পুরন্দর চক্রবর্তী ও চুমকী সূত্রধর, সময় কলকাতা,১৬ জুন :2024 Lok Sabha Elections যিনি পার্থ তিনিই অর্জুন। মহাভারত অন্তত তাই বলে। মহাভারতের যুদ্ধের অর্জুন ও পার্থ একই চরিত্র হলেও আধুনিক মহাভারতের যুদ্ধে অর্জুন এবং পার্থ ভিন্ন ভিন্ন চরিত্র হয়ে সম্মুখ সমরে। সারাদেশের চোখ তাঁদের দিকে। লোকসভা নির্বাচনের পঞ্চম দফায় মুখোমুখি তাঁরা। বাঙালি- অবাঙালি – শিল্পাঞ্চল বিবিধ আঙ্গিকে সজ্জিত ব্যারাকপুর লোকসভা কেন্দ্রের তৃণমূল – বিজেপি যুদ্ধ প্রকৃত অর্থেই মহাভারতীয় যুদ্ধ। পার্থ ভৌমিক বনাম অর্জুন সিংহের লড়াইয়ে একদা পাটকল – শিল্পাঞ্চল অধ্যুষিত সিপিআইএমের গড় ব্যারাকপুরে এবারের সিপিআইএম প্রার্থী দেবদূত ঘোষ একেবারেই পার্শ্ব চরিত্র হয়ে উঠেছেন। বামেদের বিশেষ সম্ভাবনা ব্যারাকপুর লোকসভা কেন্দ্রের ভোটে এবার অন্তত নেই। ব্যারাকপুরের লোকসভা ভোট শুধুই যেন পার্থ – অর্জুনের যুদ্ধ ।

সম্মানের ও অস্তিত্ব বাঁচানোর লড়াই। নিন্দুকেরা বলছে টাকা উড়ছে আকাশে। একজনের কাছে সম্মানের প্রশ্ন, অন্যজনের কাছে অস্তিত্ব বাঁচানোর প্রশ্ন। দীর্ঘ রাজনৈতিক পথ চলার পরে ব্যারাকপুর লোকসভা আসনে অর্জুন সিংহের কাছে সবচেয়ে বড় বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে যে, তাঁর রাজনৈতিক ক্যারিয়ার প্রশ্নচিহ্নের মুখে পড়ে যাবে যুদ্ধে হারলে। অস্তিত্ব বাঁচাতে হবেই। পার্থ ভৌমিকের কাছে বিষয়টি অন্যরকম। তিনি ২০২১ সালে যুদ্ধে জেতার পরে বহাল তবিয়তে তাঁর থাকার কথা। তবুও যুদ্ধে কেউ হারতে নামে না। এই লোকসভা ভোটে ব্যক্তিগত প্রাপ্তির জন্য লড়ছেন না বরং তিনি দলের জন্য লড়ছেন। তাঁর কাছে এবারের ভোট সম্মানের প্রশ্ন, তৃণমূলের ঝান্ডা ব্যারাকপুরে তুলে ধরার জন্য তাঁকে অনেক কিছু খোয়াতে হতে পারে। ব্যারাকপুরে অর্জুন – পার্থ লড়াইয়ে আপাতদৃষ্টিতে কেউ এগিয়ে নেই, কেউ পিছিয়ে নেই। তবুও অঙ্ক বলছে পার্থ ভৌমিক এগিয়ে আছেন, যুক্তি বলছে অর্জুন সিংহ এগিয়ে আছেন। কেন?
যুক্তি বলছে এই যুদ্ধে নামার কথাই ছিল না পার্থ ভৌমিকের। এত চুলচেরা হিসেব করারও দরকার ছিল না। অর্জুন সিংহ বিজেপি থেকে তৃণমূলের ঘরে ফিরেছিলেন। তাঁকে তৃণমূলের সভায় ব্রিগেডে দেখাও গিয়েছিল। তাঁকে ব্যারাকপুরে প্রার্থীপদ না দেওয়ার পরে আবার তিনি বিজেপিতে চলে যান। ইতিমধ্যে একটি অন্য কাহিনীর জন্ম নেয় – পার্থ ভৌমিককে উপরোধে ঢেঁকি গিলতে হয়। বেশ ছিলেন, একাধিক দফতরের মন্ত্রীত্ব ছিল। অর্জুন সিংহকে নখদন্তহীন করে রাজ চক্রবর্তীকে প্রার্থী করার বৃত্তে থেকেই বেঁধে যায় গোলমাল। রাজ চক্রবর্তী পারবেন না অর্জুনকে টক্কর দিতে, শীর্ষ নেতৃত্বের ফরমান ছিল পার্থ ভৌমিককেই লড়তে হবে। নইলে কোথায় যুদ্ধ, কোথায় মহড়া! অর্জুন সিংহকে তৃণমূল প্রার্থীপদ দিলে মহাভারতের যুদ্ধ হতই না। আবার হয়তো হত। কারণ সোমনাথ শ্যাম, সুবোধ অধিকারীরা যে ছিলেন!
