Home » মাধ্যমিক ফলপ্রকাশ: কিছু আশা, কিছু উদ্বেগ

মাধ্যমিক ফলপ্রকাশ: কিছু আশা, কিছু উদ্বেগ

সময় কলকাতা ডেস্ক, ১৯ মে: ২০২৩ সালের মাধ্যমিক পরীক্ষার ফল সামনে এসেছে। প্রায় ৭ লক্ষ পরীক্ষার্থী মাধ্যমিক দিয়েছিল। মাধ্যমিক পরীক্ষায় সেখানে পাশ করেছে ৫,৬৫,৪২৮ জন। ৭৬ দিনের মাথায় মাধ্যমিক ফলপ্রকাশ করা হয়েছে। পুরুষ পরীক্ষার্থীর তুলনায় মহিলা পরীক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল ২২ শতাংশ বেশি। পাশের হার ৮৬.১৫ শতাংশ। মাধ্যমিকে প্রথম হয়েছে কাটোয়ার দেবদত্তা।

এসব তথ্য এবং তথ্যের অন্তর্গত এবং নিহিত তথ্য তুলে এনেছে এমন কিছু বিষয় যা কয়েক বছর ধরেই আতস কাঁচের তলায় ছিল। বিষয়টি আলোচনার প্রথম স্তরে এ প্রসঙ্গে গত বছরের একটি পরিসংখ্যান তুলে আনা যাক। এই বিষয়টি ৭৬ দিন আগের এক উদ্বেগ ঘিরে। ২০২২ সালে ১০ লাখ ৯৮ হাজার ৭৭৫ জন পরীক্ষার্থী মাধ্যমিক দেয়। ২০২৩ সালে মাধ্যমিক পরীক্ষার্থীর সংখ্যা অনেকটাই কমে যায়। মাধ্যমিক পরীক্ষার্থীর সংখ্যা কম হওয়া নিয়ে প্রশ্ন ওঠে বিভিন্ন মহলে। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১৩-১৪ সালে প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি হয় প্রায় ৬ লাখ ৪০ হাজার শিক্ষার্থী। সেই শিক্ষার্থীরাই ২০২৩ সালে মাধ্যমিক পরীক্ষায় বসে। শিক্ষা দফতরের দাবি ছিল সে কারণেই ২০২৩ সালে পরীক্ষার্থীদের সংখ্যা কমে। শিক্ষামন্ত্রীর দাবি ছিল, আগামী বছর ফের মাধ্যমিকে পরীক্ষার্থীর সংখ্যা ১০ লাখ হয়ে যাবে। কারণ, ২০১৪-১৫ সালে প্রথম শ্রেণিতে ১০ লাখ শিক্ষার্থী ভর্তি হয়েছিল। তারাই সামনের বছর মাধ্যমিক পরীক্ষা দেবে। এই যে মাধ্যমিক পরীক্ষায় পরীক্ষার্থীর সংখ্যা কমছে ও বাড়ছে, তা শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে প্রাথমিকভাবে প্রশ্ন তুলে দেয়। আরেকটি বিষয় সামনে আসে। যে ৭ লক্ষ পরীক্ষার্থী মাধ্যমিক দিয়েছিল তাদের মধ্যে পুরুষ পরীক্ষার্থীর তুলনায় মহিলা পরীক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল ২২ শতাংশ বেশি।

