূড়ান্ত শিখরে পৌঁছেছিলেন তাঁদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন চিন্ময় লাহিড়ী। আজ থেকে ঠিক ১০২ বছর আগে, মার্চের ২০ তারিখে তিনি পাবনার তাঁতিবন্ধ জমিদার পরিবারে জন্মেছিলেন চিন্ময় লাহিড়ী ।চিন্ময় লাহিড়ীর তাঁর বাবা নয় শরিকের জমিদার পরিবারের অন্যতম শরিক, শ্রীজীব চন্দ্র লাহিড়ী পাবনা ছেড়ে লখনৌ শহরে ওঠেন। শ্রীজীব- সরোজবাসিনীর ছয়পুত্র ও পাঁচকন্যার সকলের জন্ম লখনৌ শহরে।

লক্ষৌয়ের বয়েজ অ্যাংলো ইণ্ডিয়ান স্কুলে ছাত্র চিন্ময় লাহিড়ীর আগ্রহ ছিল শরীরচর্চায়। তেরো বৎসর বয়সে সঙ্গীতচর্চাই শুরু করলে তাঁর দাদা শচীন্ময় লাহিড়ীর হাত ধরে পৌঁছে যানবিখ্যাত সঙ্গীতজ্ঞ ও সেতার শিল্পী ধ্রুবতারা জোশীর কাছে। তিনি চিন্ময় লাহিড়ীকে নিয়ে ১৯২৬ খ্রিস্টাব্দে স্থাপিত মরিস কলেজ অব মিউজিক এর (বর্তমানে ভাতখণ্ডে মিউজিক ইনস্টিটিউট ডিমড ইউনিভার্সিটি) তৎকালীন অধ্যক্ষ পণ্ডিত শ্রীকৃষ্ণ রতন ঝংকারজির হাতে তুলে দেন । চিন্ময় লাহিড়ীর সুরেলা কণ্ঠ ও অধ্যাবসায় দেখে আগ্রহ তিনি তাঁর শিষ্য হিসাবে গ্রহণ করেন। এরপরে শুধুই উত্থান।
চিন্ময় লাহিড়ী নামী ওস্তাদের কাছে সংগীতের তালিম নিলেও নানা পরীক্ষানিরীক্ষার মধ্য দিয়ে তিনি নিজস্ব ঘরণার অজস্র রাগ-রাগিনী সৃষ্টি করে গিয়েছেন। তার গানে ছিল শাস্ত্রীয় আঙ্গিকের সঙ্গে মধুর রস ও আত্মনিবেদনের সংমিশ্রণ । তার রাগ-রাগিনীর মধ্যে কয়েকটি হল শ্যামকোষ, যোগমায়া, প্রভাতী টোড়ি, সন্ত ভৈঁরো, কুসুম কল্যাণ ইত্যাদি। তার অসামান্য সৃষ্টি “নন্দকোষ” ভারতের সংগীতবিদগ্ধ সমাজে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। এক সঙ্গীত সম্মেলনে “নন্দকোষ” পরিবেশনের সময় অনুষ্ঠানে উপস্থিত ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ সাহেব ও উস্তাদ হাফিজ আলি খাঁ অভিভূত হয়ে পড়েন এবং দুজনেই অনুষ্ঠান শেষে তার কাছ থেকে রাগের বন্দিশ সংগ্রহ করেন।
১৯৩৬ খ্রিস্টাব্দে তিনি অল ইন্ডিয়া রেডিও লখনৌ স্টেশনে সঙ্গীতশিল্পী হিসাবে কর্মজীবন শুরু করেন। তারপর চল্লিশের দশকে ঢাকা বেতার কেন্দ্রে যুক্ত ছিলেন। খ্রিস্টাব্দে এইচ.এম.ভি. থেকে ‘না মানে মানা’ ও ‘দুয়ারে এলো কে’ – এই দুটি খেয়াল গানের রেকর্ড প্রকাশিত হয়। দেশভাগ হলে তিনি কলকাতায় আসেন। রাধিকা মোহন মৈত্র তাঁকে পরম স্নেহে বরণ করেন। যে সময় টালিগঞ্জ রসা রোডের ভাড়াবাড়িতে থাকতেন, তখন তিনি মধ্যগগনে ।এখানে আসতেন বিখ্যাত শিল্পীরা। মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়, সতীনাথ মুখোপাধ্যায়কে দেখা যেত এখানে। পরবর্তীতে চন্ডীতলায় নিজের বাড়ি করেন।
সংগীত শিক্ষক হিসাবে তার যথেষ্ট খ্যাতি ছিল। তাঁর কাছে সরাসরি তালিম নিয়েছেন বা তাঁর সান্নিধ্যে নিজেদের ঋদ্ধ করেছেন এমন শিল্পীদের তালিকা দীর্য।মীরা বন্দ্যোপাধ্যায়,গীতশ্রী সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়,বেগম পারভিন সুলতানা, শিপ্রা বসু,অখিলবন্ধু ঘোষ, শিপ্রা বসু, সতীনাথ মুখোপাধ্যায় প্রমুখ স্বনামধন্য শিল্পীরা । এই তালিকায় রয়েছে আরও অজস্র নাম।অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি তাঁর কাছে গান শিখতে যেতেন রাখী গুলজার।
তাঁর কাছে তালিম নিতেন না এরকম খ্যাতনামা বাঙালি শিল্পী ছিলেন হাতেগোনা।চন্ডীতলায় বাড়ি করার পরে আমৃত্যু ছিলেন সেখানেই।খ্যাতি তখন ছড়িয়েছে ভুবনজোড়া অথচ মানুষটি থেকেছেন আত্মভোলা হয়ে। থেকেছেন অন্যত্র থাকা অন্য ভাই বোনদের মাথার ওপরে বটগাছ হয়ে। তাঁর কাছের মানুষজন দেখেছেন তাঁর ভেতরে ছিল সরলতা মাখা শিশু মন আর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার প্রতি শ্রদ্ধা।
আজ থেকে বছর ছয়েক আগে, তার স্মৃতি রক্ষার্থে তার পুত্র শ্যামল লাহিড়ী ও পুত্রবধূ মন্দিরা লাহিড়ী কলকাতায় স্থাপন করেছেন এক সাংস্কৃতিক সংস্থা ‘মগন মন্দির ‘। “মগন” ছদ্মনামে বিভিন্ন রাগের বন্দিশ রচনা করেছেন। লক্ষৌতে থাকার ফলে ওঁর হিন্দি ও উর্দু ভাষার উপর বিশেষ দখল ছিল। এছাড়া তিনি বিভিন্ন রাগে ঠুমরি, দাদরা, হোলি, ত্রিবট, চতুরঙ্গ, গীত, ভজন, গজল, বাংলা রাগপ্রধান সৃষ্টি করে গিয়েছেন এবং স্বরলিপির আকারে উপস্থাপন করে গেছেন। তার তৈরি অসংখ্য রাগরাগিণী বন্দিশ, তান ও বিস্তার, মগনগীত ও তানমঞ্জরী- এই সঙ্গীত গ্রন্থে র চারটি খণ্ডে নিবন্ধ আছে।

