সময় কলকাতা ডেস্ক : “কবে তৃষিত এ মরু ছাড়িয়া যাইব তোমার রসাল নন্দনে “-তাঁর লেখা এই গানখানি শুনে তাঁর স্ত্রী হিরণ্ময়ী দেবী উদ্বেগ ও কষ্টে বলেছিলেন, ‘কথা দাও, এ গান তুমি আর গাইবে না,’। তিনি এ গান আর করেন নি। কোনও গান আর বেশিদিন করতে পারেন নি। ৪৫ বসন্ত আর কতটাই বা দীর্ঘ হতে পারে ?গলায় মারণ রোগ বাসা বেঁধেছে।জীবন তাঁকে এত যন্ত্রণা দিয়েছে যে কষ্ট মৃত্যুর আগে উপশম হয় নি। কান্তকবি রজনীকান্ত সেন মানুষকে মর্ত্যলোকে অমৃতের আস্বাদ দিয়েছেন, নিজে হয়েছেন নীলকণ্ঠ।তাঁর কবিতা গান হয়ে সুরের মায়াজাল রচনা করত যা প্রায় দেড়শো বছর ধরে তাঁর লেখা গানের কথা দিয়েছে অনন্ত মুগ্ধতা।স্বদেশী গান, ভক্তিমুলক গান, জীবনের গান বা ব্যঙ্গ কবিতা-প্রভৃতি বিভিন্ন ধারায় রজনীকান্ত ছিলেন অসামান্য।
১৮৬৫ সালের ২৬ জুলাই তাঁর জন্মদিন। পাবনা জেলায় জন্ম।শিক্ষাশেষে আইনি পেশায় মনোনিবেশ করেছিলেন। মুন্সেফের কাজ করলেও,গানই ছিল তাঁর প্রাণ।গান গাইতেন তন্ময় হয়ে, তখন সময়ের হিসেব থাকত না রজনীকান্তের।তিনি জীবনের গান, স্বদেশ প্রেমের গান অত্যন্ত দ্ৰুত রচনায় পারঙ্গম ছিলেন। কথিত আছে, মাত্র আধঘন্টা সময়ের মধ্যে অনুষ্ঠানের মাঝে “তব, চরণ নিম্নে, উৎসবময়ী শ্যাম-ধরনী সরসা;”র মত অবিস্মরণীয় গান লিখেছিলেন।তিনি স্বদেশী গানে নবজাগরণ এনেছিলেন,” মায়ের দেওয়া মোটা কাপড় মাথায় তুলে নেরে ভাই” গানটি লিখে। ”

গান আর গান।অতিরিক্ত সময় ধরে গান করতেন। বিশ্রাম হত কম।অবিশ্রান্ত গান গেয়ে গলায় সংক্রমণ হয়ে গলা ফুলে উঠল। সংক্রমণ জটিল আকার নিল দ্ৰুত।রজনীকান্ত সময়ের হিসেব না করে গানে প্রাণ ঢালতেন যা তার প্রাণের বিনিময়ে মাশুল চাইল। কারণ প্রচুর টাকাও নেই। তাঁর রোগের চিকিৎসা সেসময়ে ব্যয়সাধ্য ছিল, তাঁর পক্ষে ছিল অতিরিক্ত ব্যয়সাধ্য ।কলকাতা মেডিক্যাল কলেজের চিকিৎসকরা বলেছিলেন, গলায় অতিরিক্ত চাপ- ই তাঁর রোগের কারণ। পরে জানা যায় তাঁর ল্যারিংসে ক্যান্সার ছড়িয়ে পড়েছে।গলা থেকে পুঁজ বেরোত, কণ্ঠস্বর প্রায় লুপ্ত।তার সঙ্গে যন্ত্রণা।রোগমুক্তি হয় নি, সাময়িক স্বস্তির আশায় চিকিৎসকরা ট্রাকিয়োটমি অপারেশন করে গলায় শ্বাসপ্রশ্বাস চলাচলের জন্য ছিদ্র করে রবারের নল বসান।ধীরে ধীরে বাকশক্তি হারালেন কণ্ঠনালীর রোগে।বিছানার পাশে কাগজ-পেনসিল থাকত, সেখানেই লিখে দিতেন দরকারি কথা, মনের কথাও। কিন্তু ক্যান্সার থেকে রোগমুক্তি সেসময় জীবদ্দশায় সম্ভব ছিল না।তবুও হার মানেন নি কান্তকবি। মৃত্যু কে পরম সত্য জেনে লিখে গিয়েছেন জীবনের জয়গান।

