সময় কলকাতা ডেস্ক : দেখতে দেখতে পনেরো বছর হয়ে গেল। ইংরেজ ক্রিকেটার, ধারাভাষ্যকার আর ক্রিকেট বিশ্বে সর্বকালের অন্যতম সেরা কোচ বব উলমারের মৃত্যু হয়েছিল ১৮ মার্চ যাকে প্রাথমিকভাবে খুন বলে ঘোষণা করেছিল মেডিক্যাল রিপোর্ট ।হইচই পড়ে যায় ক্রিকেট দুনিয়ায়। আজও সেই মৃত্যু নিয়ে রয়ে গেছে রহস্য যাকে ক্রিকেট বিশ্ব সমাধান না হওয়া একটি ঘটনা বলেই জেনে এসেছে।
বব উলমার তাঁর উদ্ভাবনী তত্ত্ব প্রয়োগের জন্য কোচ হিসেবে খ্যাতি পেয়েছিলেন। ট্যাকটিকাল কোচ হিসেবে তাঁর নামডাক ছড়ায় আর ল্যাপটপ কোচ হিসেবে বিশেষণ পান।দক্ষিণ আফ্রিকা ক্রিকেট দলের কোচ হিসেবে তিনি পেয়েছিলেন দুর্দান্ত সাফল্য। কিন্তু দক্ষিণ আফ্রিকার কোচ হিসেবে শেষের দিকে বেটিং বিতর্ক যুক্ত হয় তাঁর কোচিং জমানায়। পরবর্তীতে হন পাকিস্তান দলের কোচ।
পাকিস্তানের কোচ থাকাকালীনই তাঁর রহস্যময় মৃত্যু হয়।জ্যামাইকার কিংস্টনে বব উলমারের মৃতদেহ পাওয়া যায় হোটেলের ওয়াসরুমে। মৃত্যু নিয়ে ধোঁয়াশা ছিল, ছিল সন্দেহ। প্রশ্ন ওঠে তবে কি খুন হতে হয়েছে বব উলমারকে? আজ উলমারের প্রয়াণের দিনে তাঁর ক্রিকেট জীবন,ক্রিকেটীয় দর্শন নিয়ে আলোচনার ফাঁকে জেনে নেওয়া যাক তাঁর মৃত্যুর কারণ।
উলমারের জন্ম ভারতের কানপুরে , ১৯৪৮ সালের ১৪ মে । পরিবার কিছুদিনের মধ্যে ভারত থেকে ইংল্যান্ডে ফিরে যায়। ক্রিকেটকেই মুল লক্ষ্য হিসেবে বেছে নিলেও উলমারের ক্রিকেট জীবন মোটেই আহামরি ছিল না।ইংল্যান্ড দলের হয়ে ১৯৭৫ সালে তিনি ছিলেন মুলত ব্যাটসম্যান ও পার্টটাইম বোলার।১৯ টি টেস্টে ৩৩রানের সামান্য বেশি গড় সহ ১০৫৯ রান করেছিলেন। তিনটি শতরান করেছিলেন।টেস্টে উইকেট পেয়েছিলেন চারটি। একদিনের ক্রিকেটে মাত্র ছটি ম্যাচ খেলেছেন।একদিনের ক্রিকেটে ব্যাট হাতে নিদারুণ ব্যর্থ হলেও ৯ টি উইকেট আছে উলমারের। খেলা ছাড়ার পরেও খেলা তাঁকে ছাড়ে নি যার কারণ তুলে ধরতে উইসডেন পত্রিকার কয়েকটি লাইন যথেষ্ট। উইসডেনে লেখা হয়েছিল -উলমার ক্রিকেট খেতেন, ক্রিকেট পরতেন আর ক্রিকেটেই ঘুমাতেন।এককথায় ক্রিকেট অন্তপ্রাণ ছিলেন তিনি।
সেবার পাকিস্তানের কোচ হয়ে উলমার এসেছেন ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জে।২০০৭ সালের ১৮ মার্চ সকালে জ্যামইকার পেগাসাস হোটেলের কর্মচারী বার্নিশ রবিনসন পাকিস্তান টিমের কোচ উলমারের ঘরে এসে দেখতে পান উলমারের বিছানায় রক্তের দাগ, ঘর ফাঁকা। অবশেষে তিনি ওয়াশরুমে গিয়ে দেখতে পেলেন উপুড় হয়ে পড়ে আছে ৫৯ বছর বয়সী ছ ফুট লম্বা বব উলমারের সংজ্ঞাহীন দেহ। কিংস্টন হাসপাতালে নিয়ে গেলে তাঁকে মৃত ঘোষণা করা হয়। তাঁর মৃত্যু ছিল ধোঁয়াশায় মোড়া। কেন মৃত্যু হয় তাঁর?যেভাবে তাঁর দেহ খুঁজে পাওয়া যায় এবং রবিনসনের বর্ণনা ও ময়না তদন্তের প্রাথমিক রিপোর্টে পাওয়ার পরে আলোড়ন পড়ে যায়। কি ছিল মেডিক্যাল রিপোর্টে?
২২মার্চ প্রাথমিক ডাক্তারি রিপোর্টে বলা হয় বাহ্যিকভাবে জোর করে শ্বাসরোধের ফলেই মৃত্যু হয়েছে উলমারের। কিংস্টনের স্টেট প্যাথেলোজিস্ট এরি শেশাইয়া তাঁর রিপোর্টে উলমারের মৃত্যুকে শ্বাসরোধ করে হত্যাকান্ড বলেই ঘোষনা করেন ।