১৯৮৪ খ্রিস্টাব্দের ১৭ই আগস্ট কলকাতায় প্রয়াত তাঁর প্রয়াণের সঙ্গেই শেষ হয়ে যায় একটি অধ্যায়।শাস্ত্রীয় সঙ্গীত জগতের একটি স্তম্ভ যেন ভেঙে পড়ে।”জেগে জেগে বেদনায় ঝরিল যে কামিনী,প্রদীপ নিভিল গো হায় শেষ হল যামিনী” তাঁর গানের কথা তাঁর জন্য সু-প্রযোজ্য।কারণ তাঁর জীবন ছিল এমন একটি শোকে বিদীর্ণ যা কাছের মানুষরাই জানতেন। তাঁর অসম্ভব প্রতিভাবান কিশোর পুত্র কুশলের অসময়ে প্রয়াণ তাঁর মৃত্যু পর্যন্ত তাঁকে সবকিছু ছেড়ে গান নিয়েই যেন ভুলে থাকতে বাধ্য করত।তাঁর ব্যক্তিগত বেদনা ও আবেগ যেন মর্তলোকে সুরের মায়াজাল রচনা করত যা শুনে যুগে যুগে মোহিত হয়ে এসেছে শ্রোতা।।
তথ্য সূত্র : পরিবারের সদস্য, উইকি, চিত্র সৌজন্য : উইকি এবং মগন মন্দির হোমপেজ।


More Stories
বাংলা নববর্ষের ইতিহাস
আরেক অভিনেতা প্রণবের অকালপ্রয়াণ
বেজি কি সাপের বিষে কাবু হয় না?