বাস্তব হ’ল, অর্জুন থাকবেন, অথচ যুদ্ধ হবে না – তা হয় না। ২০১৯ সালে যুদ্ধ এরকম আবহেই হয়েছিল। তৎকালীন বিধায়ক অর্জুন সিংহের চোখ ছিল সাংসদ পদের দিকে। ২০০৪ সালে তিনি তড়িৎ বরণ তোপদারের কাছে সাংসদ পদের নির্বাচনে হেরে গিয়েছিলেন তৃণমূলের টিকিটে। ১৫ বছর ধরে সাংসদ হওয়ার ইচ্ছে অঙ্কুর থেকে বৃক্ষের আকার নেয় অর্জুনের মধ্যে। অতঃপর ২০১৯ সালে বিজেপির হয়ে সাংসদ হওয়ার লড়াইয়ে সাধারণ মানুষের চোখে সুবক্তা ও পন্ডিত এবং ‘ভিন গ্রহের মানুষ ‘ দীনেশ ত্রিবেদীর মুখোমুখি হন। তাঁর আগের বার, ২০১৪ সালে, দীনেশ ত্রিবেদী, সিপিআইএমের সুভাষিনী আলিকে ২ লক্ষ ৭ হাজার ভোটে হারিয়ে দেন। বিজেপি ছিল তৃতীয় স্থানে। ফলে তৃণমূল ভাবেনি অর্জুন সিংহ বাজিমাত করবেন। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় এক কদম এগিয়ে, ভোটের আগে ঘোষণাই করে দেন, দীনেশ ত্রিবেদী অর্জুনকে অন্তত দু লক্ষ ভোটের ব্যবধানে হারাতে না পারলে রাজনৈতিক সন্ন্যাস নেবেন। ভাগ্য লক্ষ্মী মুচকি হাসছিলেন, ভোটে ১৪ হাজারের বেশি ভোটে জিতে যান অর্জুন সিংহ। ভোটের পরে আলাপচারিতায় অর্জুন সিংহ বলেছিলেন, সারা বছর মানুষের কাজ, ভোটের প্রচার একরকম আর ভোটের দিনের ফর্মুলা আরেকরকম। কে না জানে ভোট করাতে হয়! তাঁর নাম যে অর্জুন সিংহ, তিনি ভোট কিভাবে করাতে হয় জানেন। তাঁর চোখ পড়ে আছে তাই আমডাঙ্গা বিধানসভা অঞ্চলের দিকে। কেন আমডাঙ্গা? বাকি ছয়টি বিধানসভা কেন্দ্রের দিকে নজর রাখলেই বিষয়টি পরিষ্কার হবে। কারণ অর্জুন সিংহ বুঝতে পারছেন পার্থ ভৌমিকের গড় নৈহাটি এবং মুকুলের অনুপস্থিতিতে সুবোধ অধিকারী তাঁকে বীজপুরে সহজে এক ইঞ্চি জমি ছাড়বেন না। জগদ্দলে রয়েছেন সোমনাথ শ্যাম। অর্জুনের সঙ্গে সোমনাথের সম্পর্ক অহি-নকুলের, সে কথা কে না জানে। ভাটপাড়া অর্জুনের গড় – বিজেপি সেখানে লিভ নেবেই একথা প্রায় নিশ্চিত। ব্যারাকপুরের ভোটারদের রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া অনুভব করা যাচ্ছে ভোটের ঠিক আগে।