আরও পড়ুন   এই গরমে এক চুমুক লস্যিতে ফিরবে প্রাণ, জেনে নিন এর উপকারিতা

এখানে উদ্বেগ নয়, এখানে জন্মায় আগ্রহ। যে আগ্রহ মে মাসের ১৯ তারিখে এসে দেবদত্তা মাঝির প্রথম হওয়ার মধ্যে দিয়ে একটি এমন তথ্যকে সিলমোহর দেয়, যা পাঁচ বছর আগেই অনুমান করা হয়েছিল। পাঁচ বছরের মধ্যে কোভিড মহামারীর এমন বছরও গিয়েছে, যখন পরীক্ষাও হয়নি। তবুও সার্বিকভাবে বলা ভালো দুটি ভিন্ন ভিন্ন প্রক্রিয়া যে অভিমুখে চলেছে, পাঁচ বছর আগেই তার ইঙ্গিত মিলেছিল। প্রথম বিষয়টির আলোচনা আগেই করা হয়েছে। শিক্ষায় অন্তত বাংলা মাধ্যম নির্ভর শিক্ষা ব্যবস্থায় সামনের দিকে এগিয়ে আসছে মেয়েরা। দেবদত্তা মাঝির প্রথম স্থান এই বিষয়টির একটি দিক হতে পারে। সামগ্রিকভাবে মেয়েদের সাফল্যর ইঙ্গিত মিলেছিল ২০১৮ সালে। ২০১৮ সালে মাধ্যমিক পরীক্ষায় পাশের হার ছিল ৮৫.৪৯ শতাংশ, মোট পরীক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল ১১ লক্ষ ২ হাজার ৯২১ জন। অর্থাৎ প্রায় ১৫ শতাংশ পরীক্ষার্থী অকৃতকার্য হয়েছিল। প্রথম স্থানে ছিল সঞ্জীবনী দেবনাথ। প্রাপ্ত নম্বর ৬৮৯, ৯৮.৪৩ শতাংশ।


অন্যদিকে ওই একই বছরে সিবিএসসি বোর্ডের দশম শ্রেণির পরীক্ষায় পাশের হার ছিল ৮৬.৭০ শতাংশ। সেই থেকে সিবিএসসি পরীক্ষার পাশের হার ক্রমেই বাড়তে থাকে। একইসঙ্গে ২০১৮ সালে আইসিএসই বোর্ডের ফলাফলে পাশের হার ছিল ৯৮.৫১ শতাংশ। মোট পরীক্ষার্থী ১ লক্ষ ৮৩ হাজার ৩৮৭ জন। ২০১৮ সাল থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত এই পাঁচ থেকে ছয় বছর ধরে সমস্ত তথ্য প্রমান যদি জড়ো করা হয়, তাহলে দেখা যাবে মাধ্যমিকে ২০১৮ সালে সঞ্জীবনীর মতই ২০২৩ সালে প্রথম স্থান অধিকার করছে দেবদত্তা। অর্থাৎ মেয়েরা শুধু সংখ্যায় নয়, মেধার ক্ষেত্রেও এগিয়ে আসছে। আজ থেকে পাঁচ বছর আগে মেয়েদের ক্রমবর্ধমান সংখ্যার নিরিখে তৎকালীন মধ্যশিক্ষা পর্ষদের সভাপতি কল্যাণময় গঙ্গোপাধ্যায়ের ব্যাখ্যা ছিল, সব স্তরের মানুষই সন্তানকে অন্তত মাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত পড়ানোর চেষ্টা করছেন। পাশের হারে ছাত্রীরা পিছিয়ে থাকলেও অচিরেই তারা ছাত্রদের ধরে ফেলবে বলে আশা প্রকাশ করেছিলেন তৎকালীন পর্ষদ-সভাপতি। তিনি বলেছিলেন, ‘‘ছাত্র ও ছাত্রীদের মধ্যে ফারাক আগে অনেক বেশি ছিল। ধীরে ধীরে তা কমছে। কমে আসছে।’’