উলমারের মৃতদেহের ময়না তদন্ত করে দেখা যায় তাঁর কাঁধের হাইওয়েড অস্থি ভাঙা ছিল যা জোর করে শ্বাসরোধ করে খুনের ক্ষেত্রে হয়। রিপোর্ট অনুযায়ী ছিল কালশিরার দাগ।এরপরেও ঘরের স্যাম্পল টেস্ট করে জানানো হয় সাইপারমেথরিন নামক রাসায়নিক বস্তুর প্রয়োগে শ্বাসরোধ হয়েছিল উলমারের। ফলে হত্যাকাণ্ডের সব রকম উপাদান ফুটে উঠেছিল বব উলমারের মেডিক্যাল রিপোর্টে। অথচ সবকিছুর পরেও স্কটল্যান্ড ইয়ার্ড তদন্তে নেমে জানায়, সব যুক্তি হত্যাকান্ডের দিকে ইঙ্গিত দিলেও একে হত্যাকান্ড বলার মত নিশ্চিত তথ্য তাঁদের হাতে নেই।
সিসিটিভি ফুটেজ থেকে ঘাতকের দেখা পাওয়া যায় নি। মোটিভ সম্পর্কেও মিলছিল না নিশ্চয়তা।যদিও ক্রিকেট দুনিয়া সন্দেহ করে বেটিং চক্রের চক্রান্ত তাঁর মৃত্যুর জন্য দায়ী। উলমার দক্ষিণ আফ্রিকার কোচ থাকাকালীন দলের বেটিং ফাঁস হয়। রহস্যময় মৃত্যু হয় কলঙ্কিত অধিনায়ক হ্যানসি ক্রনিয়ের। খুন প্রমাণ হয় নি সেক্ষেত্রেও। অনেকে সন্দেহ করেন,সেই একই ঘটনার ধারাবাহিকতা মেনেই খুন হলেন উলমার। সাধারণভাবে মানুষের মনে বিশ্বাস জন্মাতে শুরু করে যে বেটিং চক্র এমন এক সক্রিয় বৃহৎ শক্তি যা যেকোনো অপরাধ ঘটাতে পারে সংগোপনে। আর এরই রেশ ধরে উঠে আসে পাকিস্তান আয়ারল্যান্ডের ম্যাচ ও বেটিং চক্রের সম্ভাব্য চক্রান্তের কথা। উলমারের মৃত্যুর আগের দিন আয়ারল্যান্ডের কাছে পাকিস্তানের পরাজয় ও বুকিদের রোষের তত্বও উঠে আসতে থাকে গণমাধ্যমে ‘উলমার হত্যার ‘ মোটিভ হিসেবে।কিন্তু নিশ্চিত ভাবে মোটিভ প্রমাণ করা যায় নি। হত্যা হয়ে থাকলে হত্যাকারীর খোঁজ মেলে নি।হোটেল রুমে নেই হাতাহাতি বা শক্তিপ্রয়োগের চিহ্ন।

অতঃপর স্কটল্যান্ডের ইয়ার্ডের মত জ্যামইকা কনস্টাবুলারি ফোর্সের ডেপুটি কমিশনার মার্ক শিল্ডস তদন্তের কাজ হাতে নিয়ে তিন ডাক্তারের কমিটি গড়ে জানালেন মোটেই কাঁধের হাড় ভেঙে যায় নি, বাহ্যিক শক্তি প্রয়োগ করে শ্বাসরোধ ও করা হয় নি।ফলে হত্যাকাণ্ডের সম্ভাবনাকে সম্পূর্ণ ফুৎকারে উড়িয়ে দিলেন তিনি। মেডিক্যাল রিপোর্ট উলমারের হৃদযন্ত্রের সমস্যা ও তাঁর টাইপ টু ডায়াবিটিসকে মৃত্যুর কারণ হিসেবে তুলে ধরে।তদন্তকারী পুলিশ উলমারের মৃত্যুকে ক্লোজড কেস জানায়।জ্যামাইকান স্টেট জুরী বোর্ড ৫৭ জন সাক্ষী বয়ানের ভিত্তিতে জানায়,বব উলমারের মৃত্যুকে হত্যাকান্ড হিসেবে নিশ্চিত ভাবে ঘোষণার উপায় নেই। উলমারের পরিবারের তরফে এরপরে কোনও প্রশ্ন তোলা হয় নি।আর এভাবেই ধোঁয়াশা ঘেরা থেকে যায় সর্বকালের অন্যতম তাত্বিক কোচ বব উলমারের মৃত্যু।
আজও সমাধান না হওয়া রহস্য হয়েই রয়ে গেছে বব উলমারের মৃত্যু। উত্তর মেলে নি অনেক প্রশ্নের। কি হয়েছিল মৃত্যুর সে রাতে?কেন রক্তের দাগ দেখা গিয়েছিল উলমারের বিছানায়? এরকম অনেক প্রশ্নের উত্তর থেকে গিয়েছে অজানা।।


More Stories
গ্রেফতারির ভয়ে আগাম জামিনের আবেদন অরূপ বিশ্বাসের
ইউনিটি কাপ থেকে শূন্য হাতে ফিরছে ভারত
কেক কেটে ঈদ উদযাপন