তিনি তাঁর টুকরো টুকরো রোজনামচায় লিখেছেন, ” তোমাদের মতন যদি আমার আগেকার মত লাউড মিউসিক থাক্তো তবে তর্ক করতেম। তোমরা চট করে বলে ফেল, উত্তর লিখতে আমার প্রাণান্ত।’’
স্বয়ং রোগের কথা নিজেই লিখছেন: ‘‘গলনালী আর শ্বাসনালী দুটো জিনিষ আছে। আমার ভাত খাবার নালীর মধ্যে ঘা নয়, নিঃশ্বাসের নালীর মধ্যে ঘা, সেখানে কোনও ঔষধ লাগানো যায় না।’’চিকিৎসার ব্যয়ভার টানতে তাঁর গ্রন্থস্বত্ব কম দামে বিক্রি করেদিতে হয়েছিল।কষ্ট পেয়েছিলেন সেন দম্পতির দুজনেই ।নিরুপায় কবি রোজনামচায় লিখে গিয়েছেন, ‘‘আমার এমন অবস্থা হ’ল যে, আর চিকিৎসা চলে না, তাইতে বড় আদরের জিনিষ বিক্রয় ক’রেছি।হরিশ্চন্দ্র যেমন শৈব্যা ও রোহিতাশ্বকে বিক্রয় ক’রেছিলেন। হাতে টাকা নিয়ে আমার চক্ষু দিয়া জল পড়িতেছিল।…’
উল্লেখ্য,আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায় হাসপাতালে তাঁকে দেখতে এসে বলেছিলেন, ‘‘আমার আয়ু নিয়ে আপনি আরোগ্য লাভ করুন!’’তাঁকে রোগশয্যায় দেখতে এসেছিলেন কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ। তার চেয়ে চার বছরের ছোট রবীন্দ্রনাথকে কাগজে লিখে মনের কথা জানিয়েছিলেন।চলে যাওয়ার সময় রবীন্দ্রনাথকে কান্তকবি লিখলেন, ‘‘আমায় আশীর্বাদ করুন, দয়াল শীঘ্র আমাকে তার কোলে নিয়ে যান।’’ সে রাতেই গান লিখে বোলপুরে পাঠালেন— ‘আমায় সকল রকমে কাঙ্গাল করিয়া গর্ব করেছ দূর’।
রবীন্দ্রনাথের যন্ত্রণাকে আত্মশক্তি দিয়ে দিয়ে জয় করার অনুভূতি ছিল। তিনি তাই রজনীকান্ত প্রসঙ্গে বলেছেন,”শরীর হার মানিয়াছে কিন্তু চিত্তকে পরাভূত করিতে পারে নাই। কণ্ঠ বিদীর্ণ হইয়াছে কিন্তু সঙ্গীতকে নিবৃত্ত করিতে পারে নাই।পৃথিবীর সমস্ত আরাম ও আশা ধূলিসাৎ হইয়াছে কিন্তু ভূমার প্রতি ভক্তি ও বিশ্বাসকে ম্লান করিতে পারে নাই।…আত্মার এই মুক্ত স্বরূপ দেখিবার সুযোগ কি সহজে ঘটে।” বাস্তবে রজনীকান্ত তাঁর যন্ত্রণাকে দয়ালের আশীর্বাদ হিসেবেই দেখেছিলেন, তাই তিনি লিখেছেন,‘আমি অকৃতী অধম ব’লেও তো মোরে কম ক’রে কিছু দাওনি’।
রজনীকান্তও যে গান স্ত্রী হিরণ্ময়ীর অনুরোধে গাইতেন না তা ছিল তাঁর প্ৰিয়।তিনি হাসপাতালে বলে গিয়েছিলেন, তাঁর শেষযাত্রায় যেন সেই “কবে তৃষিত এ মরু” গানটি গাওয়া হয়।তিনি পরিবার পরিজনকে বলেছিলেন, “আমার শ্রাদ্ধে বেশি খরচ ক’র না। কিন্তু যেমন পিপাসা তেমনি খুব জল দিও। আম উৎসর্গ করিও। জল দিতে কৃপণতা ক’র না। বড় পিপাসায় ম’লাম, জল দিও।’’তৃষিত মরু ছাড়ার আগে,অন্তরের দুঃখের প্রতিফলন গান না গাইতে পেরে অভিযোগহীন আকুতি ছাড়া কিছুই ছিল না আর ।সারা জীবন প্রায় সমস্ত লেখায় – সে “তুমি নির্মল করো মঙ্গল করো’ -হোক বা “তুমি অরূপ স্বরূপ”- হোক, গানের প্রতিটি শব্দবন্ধে যেন তাঁর পরম করুণাময়ের প্রতি কৃতজ্ঞতা ঝরে পড়েছে। অবশেষে ১৯১০ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর নেমে আসে তাঁর ‘দয়ালের ‘পরম আশীর্বাদ,সমস্ত রোগমুক্তি, অমৃতলোকের পথে যাত্রা করেন কান্তকবি রজনীকান্ত।।


More Stories
বাংলা নববর্ষের ইতিহাস
আরেক অভিনেতা প্রণবের অকালপ্রয়াণ
বেজি কি সাপের বিষে কাবু হয় না?