২০১৮ সালে সুনীতি একাডেমি থেকেই প্রথম হয়েছিল সঞ্জীবনী। সেসময় সুনীতি অ্যাকাডেমির ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষিকা মণিদীপাদেবীর পর্যবেক্ষণ, মেয়েদের স্কুলে পাঠানোর ব্যাপারে গ্রামাঞ্চলেও পারিবারিক স্তরে সচেতনতা বাড়ছে। সেই সঙ্গে রাজ্য সরকারের কন্যাশ্রী, সবুজ সাথীর মতো প্রকল্প ছাত্রীদের স্কুলে আসতে আরও উৎসাহ জোগাচ্ছে। এই দুইয়ে মিলিয়েই ছাত্রীর সংখ্যা বেড়ে চলেছে মাধ্যমিক পরীক্ষায়। সরকারি প্রকল্প ছাত্রীদের স্কুলে যেতে খুবই উৎসাহ জোগাচ্ছে বলে মনে করেন প্রতীচী ট্রাস্টের রিসার্চ কো-অর্ডিনেটর এবং ফেলো সাবির আহমেদও। তিনি জানান, সমীক্ষায় দেখা যাচ্ছে, ছাত্রদের মধ্যে পড়াশোনার আগ্রহ কমছে। মাঝপথে পড়াশোনার পাঠ চুকিয়ে অনেকেই রোজগারের পথ বেছে নিচ্ছে। কেউ কেউ চলে যাচ্ছে ভিন রাজ্যে। কেউ কাজ করতে ছুটছে শহরাঞ্চলে। ছেলের রোজগারে সংসারে সচ্ছ্বলতা আসায় মেয়েকে পড়ানোর আগ্রহ দেখাচ্ছে অনেক পরিবার। পাঁচ বছর ধরে যে বৃত্ত নারীশক্তির উত্থানের ইঙ্গিত দিচ্ছিল, সেই বৃত্ত আজ সম্পূর্ণ হওয়ার মুখে। মাধ্যমিকে সংখ্যা ও মেধায় জয়জয়কার তাই মেয়েদের।

আরও পড়ুন   ‘এগরা বিস্ফোরণ কাণ্ডে এখনই এনআইএ তদন্ত নয়’, হাই কোর্টে খারিজ শুভেন্দু অধিকারীর আরজি

পাশাপাশি অশনি সংকেত থাকছে মাধ্যমিকের একটি বিষয় ঘিরে যা এই বিপুল তথ্যরাশি থেকে খুব স্পষ্ট হয়ে উঠবে। গত ৫ বছরে মাধ্যমিকের সর্বোচ্চ নম্বর প্রাপ্ত পরীক্ষার্থীরা ৯৯ শতাংশের গণ্ডি পেরিয়ে গেলেও সার্বিকভাবে পাশের হার কখনই ৮৭ শতাংশ পেরোয়নি। এবারও যা ৮৬.১৫ শতাংশ। অন্যদিকে, অতিমারি পরিস্থিতির মাঝেও শেষ ৫ বছরের মধ্যে ১টি বছর বাদ দিলে জাতীয় স্তরে ২টি বোর্ডের পাশের হার কখনও ৯০ শতাংশের নীচে নামেনি। এই যে ইংরেজি মাধ্যম ও বাংলা মাধ্যমের মধ্যে ফারাক ও ইংরেজি মাধ্যমে সাফল্য এবং বেশি নম্বর পাওয়ার প্রবণতা, তা কিন্তু কমছে না। আর এটাই বাংলা মাধ্যমের জন্য অশনি সংকেত। এবারও কলকাতা বা শহরতলীর ছাত্র-ছাত্রীদের মেধাতালিকায় নাম বিশেষ নেই এবং এর কারণ খতিয়ে দেখলে দেখা যাবে, জেলার জয়জয়কার ও মাধ্যমিকের মেধা তালিকায় কলকাতার পিছিয়ে থাকা বেশ কয়েক বছর ধরেই দেখা যাচ্ছে। তবে শিক্ষাবিদদের একাংশের মত, এর কারণ এরকম নয় যে কলকাতা শিক্ষায় পিছিয়ে পড়ছে। শিক্ষাবিদদের কেউ কেউ বলছেন, শহরের ক্ষেত্রে বিশেষত কলকাতা ও কলকাতার লাগোয়া শহরতলীতে ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে পড়ানোর প্রবণতা বাড়ছে। অর্থনৈতিকভাবে সচ্ছল পরিবারের অভিভাবকরা সন্তানকে ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে পড়াতে চাইছেন। তাই কি মাধ্যমিকে মেধা তালিকায় পিছু হটছে কলকাতা? প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।

About Post Author