Home » মহালয়াঃ রেডিও-র নস্টালজিয়া

মহালয়াঃ রেডিও-র নস্টালজিয়া

সময় কলকাতা ডেস্ক, ১৪ অক্টোবরঃ   “আশ্বিণের শারদপ্রাতে বেজে উঠেছে আলোকমঞ্জির/ ধরণীর বহিরাকাশে অন্তর্হিত মেঘমালা

                                                              প্রকৃতির  অন্তরাকাশে জাগরিত জ্যোতির্ময়ী জগন্মাতার আগমনবার্তা/ আনন্দময়ী মহামায়ার পদধ্বনি…।”

আজ মহালয়া। পিতৃপক্ষ আর দেবীপক্ষের সন্ধিক্ষণ আজ। পুরাণ মতে ব্রহ্মার নির্দেশে পিতৃপুরুষরা এই ১৫ দিন মনুষ্যলোকের কাছাকাছি চলে আসনে। তাই এই সময় তাঁদের উদ্দেশ্যে কিছু অর্পণ করা হলে তা সহজেই তাঁদের কাছে পৌছায়। তাই গোটা পক্ষকাল ধরে পিতৃপুরুষদেব স্মরণ ও মননের মাধ্যমে তর্পণ করা হয়। আর মহালয়ার দিনে দেবী দূর্গার বোধন করা হয়,বোধন অর্থ জাগরণ। তাই মহালয়ার পর দেবীপক্ষের বা শুক্লপক্ষের প্রতিপদে ঘট বসিয়ে শারদীয়া দুর্গাপূজার সুচনা করা হয়। মহালয়ার পর প্রতিপদে যে বোধন হয়, সে সময় সংকল্প করে দুর্গাপূজার আয়োজন চলে। প্রতিপদ থেকে শুধু ঘটে পূজো ও চন্ডী পাঠ চলে। মহালয়ার সঙ্গে পৌরাণিক যে ভাবনাই জড়িয়ে থাকুক না কেন, বাঙালির কাছে মহালয়া মূলত তিনটি অর্থ বয়ে নিয়ে আসে। প্রথমতঃ মহাপুরুষদের উদ্দেশ্যে তর্পণ, দ্বিতীয়তঃ সাধারণভাবে বাঙালির কাছে দুর্গোৎসবের সূচনা, তৃতীয়তঃ চন্ডীপাঠ। বাঙালির কাছে মহালয়া মানেই রেডিও-র নস্টালজিয়া। ভোরবেলা উঠে রেডিওতে বাঙালি বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের চন্ডীপাঠ না শুনলে বাঙালি দুর্গাপুজোর সূচনা যে হচ্ছে সে উন্মাদনা বোধ করে না।

১৯৩২ সাল থেকে আকাশবাণীতে বরাবরই চণ্ডীপাঠ হয়ে আসছে। ১৯৩২ খ্রিস্টাব্দের চৈত্র মাসে বাসন্তী ও অন্নপূর্ণা পূজার সন্ধিক্ষণে প্রথম সম্প্রচারিত হয় বসন্তেশ্বরী শীর্ষক অনুষ্ঠান, যা মার্কণ্ডেয় চণ্ডীর উপর ভিত্তি করে বাণীকুমারের লেখা একটি বেতার লিপিলিখন। ১৯৬৬ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত অনুষ্ঠানটি সরাসরি সম্প্রচারিত হত। অনুষ্ঠান শুরুর পূর্বে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র স্নান করে শুভ্র পোশাকে এসে শ্লোক পাঠ করতেন। বর্তমানে ১৯৬৬ খ্রিস্টাব্দের রেকর্ডটিই মহালয়ার দিন ভোর চারটের সময় সম্প্রচারিত করা হয়। খালি ১৯৭৬ সালে ব্যতিক্রম হয়। ১৯৭৬ খ্রিস্টাব্দে সরকার মহলের চাপে আকাশবাণী মহিষাসুরমর্দিনীর পরিবর্তে ধ্যানেশনারায়ণ চক্রবর্তী রচিত দেবীং দুর্গতিহারিণীম্ নামে একটি ভিন্ন অনুষ্ঠান মহালয়ার দিন একই সময়ে সম্প্রচার করে। কিন্তু বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের কণ্ঠস্বর এবং মহিষাসুরমর্দিনীর অনুষ্ঠানের বিপুল জনপ্রিয়তার কারণে বাঙালি জনগণ নতুন অনুষ্ঠানটিকে মেনে নেননি। ১৯৭৭ খ্রিস্টাব্দ থেকে আজ পর্যন্ত নির্ধারিত সময়েই মহিষাসুরমর্দিনী সম্প্রচারিত হয়ে আসছে। আর এই মহিষাসুরমর্দিনী শুনতে বাঙালি বোঝে রেডিওকে।

আরও পড়ুন    মহালয়ার সকাল থেকে তর্পণের ভিড়, কলকাতার বিভিন্ন গঙ্গার ঘাটে কড়া পুলিশি নিরাপত্তা

আজও রেডিওতে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের মহিষাসুরমর্দিনী শুনে বাঙালির ঘুম ভাঙে। রেডিওর জনপ্রিয়তা আজও রয়েছে। হয়তো আগের তুলনায় কিছুটা জনপ্রিয়তা কমেছে তবুও মহালয়া, বীরেন্দ্র কৃষ্ণ ভদ্র ও রেডিও জড়িয়ে আছে বাঙালির ভাবনায়। এখনও মহালয়ার আগে বাঙালি রেডিও কিনতে যায়। আজও ভোর হয়েছে রেডিও আর বীরেন্দ্র কৃষ্ণ ভদ্রের মধ্যে দিয়ে। আগের চেয়ে রেডিওর চল কমেছে, কারণ প্রযুক্তি। তবুও মহালয়া, বীরেন্দ্র কৃষ্ণ ভদ্র ও রেডিও সমার্থক। তাই রেডিও কিনতে বা সারাতে দোকানে যান মানুষ। মহালয়ার আগের দিনও গিয়েছিলেন। সংখ্যা কমলেও রেডিও এখনও কিছুটা হলেও বাঙালির মধ্যে যেন রয়ে গিয়েছে। আর এই দিন রেডিওর ব্যবহার বিশেষ মাত্রা বয়ে আনে। মহালয়া আজ। তবুও দিনভর বাঙালি বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রকে এবং স্বর্ণযুগের গায়ক গায়িকাদের কণ্ঠ দু কান ভরে শুনবে। ভোরে রেডিওতে শুনেছে। দিনভর শুনবে। অত্যাধুনিক প্রযুক্তির দিনে ইউটিউব আর বৈদ্যুতির মাধ্যমও রেডিওর প্রভাব সম্পূর্ণ কমাতে পারেনি। আর বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র দেবীপক্ষ জুড়েই রেডিও ছাড়াও অন্য মাধ্যমে বাঙালি মননে থাকবেন। বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র ও মহিষাসুরমর্দিনী রেকর্ডের পরিবেশন ছাড়া বাঙালির কাছে আজও দুর্গাপূজো আসে না। শিউলি ফুল, কাশফুল, ঢাকের বাদ্যির পাশাপাশি বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের চণ্ডীপাঠ ও মহিষাসুরমর্দিনী না শুনলে বাঙালির কাছে মহালয়া আগমনী বা দুর্গাপুজো অসম্পূর্ণ।

About Post Author