পুরন্দর চক্রবর্তী,সময় কলকাতা , ১৬ জানুয়ারি :2024 Lok Sabha Elections ব্যবধান বেড়ে হবে ২ লক্ষ ২২ হাজার।যেদিন বনগাঁ লোকসভা কেন্দ্রে বিজেপি প্রার্থী হিসেবে শান্তনু ঠাকুরের নাম ঘোষণা হল সেদিন বনগাঁ বিধানসভা কেন্দ্রের তথা বনগাঁ সাংগঠনিক জেলার বিজেপি নেতারা এরকমই স্লোগান তুলেছিলেন। এঁদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন দেবদাস মন্ডল। ২ লক্ষ ২২ হাজার স্লোগানের নেপথ্যে কারণ ছিল অঙ্ক দ্বিগুণ করার ফর্মুলা। ২০১৯ সালে বনগাঁ লোকসভা কেন্দ্রে শান্তনু ঠাকুর তৃণমূলের মমতা ঠাকুরকে ১ লক্ষ ১১ হাজার ভোটে হারিয়ে দিয়েছিলেন। লিড দ্বিগুন হবে, আশা এবং লক্ষ্য ছিল এমনটাই। কিন্তু তার পরে পাঁচ পক্ষ কাল কেটেছে। এই বনগাঁ লোকসভা কেন্দ্রের প্রার্থীর নাম ঘোষণা থেকে ভোটগ্রহণ – আড়াই মাসে পরিস্থিতি যা দাঁড়িয়েছে, তাতে দু লাখ বলার,পুরোনো স্লোগান তোলার জায়গা আর নেই। ঢোক গিলতে হচ্ছে বিজেপি নেতাদের।এখন স্রেফ জয় চাই।শান্তনু ঠাকুরের জয় কতটা নিশ্চিত তা নিয়ে এখন মাপজোখ চলছে।

কেন এরকম হচ্ছে বা হতে চলেছে? নির্বাচন নিয়ে এত ভাবতে হচ্ছে কেন শান্তনু ঠাকুরকে? শান্তনু ঠাকুর কেন্দ্রের মন্ত্রী হয়েছেন, বিপুল ভোটে জয়ী হয়েছেন, সীমান্তবর্তী জেলার ভারত বাংলাদেশ পেট্রাপোল বন্দর সংলগ্ন বিস্তীর্ণ অঞ্চলে বিজেপির আধিপত্য কায়েম হয়েছে, ২০২১ সালের বিধানসভা ভোটে ছ জন বিজেপির বিধায়ক এই লোকসভা কেন্দ্র থেকে নির্বাচিত হয়েছেন। তার উপরে শান্তনু ঠাকুর মতুয়া সংঘাধিপতি। বঙ্গের ৪২ টি লোকসভা কেন্দ্রে এত মতুয়া ভোট আর কোথাও নেই, এখানে সিংহভাগ মানুষ মতুয়া সম্প্রদায়ভুক্ত ভোটার। মতুয়া ভোট এখানের ভাগ্য গড়ে দেয়।তাহলে হল টা কি? কোন বলে, কোন শক্তিতে তৃণমূল প্রার্থী বিশ্বজিৎ দাস জয়ের কথা শোনাচ্ছেন? বিশ্বজিত দাস শুধু কেন? কংগ্রেসের প্রদীপ কুমার বিশ্বাস বিশ্বাসী হয়ে উঠছেন যেন! তাঁরা ভাবছেন শিকে তাদের ভাগ্যে ছিঁড়ে পড়তে পারে। তবে বাম কংগ্রেসের চেয়ে তৃণমূলের সংগঠন মজবুত, রাজ্যে তারা শাসক দল তার উপরে তৃণমূলের ভোট খুব একটা কম নেই বনগাঁয়। তাই বিজেপির নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী নিঃসন্দেহে তৃণমূল। যত দিন যাচ্ছে বিশ্বজিত দাসের আত্মবিশ্বাস যেন বেড়েই চলেছে। তৃণমূল কোনওরকমে জিততে চাইলেও বিজেপির তা নিয়ে দুশ্চিন্ত থাকার কোন কারণ ছিল না। তবুও বিজেপিকে জোর কদমে প্রচার করতে হচ্ছে জয় নিশ্চিত করার জন্য। এরকম ডামাডোল হল কেন? বিজেপির নিশ্চিত জয়ের আসন মনে হওয়া বনগাঁয় সমস্যাটা কী?