নোয়াপাড়াতেও লড়াই সেয়ানে সেয়ানে। ফলে অঙ্কের হিসাবে খুব মজবুত জায়গায় নেই অর্জুন সিং। তাই আমডাঙ্গাতে আলাদা করে নজর দিতেই হচ্ছে, যেখানে প্রবল শক্তি নিয়ে বিরাজ করছে আইএসএফ সংগঠন। আইএসএফ যা ভোট টানবে, সেই ভোট তৃণমূলের ভোট ব্যাঙ্কে ধস হয়ে দেখা দেবে, সেটুকুর দিকেই তাকিয়ে বসে নেই অর্জুন সিং। কি করে আমডাঙ্গার ভোট বিজেপির দিকে আসে, সেজন্য আলাদা ছক সাজিয়েছেন অর্জুন। তৃণমূল বা আইএসএফ যেদিক থেকেই হোক, বিজেপি আমডাঙ্গায় লিড নিতে মরিয়া। আর এজন্য তৃণমূলের একটি অংশকে ব্যবহার করা হচ্ছে বলে গুঞ্জন। সবমিলিয়ে অর্জুন লক্ষ্যভেদ করতে সংকল্প নিয়েছেন। অথচ পাটিগণিতের হিসেব বলছে পার্থ ভৌমিক এগিয়ে।

পার্থ – অর্জুনের যুদ্ধ বাস্তব দিক থেকে বিচার করলে, অর্জুন সিংহ বেশ কিছু দিক থেকে এগিয়ে থাকলেও একদিকে অবশ্যই পিছিয়ে। ভোট করাতে জানলেও তাঁর মেশিনারী আর অক্ষত নেই বারবার দলবদলের ফলে। কিন্তু অর্জুনের বেশ কিছু প্লাস পয়েন্ট রয়েছে। অর্জুন সিংয়ের ব্যক্তিগত ক্যারিসমা এই ভোটে যথারীতি কাজ করবে। দ্বিতীয়ত, অর্জুন সিংহের গ্রহণযোগ্যতা এবং সহজে তাঁর কাছে পৌঁছে যাওয়ার বিষয় ভোটারদের কিছুটা হলেও প্রভাবিত করতেই পারে। তার সঙ্গে রয়েছে ব্যারাকপুরের অবাঙালি ও শিল্পাঞ্চলে বিভিন্ন আঙ্গিক থেকে মোদি ও বিজেপির প্রভাব। ব্যারাকপুর লোকসভা কেন্দ্রে অন্তত ৩৫ শতাংশ অবাঙালি ভোট রয়েছে, যার বেশিরভাগ অর্জুন সিংহের দিকে ঝুঁকে এমনটাই মনে করা হয়। আবার, শিল্পাঞ্চল কেন্দ্রিক ভোটেও ব্যক্তিগতভাবে প্রভাব রয়েছে অর্জুন সিংহের। এই ভোটে থাবা বসাতে চাইছে তৃণমূল, তাহলেই পার্থ ভৌমিকের জয়ের রাস্তা সুগম হয়ে উঠতে পারে। অন্যদিকে, তৃণমূলের ভোটব্যাঙ্ক যে দুর্বল এমনও নয়। অর্জুন সিং না থাকায় এখন তৃণমূলের গোষ্ঠীদ্বন্দ্বও কম। সোমনাথ শ্যামের মত নেতারা চাইছেন যেকোনও মূল্যে পার্থ ভৌমিকের জয়। রাজনৈতিকভাবে পার্থ ভৌমিক বেশ ভালো জায়গায় রয়েছেন। কিন্তু প্রতিপক্ষ যে অর্জুন সিং। ভোট গণনা শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাই বোঝা সম্ভব নয় কে শেষ হাসি হাসবেন। জমকালো আবহে ২০ মে ব্যারাকপুরে হতে চলেছে কুর্শির লড়াই,হতে চলেছে পার্থ – অর্জুনের যুদ্ধ, বলা ভালো- হতে চলেছে মহাভারতের যুদ্ধ।।


More Stories
ব্রাজিলের জনবহুল এলাকায় আচমকাই ভেঙে পড়ল যাত্রীবাহী বিমান, পাইলট-সহ বিমানের ৬২ জন যাত্রীর মৃত্যু
বারাসাতে মেট্রো রেল নিয়ে সংসদে মুখর কাকলি ঘোষ দস্তিদার ঠিক কী বললেন?
অধীর চৌধুরী নিজে ডুবলেন, ইন্ডিয়া জোটকে ডোবালেন, বাঁচালেন এনডিএ ও বঙ্গ বিজেপিকে