পুরন্দর চক্রবর্তী ও চুমকী সুত্রধর, সময় কলকাতা,২৪ মে : “হাতি ঘুরছে কিলবিল করে, সন্ধ্যে নামলেই গ্রামে – বাজারে হাতি নেমে আসছে, ক্ষতি হচ্ছে প্রচুর, মানুষও মরছে অথচ নেতা – নেত্রী – পার্টিদের হেলদোল নেই।” এক প্রবীণ যা বললেন ঝাড়গ্রামের আমজনতার মনের এবং মুখের কথা তাই। ভোটের আগে হাতি সমস্যাই সবচেয়ে বড় মাথাব্যথার কারণ ঝাড়গ্রামবাসীর কাছে। ঝাড়গ্রাম লোকসভা কেন্দ্রে সত্যি মোদি থেকে দিদি সবাই আসছেন, ঝড় তুলে প্রচার করছেন বিজেপি প্রার্থী প্রণত টুডু এবং তৃণমূল প্রার্থী কালীপদ সোরেন তবুও মানুষের ক্ষোভ যাচ্ছে না। ঝাড়গ্রাম লোকসভা কেন্দ্রে দিল্লি দখলের লড়াইয়ে যে সব ইস্যু উঠে আসছে তার খুব সামান্য অংশ জুড়ে থাকছে স্থানীয় সমস্যা। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রচার সভায় জঙ্গলকন্যা সেতুর কথা আছে, লালগড় সেতুর কথা আছে, হাসপাতাল ও বিশ্ববিদ্যালয়ের কথা আছে।প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির প্রচারে রামমন্দিরের কথা আছে, সংরক্ষণের কথা আছে।একই পথে হাঁটছেন ঝাড়গ্রাম লোকসভা কেন্দ্রের তৃণমূল কংগ্রেস প্রার্থী কালীপদ সোরেন বা বিজেপি প্রার্থী প্রণত টুডু। হাতির সমস্যা সমাধানের কোনও স্থায়ী আশ্বাস নেই, রাস্তাঘাট উন্নয়নের কথা নেই, জঙ্গলমহলের মানুষের সমস্যা দূর হওয়ার আশু দিকনির্দেশ নেই। বরং বাম প্রার্থী সোনামণি মুর্মুর প্রচারে সাধারণ মানুষের রুজি রুটির কথা রয়েছে, রয়েছে সমস্যা সমাধানের বাস্তবসম্মত দিক ভাবার প্রচেষ্টা। মুশকিল এখানেই। মুশকিল বামেদের, মুশকিল রামেদেরও।
২০১৯ সালের ঝাড়গ্রাম কেন্দ্রে লোকসভা ভোটে শোচনীয় পরাজয় হয়েছিল সিপিআইএম প্রার্থী দেবলীনা হেমব্রমের। মাত্র ৭৫০০০ ভোট পেয়েছিলেন তিনি। বামেদের ভোট ২১ শতাংশ কমে যায়। বিজেপি প্রার্থী কুনার হেমব্রম প্রায় ৩৫ শতাংশ ভোট বাড়িয়ে ফেলেন এবং তৃণমূলের প্রার্থী বীরবাহা সোরেনকে ১১ হাজারের বেশি ভোটে হারিয়ে দেন। এই পাঁচ বছরে রাজনৈতিক চালচিত্র অনেক পাল্টেছে। ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে ঝাড়গ্রাম লোকসভা কেন্দ্রের সাতটি আসন তৃণমূলের দখলে গিয়েছে। কুনার হেমব্রম শিবির বদলান। ২০১৪ সালের লোকসভা ভোটে বিরাট মার্জিনে জয়ী হয়ে হেরে যাওয়া তৃণমূলের বিগত ৫ বছরে পায়ের তলায় মাটি মজবুত হয়েছে, এরকম কথা সংখ্যাতত্ব থেকে মনে হতেই পারে। অথচ, বাস্তব হল তৃণমূলের বিরুদ্ধে মানুষের ক্ষোভ কমেনি। ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনেও ক্ষোভ রয়েছে তৃণমূলের বিরুদ্ধে।

তাই বলে’ বিজেপির নিশ্চিন্ত থাকার জো নেই। কারণ তিনটি জেলা ঝাড়গ্রাম, পুরুলিয়া এবং পশ্চিম মেদিনীপুর মিলিয়ে সাতটি বিধানসভা কেন্দ্র নিয়ে গড়ে ওঠা ঝাড়গ্রাম লোকসভা কেন্দ্রে সর্বত্র বিজেপির সংগঠন খুব জোরদার না হওয়া এবং অন্তর্দ্বন্দ্ব ও কলহে বিদীর্ণ হয়ে থাকা, বিজেপির এককাট্টা না হতে পারা। স্থানীয় ইস্যুকে গুরুত্ব না দেওয়া এবং সাধারণ মানুষের পাশে না থাকা এই অভিযোগও বিজেপির বিরুদ্ধে ঝাড়গ্রামে উঠে আসছে। সাধারণ মানুষ কারা? এই সাধারণ মানুষ কুড়মি সমাজ এবং খেটে খাওয়া -দিনআনি দিনখাই মানুষজন। কুড়মি সম্প্রদায় ২০১৯ সালে বড়ফুলে ছিল, পরে ছোটফুলে ঝোঁকেন অথচ কোনও ফুলেই বাসা বাঁধতে পারেননি। এবার কুড়মি সমাজ থেকে নিজেদের প্রার্থী রয়েছেন। তৃণমূল নেতৃত্ব এবং প্রার্থী বলেছেন, কুড়মিদের বিভিন্ন শাখা রয়েছে। সব ভোট তাঁদের বিরুদ্ধে যাবে না। একই দাবি বিজেপির কিন্তু নির্দল হিসেবে ভোটের ময়দানে অবতীর্ণ বরুণ মাহাতো বা ঝাড়খণ্ড পিপলস পার্টির সূর্য সিংহ বেসরা কিছু ভোট টানবেন যা বিজেপির ব্যথার কারণ হয়ে উঠতে পারে। এছাড়াও রইলেন বামপ্রার্থী সোনামনি মুর্মু ( টুডু )। তাঁর প্রচার জোরদার, প্রচারে লোক হচ্ছে, নিজে সুবক্তা। খুব অঘটন না ঘটলে ঝাড়গ্রাম লোকসভা কেন্দ্রে বাম ভোট বেশ কিছুটাই বাড়তে পারে। আর সেটাই মুশকিল হয়ে উঠতে পারে রামেদের।
আরও পড়ুন পুরুলিয়া : মোদি ও রাম কি শান্তিরামের বিরুদ্ধে বাঁচাতে পারবে জ্যোতির্ময়কে?
২০২১ সালে লোকসভা কেন্দ্রের সাতটি বিধানসভা কেন্দ্রেই তৃণমূল জিতেছিল এটা লোকসভা ভোটে বড় ফ্যাক্টর নয়। বড় ফ্যাক্টর ছিল বিজেপির ভোট এবং ভোট প্রচারের প্রথম পর্বে তাদের অনুকূলে থাকা হাওয়াকে ধরে রাখা। মনে হয়েছিল, বিজেপি এবার তৃণমূলের ভেতরের গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব বা তৃণমূলের বিরুদ্ধে মানুষের ক্ষোভকে কাজে লাগাতে পারে। মননশীল ও ভাবনাশীল সমাজের একটি অংশ তাদের সঙ্গে থাকায় বিজেপির হাওয়া জোরদার। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এসে এই হাওয়া উল্টো দিকে বইতে আরম্ভ করে। তৃণমূলের থেকে ভোট সুইং করানো দুরস্ত, বিজেপির ক্ষয় শুরু হয়, নিজেদের ক্ষতি নিজেরাই করতে শুরু করে। প্রধানমন্ত্রী মোদি এসেও হাওয়া নিজেদের অনুকূলে সেভাবে টেনে আনতে পেরেছেন বলে মনে করছে না রাজনৈতিক মহল। ভোটের শেষ পর্বে এসে মনে হয়েছে কিছুটা হলেও সুবিধাজনক অবস্থায় রয়েছে তৃণমূল। রাজনৈতিক মহল একথাও মনে করছে, বিজেপিকে জোর ধাক্কা দিতে পারেন সোনামণি মুর্মু। অঘটন অবশ্যই ঘটতে পারে। বামেদের ভোট না বৃদ্ধি পেলে, কুড়মি সমাজ বিজেপির দিকে কিছুটা সদয় হলে, প্রণত টুডু অঘটন ঘটিয়ে বিজেপির এই আসন ধরে রাখতেই পারেন। অঘটন না হলে , এমনও হতে পারে মূলত ত্রিমুখী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রীতিমত প্রভাব ফেললেন সোনামণি মুর্মু (টুডু )। পুরুলিয়ার দ্বিধাবিভক্ত বিভিন্ন সমাজ, গোষ্ঠী, জনজাতির ভাবনা ঝাড়গ্রাম জেলার ঝাড়গ্রাম, বিনপুর, নয়াগ্রাম, গোপীবল্লভপুর বা পুরুলিয়ার বান্দোয়ান অথবা পশ্চিম মেদিনীপুরের শালবনি, গড়বেতায় কোন খাতে প্রবাহিত হয়, জানতে কয়েকটা দিন অপেক্ষা করতেই হচ্ছে।। (ঋণ স্বীকার : তথ্য সহায়তা মিতুল দাস )


More Stories
ব্রাজিলের জনবহুল এলাকায় আচমকাই ভেঙে পড়ল যাত্রীবাহী বিমান, পাইলট-সহ বিমানের ৬২ জন যাত্রীর মৃত্যু
বারাসাতে মেট্রো রেল নিয়ে সংসদে মুখর কাকলি ঘোষ দস্তিদার ঠিক কী বললেন?
অধীর চৌধুরী নিজে ডুবলেন, ইন্ডিয়া জোটকে ডোবালেন, বাঁচালেন এনডিএ ও বঙ্গ বিজেপিকে