আদতে বিজেপির সমস্যা ছিল এক, হয়েছে আরেক। গৃহদ্বন্দ্ব না হয় মিটেই গিয়েছে। ভোটের আগে একসময় জোর গুঞ্জন ছিল, শান্তনু ভ্রাতা গাইঘাটার বিধায়ক সুব্রত ঠাকুর প্রার্থী হবেন। কাদের? না, তৃণমূলের। গুঞ্জন ছিল, তাঁর সঙ্গে নাকি তৃণমূলের সেকেন্ড কম্যান্ড ইন চিফের এক প্রস্ত কথাও হয়েছিল। তা যাই হোক, মাথার ওপরে আছেন মঞ্জুল কৃষ্ণ ঠাকুর, অন্যদিকে দেখা দিলেন শুভেন্দু অধিকারী। শুভেন্দু ঠাকুরনগরের ঠাকুরবাড়িতে এসে জানিয়ে দিলেন কোনও কলহ নেই। ঘটা করে জানাতে হল কেন? সমস্যা না থাকলে শুভেন্দু আচমকা এসেছিলেন কেন? উল্লেখ্য, উক্ত দিনে সাংবাদিক সম্মেলনে শুভেন্দু এবং শান্তনুর পাশে বসে সুব্রত এক ফাঁকে জানান,২০১৫ সালে বিজেপির হয়ে বনগাঁর লোকসভা উপ-নির্বাচনে তিনি হেরেছিলেন ঠিকই কিন্তু তখন বিজেপির সংগঠন কোথায় ছিল? যোগ্য মর্যাদা না পাওয়ার ক্ষোভ তাঁর গলায় ধরা পড়লেও তবুও আর বেশি উচ্চবাচ্য করেন নি বনগাঁ লোকসভা কেন্দ্রের অধীনে থাকা গাইঘাটা বিধানসভা কেন্দ্রের বিধায়ক সুব্রত ঠাকুর। তিনি চুপ করে যান।
তবে দীর্ঘদিন ধরেই বনগাঁ লোকসভা কেন্দ্রের বিভিন্ন বিধানসভা কেন্দ্রে শান্তনু ঠাকুরের সঙ্গে গোলযোগ বেঁধেছিল দলীয় বিভিন্ন বিধায়কদের। শান্তনু ঠাকুরের ঔদ্ধত্য অপরিসীম এবং তিনি স্বেচ্ছাচারী এবং একক সিদ্ধান্তে বনগাঁ সংসদীয় ক্ষেত্র পরিচালনা করার চেষ্টা করেন বলে তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে বিভিন্ন বিধায়ক এবং বিজেপির কিছু কর্মীর তরফে ।
শান্তনুর বিরুদ্ধে বিদ্রোহে ভাই সুব্রত চুপ হয়ে গেলেও এত সহজে থামানো যায়নি বনগাঁ দক্ষিণ কেন্দ্রের বিধায়ক স্বপন মজুমদার ও হরিণঘাটা কেন্দ্রের বিধায়ক অসীম সরকারকে। স্বপন মজুমদার দাবি করে থাকেন মতুয়া সংগঠনকে বিজেপির আওতায় এনেছেন তিনি। শান্তনুর আধিপত্য তিনি মানতে নারাজ ছিলেন। অসীম সরকার আবার এককাঠি সরেস। তিনি মাঝেমধ্যেই শান্তনুর বিরুদ্ধে আলটপকা মন্তব্য করতে থাকেন। একটি অডিও ভাইরাল হয়, যে কণ্ঠস্বর জানায় মঞ্জুল ও শান্তনু নাকি নেশাসক্ত। পরে অবশ্য অসীম সরকার দাবি করেন , উক্ত অডিও তাঁর কণ্ঠস্বর নয়। কিন্তু বিধায়কদের সঙ্গে সাংসদদের সম্পর্কের অবনতি হয়েই চলেছিল। উপরোক্ত দুজন বিধায়কের প্রাইজ টিকিট মেলে যথাক্রমে বারাসাত লোকসভা কেন্দ্রে এবং বর্ধমান পূর্ব লোকসভা কেন্দ্রে। বিজেপি তাদের প্রার্থী করে দেয়। প্রার্থীপদ পাবেন নিশ্চিত হয়েই শান্তনুর সঙ্গে দীর্ঘদিন বাদে একসাথে প্রচারে দেখা যায় স্বপন মজুমদারকে। ঝামেলা অনেকটাই কমে আসে।

