পুরন্দর চক্রবর্তী, সময় কলকাতা,৬ জুন : প্রতিটি দেশের একটি রাজনৈতিক ইতিহাস থাকে, যার বহু অধ্যায় থাকে,যা কিছু কিছু ক্ষেত্রে স্বর্ণাক্ষরে, কিছু ক্ষেত্রে বেদনার অক্ষরে লেখা থাকে। বর্তমানের প্রেক্ষাপটে মাঝে মাঝেই প্রকট হয়ে ওঠে অতীত দিনের প্রচ্ছন্ন হয়ে থাকা ইতিহাস, বর্তমান মিশে যায় অতীতের সঙ্গে, বর্তমান তুলনীয় হতে থাকে অতীতের সঙ্গে। ওড়িশার বালেশ্বরে এক মর্মান্তিক রেল দুর্ঘটনার বর্তমান হয়ে ওঠে আমাদের সামনে প্রকট। সম্প্রতি বেঙ্গালুরু-হাওড়া সুপারফাস্ট এক্সপ্রেস, শালিমার-চেন্নাই সেন্ট্রাল করমণ্ডল এক্সপ্রেস এবং একটি পণ্যবাহী ট্রেনের মধ্যে বিধ্বংসী সংঘর্ষে শয়ে শয়ে মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। জানানো হয়েছে , ২৮৮ জন মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। অনেক খেটে খাওয়া মানুষের নাম হয়তো রেলের তালিকাতেও নেই। আহত যাত্রীর সংখ্যা হাজার ছুঁয়েছে বলে জানিয়েছেন রেল আধিকারিকরা। এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ভারতের স্বাধীনতা লাভের পর অন্যতম বৃহৎ প্রাণঘাতী রেল দুর্ঘটনায় পরিণত হয়েছে। এই ঘটনার প্রভাব স্বাভাবিকভাবেই বেশ বড় আকার নিয়েছে। উঠছে প্রশ্ন। ভয়াবহ দুর্ঘটনার পর জবাবদিহি করা হচ্ছে না এমন অভিযোগ উঠছে। কৈফিয়তের অভাব নাগরিকদের মধ্যে ক্ষোভের ঢেউ তুলছে। রেল পরিষেবা ঢেলে সাজানোর পাশাপাশি দাবি করা হচ্ছে রেলমন্ত্রীর পদত্যাগ । রেলমন্ত্রীর পদত্যাগ চেয়ে কখনও পরোক্ষভাবে,কখনও প্রত্যক্ষভাবে তুলছেন বিরোধী রাজনৈতিক শিবির। শারদ পাওয়ার তো পদত্যাগের প্রশ্নে ইতিমধ্যেই ভারতের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ও রেলমন্ত্রী লালবাহাদুর শাস্ত্রীর তুলনা টেনেছেন। রেলমন্ত্রীর পদত্যাগ নিয়ে চৰ্চা অব্যাহত যা ভারতের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে আলোচ্য হয়ে উঠেছে।
রেলমন্ত্রীর পদে আসীন নেতা-নেত্রীদের পদত্যাগ সম্পর্কিত তথ্য বিশ্লেষণের আগে উল্লেখ করা দরকার ভারতের বিধ্বংসী ও মর্মান্তিক ট্রেন দুর্ঘটনা মাঝেমাঝেই ঘটেছে। ইতিহাস বলে, ভারতে ট্রেন দুর্ঘটনা ঘটতেই থাকে, ঘটেই চলে। ইতিহাস এও বলে, কিছু ক্ষেত্রে রেল বিভাগের গাফিলতির দায় নিয়েছেন একাধিক মন্ত্রী। কিন্তু পরিষেবা পাল্টায়নি। যদি ভারতে যে যে ভয়াবহ ও মর্মান্তিক ট্রেন দুর্ঘটনাগুলি ঘটেছে তার দিকে চোখ রাখা যায়, সেক্ষেত্রে বিগত অর্ধশতাব্দীতে