সময় কলকাতা ডেস্ক,১৭ অক্টোবর :”জাগো!জাগো, জাগো মা!
জাগো, জাগো দুর্গা, জাগো দশপ্রহরণধারিণী।
অভয়া শক্তি, বলপ্রদায়িনী, তুমি জাগো।
জাগো, তুমি জাগো।”” ধর্ম মেয়েদের চিরকালের শত্রু। ধর্ম মেয়েদের শেকল পরায়।আমি কথা মানবী স্বহস্তে ঈশ্বরের পূজা করতে গেলাম, ধর্ম বলল পূজা পুরুষের অধিকার, ব্রাহ্মণ পুরুষের। আমি প্রতিবাদ করলাম, ধর্মের কবি তুলসীদাস বললেন , ” ঢোল গাওয়ার শূদ্র পশু নারী / ইয়ে সব হ্যায় তাড়ন কে অধিকারী ” কথামানবী কাব্যগ্রন্থে লিখেছেন মল্লিকা সেনগুপ্ত। চিরকাল ধর্মে নারীদের অধিকার খর্ব করা হয়েছে। যে ধর্মই হোক, সনাতন বা ইসলাম,সে কেরালার শবরীমালা মন্দিরে নারীর প্রবেশের ক্ষেত্রে হোক বা খোরপোষ চাওয়া শাহবানু হোক নারীমুক্তির ক্ষেত্রে বাধার উঁচু প্রাচীর। আর প্রাচীর ভাঙার ছবি পূর্ব বর্ধমানের একটি দুর্গাপুজো আয়োজনে, যেখানে নারী স্বাধীনতাই দুর্গাপুজোর মূল বৈশিষ্ট্য।
জঙ্গলমহল এলাকার গোস্বামীখণ্ড গ্রামের বন্দ্যোপাধ্যায় বাড়ির দুর্গাপুজোর বয়স ৩০০ পেরিয়েছে। এই বাড়িতে প্রথম দুর্গা পুজোর প্রচলন করেন বংশের আদি পুরুষ গোপীনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর তৈরী দুর্গা মন্দিরটি ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় পুরনো মন্দিরটির পাশে ১৮৫৮ সালে একটি নতুন দুর্গা মন্দির নির্মাণ করেন গোপীনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রপৌত্র সারদাপ্রসাদ বন্দ্যোপাধ্যায় ও গোপালপ্রসাদ বন্দ্যোপাধ্যায়। এই মন্দিরেই বর্তমানে দুর্গাপুজো হয়।
উল্লেখ্য,পূর্ব বর্ধমানের জঙ্গল মহল আউসগ্রাম, এর মধ্যে ছোট্ট গ্রাম গোস্বামী খণ্ড। আনুমানিক প্রায় তিনশো বছর আগে এই গ্রামে জমিদারি কেনেন বন্দ্যোপাধ্যায় পরিবারের পূর্বসূরিরা। সেই থেকে এখানে দুর্গাপুজো শুরু করেন। বন্দ্যোপাধ্যায় পরিবার বাইরে থেকে এসে আউসগ্রাম ২ নম্বর ব্লকের গোস্বামী খণ্ডতে জমিদারি কিনেছেলেন। তবে তারা কোথা থেকে এসেছিলেন এবিষয়ে কোন তথ্য পরিবারের বর্তমান সদস্যরা দিতে পারেন নি। নারী স্বাধীনতাই এই দুর্গাপুজোর মূল বৈশিষ্ট্য বলে জানাচ্ছেন পরিবারের সদস্যরা। পুজোর পনেরো দিন আগে কৃষ্ণ নবমীর দিন এখানে মায়ের বোধন হয়। শোনা যায় কোন এক সময়ে পুজোর সময়ে মায়ের মূর্তি নড়ে উঠেছিল। সেই থেকে ষষ্ঠীর দিন মাকে বেদিতে তুলে শেকল দিয়ে বেঁধে রাখা হত। এখনো সেই ধারা বজায় রেখে মাকে বেদিতে বেঁধে রাখা হয়। তবে এখন আর শেকল দিয়ে নয়, দড়ি দিয়ে মাকে বেঁধে রাখা পুজোর ক’দিন। এছাড়াও আগের মতই আচার আচরণ মেনে মা পুজিতা হয় এখানে।
সপ্তমী থেকে নবমী পর্যন্ত একটি ঘি ও একটি সরষের তেলের প্রদীপ সর্বক্ষণের জন্য জ্বেলে রাখা হয়। দশমীর দিন কুমারী পুজো হয়। সেই কুমারী পুজোর দ্বায়িত্ত্বে থাকেন পরিবারের একজন মহিলা। মন্ত্র বলা থেকে আয়োজন, সবেটাই সামলাতে হয় সেই মহিলা সদস্যাকে। এতদিন পর্যন্ত এই গ্রামে শুধুমাত্র বন্দ্যোপাধ্যায় পরিবারই দুর্গাপুজো হত। গ্রামের সমস্ত মানুষজন পুজোর আনন্দ ভাগ করে নিতেন একে অপরের সাথে। তবে এবছর এই গ্রামে একটি সার্বজনীন দুর্গাপুজো হচ্ছে।
এখানে পুজোর কিছু বিশেষত্ব আছে। রথযাত্রার দিন সকালে হয় কাঠামো পুজো। ওই দিনই মায়ের গায়ে প্রথম গঙ্গামাটি দেন কুলপুরোহিত। বংশ পরম্পরায় তাঁরা মায়ের পুজো করে আসছেন। আগে মৃৎশিল্পীও বংশপরম্পরায় মূর্তি গড়তেন, কিন্ত বর্তমান প্রজন্ম এই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত না থাকায় নতুন মৃৎশিল্পী এসেছেন। তিন চালার সোলার সাজের মূর্তি। এখানে দুর্গার রং শিউলি ফুলের বোঁটার মতো। আগে একচালার প্রতিমা হলেও বর্তমানে বিসর্জনের সুবিধার জন্য সামান্য পরিবর্তন করা হয়েছে। মায়ের শোলার সাজও বংশপরম্পরায় তৈরি করেন স্থানীয় মালাকাররা।সবমিলিয়ে গোস্বামী খন্ডের দুর্গাপুজোয় অশুভ বিনাশের আবাহনে নারীশক্তির জাগরণ ঘটে।
“এই শিকল পরা ছল মোদের এ শিকল-পরা ছল।/
এই শিকল পরেই শিকল তোদের করব রে বিকল॥” তাই শেকল বা দড়ি যতই থাকুক গোস্বামীখন্ডে, এখানে দেবী ব্যতিক্রমী। এখানে ধর্ম নারীদের শত্রু নয় বরং প্রবলভাবে নারী স্বাধীনতার সমার্থক।
একটি অঞ্চলে আবহমান কাল ধরে একটি পুজো তার আচারে রীতিতে মৃন্ময়ীর আরাধনার ক্ষেত্র হয়ে ওঠে, ঠিক সেভাবেই পূজার বিরাট কর্মযজ্ঞে নারীদের স্বাধীনতা দিশা পায়। বনেদি বাড়ির পুজোতে নারীরা সর্ব ক্ষমতাবান হয়ে ওঠে, বর্তমানের দুর্গারা পায় প্রেরণা, আগামীর দুর্গাদের মর্ত্যলোকের রাস্তা হয়ে ওঠে মসৃন ।।


More Stories
দেবীপ্রতিমা তৈরীর মাটি সংকট কাটল মুখ্যমন্ত্রীর উদ্যোগে
হর্ষ-বিষাদে পালিত ঈদ-উল-আযহা
বাংলা নববর্ষের ইতিহাস