কোয়েলি বনিক, সময় কলকাতা ,২৪ ফেব্রুয়ারিঃ বাংলা ও বাঙালির আবেগ হল ট্রাম। অনেক ইতিহাস আন্দোলন বিক্ষোভ মিছিলের সাক্ষী কলকাতার ঐতিহ্যবাহী যান ট্রাম। পরাধীন ভারতবর্ষের অস্থির সময় থেকে শুরু করে স্বাধীন ভারতবর্ষের রক্তক্ষয়ী নকশাল আন্দোলন সবকিছুর সাক্ষী থেকেছে কলকাতার ট্রাম। ৭৭ এর কংগ্রেস জামানার অবসান ঘটে বামফ্রন্টের যাত্রা শুরুর সাক্ষী থেকেছে কলকাতার ট্রাম। আবার ৩৪ বছরের বাম শাসনের অবসান ঘটে পরিবর্তন দেখেছে কলকাতার ট্রাম। যৌবন ছাড়িয়ে আজ বার্ধক্যে উপনীত হয়েছে কলকাতার ঐতিহ্যবাহী এই পরিবেশবান্ধব যান ট্রাম। বামফ্রন্ট জামানার শেষদিকে প্রশাসনিক স্তরে সিদ্ধান্ত হয় পুরনো ট্রামের আধুনিকরণের। সেইমতো সম্পূর্ণ দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি হয় আধুনিক ট্রাম। পরবর্তী সময়ে কলকাতার রাস্তায় চালু হয়েছে শীততাপ নিয়ন্ত্রিত ট্রাম। শুক্রবার ১৫০ বছরে পা দিল কলকাতা ট্রাম।

ঘোড়ায় টানা জলের গাড়ি আজ তিলোত্তমার ঐতিহ্য। আগে গোটা শহর জুড়ে প্রায় ২৫টি রুটে ট্রাম চলত। কিন্তু, বর্তমানে শুধুমাত্র ধর্মতলা-গড়িয়াহাট এবং বালিগঞ্জ-টালিগঞ্জ রুটে ট্রাম চলছে। ট্রাম নিয়ে বাঙালির বহু স্মৃতি জড়িয়ে। একসময় কলকাতাবাসীর স্কুল কলেজ, ইউনিভার্সিটি, সিনেমা, থিয়েটার, শপিং- সবকিছু জুড়েই ছিল এই ট্রাম। ট্রামের ভূমিকা বাঙালির জীবনে ছিল প্রতি মুহূর্তেই অনিবার্য। বাংলা ভাষার শ্রেষ্ঠ কবি জীবনানন্দ দাশের মৃত্যু হয়েছিল এই ট্রামের চাকাতেই।

এক সময় ট্রামের নাম ছিল জলের গাড়ি। এই গাড়িতে করেই পরাধীন ভারতে ট্র্যাইফিক পুলিশদের জন্য পানীয় জল পৌঁছে দেওয়া হত। তখন ট্রাম টানা হতো ঘোড়া দিয়ে। ১৮৭৩ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি কলকাতায় প্রথম ঘোড়ায় টানা ট্রাম চালু হয়। শুক্রবার সেই ট্রাম পা দিল তার ১৫০তম জন্মদিনে। আগামী রবিবার সেই উপলক্ষে শহরে হবে ট্রাম প্যা রেড। পুরনো জলের গাড়ি ট্রাম থেকে আধুনিক এক কামরার এসি ট্রাম। দেড়শো বছরের ট্রামের বিবর্তনটাকেই দেখানো হবে শহরবাসীকে। সাত-আটটি ট্রাম ঘুরবে। ‘ট্রাম যাত্রা’ নামে ট্রামপ্রেমী সংগঠনের পক্ষ থেকে গড়িয়াহাট-এসপ্ল্যা নেড পর্যন্ত এই ট্রাম প্যা রেডের আয়োজন করা হয়েছে। সহযোগিতায় থাকছে রাজ্যের পরিবহণ দপ্তর।

এদিন জন্মদিনেও ধর্মতলায় নানা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল। সংগীত পরিচালক ইন্দ্রদীপ দাশগুপ্ত ট্রামের উপর একটি থিম সং প্রকাশ করেন। একটি সুসজ্জিত ট্রাম শহরের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে ছুটে চলে আজ। সূত্রের খবর,ট্রামের জন্মদিনে পুনর্জন্ম হল এসপ্ল্যাএনেড থেকে শ্যা মবাজার পর্যন্ত রুটটির। বিগত কয়েক দশকে বহু রাস্তা থেকে তুলে দেওয়া হয়েছে ট্রাম। এক সময় ঐতিহাসিক হাওড়া ব্রিজের উপর দিয়ে চলাচল করতো এই ট্রাম। শুক্রবার থেকে এসপ্ল্যা নেড থেকে ময়দান হয়ে ভিক্টোরিয়া পর্যন্ত চালু হল হেরিটেজ রুট।

ইংরেজ আমলে যাত্রী বোঝাই প্রথম ঘোড়ায় টানা ট্রাম চলেছিল শিয়ালদহ থেকে আর্মেনিয়ান ঘাট পর্যন্ত। ৩.৯ কিলোমিটার পথ ট্রাম শহরের পরিবহণে তৈরি করেছিল ইতিহাস। বর্তমানে শহরে গতি এসেছে। যানবাহন বেড়েছে। আর সেই ভিড়েই হারিয়ে গিয়েছে পরিবেশবান্ধব ট্রাম। এখন মাত্র দু’টি রুটে নিয়মিত নিজের অস্তিত্ব বজায় রেখেছে ট্রাম। নোনাপুকুর ট্রাম ডিপোয় পড়ে থাকা প্রায় ১০০ বছরের পুরনো ট্রামও রবিবার দেখা যাবে শহরের রাস্তায়। ‘কলকাতা-মেলবোর্ন ট্রামযাত্রা’র তরফে হবে চলমান ট্রাম উৎসব। সেখানে থাকবেন মেলবোর্নের ট্রামপ্রেমীরাও। থাকবেন অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্নে ট্রামের প্রাক্তন কন্ডাক্টর-চালক রবার্তো দি আন্দ্রেয়া।


More Stories
গ্রেফতার কলকাতা পুরসভার দুই কাউন্সিলর
আরজিকর কাণ্ডের আইনি ফাঁসে রচনা
গ্রেফতারির ভয়ে আগাম জামিনের আবেদন অরূপ বিশ্বাসের