বহু ট্রেন দুর্ঘটনা সামনে আসবে, যেখানে প্রতিটি ক্ষেত্রে শতাধিক যাত্রী ট্রেনসফর সেরে আর বাড়ি ফেরেননি। দুর্ঘটনাগুলির মধ্যে উপরের সারিতে থাকবে বেশ কয়েকটি দুর্ঘটনা। প্রাসঙ্গিকভাবে প্রথমেই বলতে হয় বালেশ্বর ট্রেন দুর্ঘটনা ও বিহার ট্রেন দুর্ঘটনার কথা। গত শুক্রবার সন্ধ্যা সাতটার আশেপাশে ওড়িশার বালেশ্বরের কাছে তিনটি ট্রেনের সংঘর্ষ ঘটে। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই পরিষ্কার হয়ে যায় এই দুর্ঘটনা পৃথিবীর সর্বকালের সবচেয়ে মর্মান্তিক ট্রেন দুর্ঘটনাগুলির মধ্যে অন্যতম। ঠিক একদিনের মাথায় মৃত্যু মিছিলে সামিল হয়েছিলেন অন্তত ২৮৮ জন। এই দুর্ঘটনার ৪২ বছর আগে জুন মাসেই বিহার এক ভয়াবহ দুর্ঘটনার সাক্ষী হয়েছিল। ১৯৮১ সালের ৬ জুন, বিহারের সাহারসার কাছে বাগমতী নদীতে একটি যাত্রীবাহী ট্রেন পড়ে যায়। এটি ছিল ভারত এবং বিশ্বের সবচেয়ে বিপজ্জনক ও মর্মান্তিক ট্রেন দুর্ঘটনাগুলির একটি। ৯০০ মানুষকে নিয়ে চলতে থাকা ট্রেনটি উল্টে যায়। ওই ঘটনায় অন্তত ৫০০ জন মানুষ প্রাণ হারিয়েছিলেন বলে জানা যায়। মোট মৃতের সংখ্যা ৮০০ ছাড়িয়ে থাকতে পারে বলে মনে করা হয়। দুর্ঘটনার পরে বেঁচে থাকা সামান্য জীবিত মানুষদের সলিল সমাধি ঘটেছিল। কেউ কেউ মনে করেন, ওই দুর্ঘটনাটি ঘূর্ণিঝড়ের কারণে হয়েছিল। আবার কেউ কেউ দাবি করেছেন যে এটি আকস্মিক বন্যার কারণে ঘটেছিল। পরবর্তী মর্মান্তিক ও উল্লেখযোগ্য ট্রেন দুর্ঘটনা হিসেবে গণ্য ফিরোজাবাদ ট্রেন বিপর্যয় ঘটে ১৯৯৫ সালের ২০ আগস্ট। দিল্লি-কানপুরের মধ্যে ফিরোজাবাদে ৩৫৮ জন যাত্রীর মৃত্যু হয়। ১৯৯৮ সালে উত্তর রেলওয়ের খন্না-লুধিয়ানা বিভাগে খন্নার কাছে ট্রেন দুর্ঘটনার জেরে অন্তত ২১২ জন মানুষ মারা গিয়েছিলেন বলে জানা গেছে। ১৯৯৯ সালে অসমের গাইসালের কাছে আড়াই হাজারেরও বেশি যাত্রী নিয়ে যাচ্ছিল দুটি ট্রেন। গুয়াহাটি থেকে প্রায় ৩১০ মাইল দূরে ট্রেনদুটির মধ্যে ভয়ঙ্কর সংঘর্ষ হয়, এর ফলে ২৯০ জন যাত্রী মারা যান। ২০০২ সালে হাওড়া-নয়া দিল্লি রাজধানী এক্সপ্রেস রাত এগারোটা নাগাদ গয়ার নিকটবর্তী রফিগঞ্জ স্টেশনের কাছে লাইনচ্যুত হয়ে যায়। এই দুর্ঘটনার জেরে ১৪০ জনেরও বেশি যাত্রীর মৃত্যু হয়েছিল। ২০০৫ সালে ভ্যালিগোন্ডা ট্রেন দুর্ঘটনা নদীতে আচমকা বান এসে যাওয়ার কারণে ঘটে যখন কিনা ২০০৫ সালের ২৯ অক্টোবর একটি ছোট রেল সেতু ভেসে যায়। এর উপর দিয়ে তখন যাচ্ছিল একটি ‘ডেল্টা ফাস্ট প্যাসেঞ্জার’ ট্রেন। তৎক্ষণাৎ সেটি লাইনচ্যুত হয় এবং কমপক্ষে ১১৪ জন মানুষ মারা যান। অতঃপর ২০১০ সালে জ্ঞানেশ্বরী এক্সপ্রেস বিপর্যয় আলোড়ন ফেলে। মুম্বইগামী লোকমান্য তিলক জ্ঞানেশ্বরী সুপার ডিলাক্স এক্সপ্রেস দুপুর দেড়টা নাগাদ পশ্চিম মেদিনীপুরের খেমাশুলি এবং সারডিহার মাঝখানে লাইনচ্যুত হয়ে যায়। ওই এলাকায় একটি বিস্ফোরণের কারণে ট্রেনটি লাইনচ্যুত হয়েছিল বলে জানা গেছিল। এরপর একটি মালবাহী ট্রেনের সাথে ধাক্কা লাগে। এটি একটি মাওবাদী হামলা বলে সন্দেহ করা হয়েছিল এবং এর জেরে কমপক্ষে ১৭০ জন মানুষ মারা গিয়েছিলেন। ২০১৬ সালে ইন্দোর পটনা ট্রেন বিপর্যয় ঘটে। ইন্দোর- পটনা এক্সপ্রেস কানপুরের পুখরায়ানের কাছে ২০ নভেম্বর লাইনচ্যুত হয়। কমপক্ষে ১৫০ জন মানুষ মারা গিয়েছিলেন। কোথাও যান্ত্রিক ত্রুটি, কোথাও গরু রেললাইনে এসে পড়ায়, কোথাও বা নাশকতা, কোথাও বন্যা – মানুষের প্রাণ কেড়ে নিয়েছে। কোনও ক্ষেত্রে দায় নিয়েছেন রেলমন্ত্রকের সর্বোচ্চ পদে আসীন ব্যক্তিটি, কোনও ক্ষেত্রে নেননি। ফের বালেশ্বর দুর্ঘটনা সামনে আসার পরেই উঠেছে রেলমন্ত্রীর পদত্যাগের দাবি।
পদত্যাগ? ভারতীয় রাজনৈতিক অঙ্গণে পদত্যাগ খুব কমই দেখা যায়, বিশেষ করে যখন নৈতিক দায়িত্বের বিষয় আসে। যাইহোক, এই ঘটনার তীব্রতার পরিপ্রেক্ষিতে অনেকেই মনে করছেন যে পদত্যাগ একটি প্রতীকী কাজও হয়ে উঠতে পারত প্রাণ হারানো মানুষেদের রক্তের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে। একটি পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্তের প্রয়োজনের জন্য প্রকৃত উদ্বেগ প্রদর্শন ও পদত্যাগ সম্ভবত একটি অনুঘটকের কাজ করত। জবাবদিহি কে করেন ? কেউ তো করেন, কেউ তো করেছেন। সবাই নৈতিক দায়িত্ব কাঁধে নেন না কিন্তু কেউ কেউ তো নেন। সবাই মানবিক হন না, কেউ কেউ তো হন। আর দুর্ঘটনার পরে পদত্যাগ করার দৃষ্টান্ত কাউকে তো প্রথমে স্থাপন করতেই হয়। রেলমন্ত্রীর পদত্যাগ করার দৃষ্টান্ত ভারতে যেমনটা স্থাপন করেছিলেন দেশের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ও প্রাক্তন রেলমন্ত্রী লাল বাহাদুর শাস্ত্রী, পদত্যাগ করেছিলেন রেলমন্ত্রী নীতিশ কুমার । বর্তমান রেলমন্ত্রী পদত্যাগ করবেন কিনা সময়ই সে কথা বলবে।


More Stories
কাকলি ঘোষ দস্তিদার কেন বিস্ফোরক? তাঁর বক্তব্যে কোন ইঙ্গিত?
প্রয়াত প্রাক্তন সাংসদ সুধাংশু শীল
অন্নপূর্ণার লক্ষ্মীরা আসছে