স্বরূপনগরে অবশ্য তৃণমূলের লিড পাওয়া মোটের ওপরে নিশ্চিত। প্রসঙ্গত, বনগাঁ লোকসভা কেন্দ্রের মধ্যে স্বরূপনগর বিধানসভা অঞ্চল ভৌগোলিক ও সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিকোণ থেকে থেকে অন্য ছটি বিধানসভা কেন্দ্রের চেয়ে একেবারেই আলাদা। এখানে মতুয়া সম্প্রদায়ের ভোটের বিশেষ প্রভাব নেই। এখানে বিধায়ক ও তৃণমূল থেকে নির্বাচিত।
স্বরূপনগর ছাড়া অন্য যে বিধানসভা কেন্দ্রগুলি রয়েছে তার মধ্যে বাগদার বিধায়ক ছিলেন লোকসভা ভোটে তৃণমূলের প্রার্থী বিশ্বজিৎ দাস স্বয়ং যিনি তৃণমূল থেকে বিজেপি আবার বিজেপির থেকে তৃণমূলে ফিরেছেন। এছাড়া বাকি পাঁচটি কেন্দ্রে বিজেপির আধিপত্য নিয়ে প্রশ্ন ওঠার কথা নয় । তাহলে সমস্যা কী?

সমস্যা আর কিছু নয়। সমস্যা মতুয়াদের এক অংশের পাশে না থাকা , সিএএ নিয়ে কিছু ক্ষোভ এবং বনগাঁ কেন্দ্রে মতুয়া সম্প্রদায় সমর্থিত নির্দল প্রার্থী সুমিতা পোদ্দার। সদ্য প্রয়াত সিনেমা অভিনেত্রী শ্রীলা মজুমদারের কথা মনে পড়ে যেতে পারে সুমিতা পোদ্দারকে দেখলে। নির্বাচন ও রাজনীতির ক্ষেত্রে নতুন হলে কী হবে,বলেন ও মন্দ না। তাঁর সাফ কথা, সিএএর নিঃশর্ত নাগরিকত্বের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও তা পালন করা হয় নি। মতুয়াদের সঙ্গে চক্রান্ত করা হয়েছে এবং শান্তনু ঠাকুর একের পর এক ” ভুয়ো কথা” বলেছেন। সুমিতা পোদ্দার এবং সুমিতা পোদ্দার মতুয়া সম্প্রদায়ের যে অংশের মুখপাত্র ও প্রতিনিধি তাঁরাই গলার কাঁটা শান্তনু ঠাকুরের। সিএএর “শর্ত ” নিয়ে বেশ আপত্তি আছে, নইলে মতুয়া সম্প্রদায়ের খুব কম অংশের ভোট, স্বরূপনগর আর বাগদার বেশ কিছুটা ভোট নিয়েও বিশ্বজিৎ দাস লড়াইয়ে টিকেই উঠতে পারতেন না । শান্তনু ঠাকুর অবশ্যই এগিয়ে আছেন, কিন্তু মার্জিন যে কমছেই এনিয়ে সংশয় নেই। শান্তনু ঠাকুরের লড়াই এখন জয়ের নিশ্চয়তার জন্য, মার্জিন বাড়ানোর স্লোগান হাওয়ায় উবে গিয়েছে।।


More Stories
ব্রাজিলের জনবহুল এলাকায় আচমকাই ভেঙে পড়ল যাত্রীবাহী বিমান, পাইলট-সহ বিমানের ৬২ জন যাত্রীর মৃত্যু
বারাসাতে মেট্রো রেল নিয়ে সংসদে মুখর কাকলি ঘোষ দস্তিদার ঠিক কী বললেন?
অধীর চৌধুরী নিজে ডুবলেন, ইন্ডিয়া জোটকে ডোবালেন, বাঁচালেন এনডিএ ও বঙ্গ বিজেপিকে