Home » বিষ্ণুপুর লোকসভা কেন্দ্রে  দুই প্রাক্তনের যুদ্ধে জিতবেন কে? বাম কি লড়াইয়ে আছে?

বিষ্ণুপুর লোকসভা কেন্দ্রে  দুই প্রাক্তনের যুদ্ধে জিতবেন কে? বাম কি লড়াইয়ে আছে?

পুরন্দর চক্রবর্তী ও চুমকী সূত্রধর, সময় কলকাতা :এবারের ষষ্ঠ দফা লোকসভা ভোটের  দেরি নেই। বঙ্গে ৮ কেন্দ্রে ভোট।নজর থাকছে বিষ্ণুপুর লোকসভা কেন্দ্রে যেখানে দুই প্রাক্তনের লড়াই।

“তোমার কথার শব্দদূষণ, তোমার গলার স্বর ” – প্রাক্তন চলচ্চিত্রের এই গানটি একদা জনপ্রিয় হয়েছিল। প্রাক্তনেরও ক্ষোভ ছিল। তৃণমূল এত বড় চোর, আমার বউটাকেও চুরি করে নিল – তৃণমূলে যেদিন সুজাতা মণ্ডল যোগ দেন সেদিন কার্যত বিলাপ করে কাঁদতে দেখা গিয়েছিল তাঁর প্রাক্তন স্বামী বিজেপি সাংসদ সৌমিত্র খাঁকে। এখন বিলাপ করছেন না সৌমিত্র খাঁ । তিনি স্ত্রীর সাথে গৃহযুদ্ধ ছেড়েছেন বেশ কিছুদিন আগেই। এবার বিষ্ণুপুর লোকসভা কেন্দ্রে  কয়েক লক্ষ ভোটারের বেশিরভাগ ভোটারকে রাজনৈতিকভাবে পাশে পেতে প্রাক্তন স্ত্রীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছেন। বলছেন জয় নিয়ে ভাবছেন না। রেকর্ড নিয়ে ভাবছেন। বঙ্গে রেকর্ড মার্জিনে জয় হবে এমনটাই ভাবছেন সৌমিত্র খাঁ।

আর একেই প্রলাপ ভাবছেন সুজাতা মন্ডল। প্রাক্তন যা বলছেন, তাকেই প্রলাপ বলছেন তিনি। নরেন্দ্র মোদিকে স্বামী বিবেকানন্দের অবতার হিসেবে দেখতে পাচ্ছেন সৌমিত্র খাঁ, তাকে প্রলাপ হিসেবে দেখছেন তিনি। হিন্দু বা সনাতন ধর্মের অবমাননা দেখছেন তিনি। সৌমিত্র খাঁর প্রতিটি কথাকে শব্দ দূষণ হিসেবেই দেখছেন তিনি। কাউন্টার করছেন গান্ধীগিরি দিয়ে। সৌমিত্র খাঁ যখন তৃণমূলের চামড়া গুটিয়ে দেওয়ার হুমকি দিচ্ছেন, তখন সুজাতা বলছেন পিঠ খুলে রেখেছি। এরকম চলছে। এরকমই চলার কথা ছিল। গৃহবিবাদের প্রাচীন কথা উঠে আসছে সখ্যতার আর ভালোবাসার দিনের কথা। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় স্বয়ং বলছেন, কি করে সৌমিত্রকে ভালোবেসে সুজাতা বিয়ে করেছিল!ভালোবাসার দিনের কথা উঠছে।

২০১৯ সালে যখন বিষ্ণুপুর কেন্দ্রে সৌমিত্রের হয়ে একাই লড়ে গিয়েছিলেন সুজাতা, সেদিনের কথাও উঠে আসছে। গতবার সৌমিত্র নন বিষ্ণুপুর জুড়ে পদ্মফুলে ভোটের আকুতি জানিয়েছিলেন সুজাতা। এবার ফুল পাল্টেছে। ঘাসফুল নিয়ে ভোটারদের দুয়ারে দুয়ারে সুজাতা। অন্যদিকে, বরাবরই প্রবল বিতর্কিত সৌমিত্র জয়ের বিষয়ে যতই আত্মবিশ্বাস প্রকাশ করুন, বিজেপি তাকে সংযতভাবেই প্রচার করতে বলেছে। সুজাতার প্রতি তাঁর আক্রমণ ব্যক্তিগত স্তরে শালীনতার সীমা যাতে লংঘন না করে সেদিকেও মনোযোগী হতে বলেছে বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্ব। তবে বিজেপি আশাবাদী আসনটি তারা ধরে রাখতে পারবে।

পরিসংখ্যান বলছে, ২০১৪ সালে তৃণমূলের টিকিটে এখান থেকে সাংসদ হয়েছিলেন সৌমিত্র খাঁ। ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে তৃণমূলের শ্যামল সাঁতরাকে ৫৮ হাজারের বেশি ভোটে হারিয়ে বিষ্ণুপুর কেন্দ্রে জয়ী হন সৌমিত্র খাঁ। বাম প্রার্থী সুনীল খাঁ পেয়েছিলেন ১ লাখ ২ হাজার ভোট। ৮৭ শতাংশ ভোট ভাগ হয়ে যায় বিজেপি -তৃণমূলের মধ্যে। এবার এই কেন্দ্রে সিপিআইএম প্রার্থী শীতল কৈবর্ত। বামেদের তরফে প্রচারে উঠে আসছে বড়জোড়া ও দ্বারিকা শিল্পাঞ্চনের কথা। কলকারখানা উঠে গিয়েছে, নতুন করে বিনিয়োগ নেই। বাম প্রার্থী বলছেন, শুধু প্রকল্পের মৌখিক গালভরা কথা দিয়ে কী হবে ,তাই মানুষের কর্মসংস্থানের প্রশ্ন নিয়ে তাঁর লড়াই। বামেরা যাই দাগ কাটুন এই কেন্দ্রে এবারের লড়াই বিজেপি ও তৃণমূলের সৌমিত্র – সুজাতার মধ্যেই যেন সীমাবদ্ধ থাকছে। শিল্পের কথা মুখে আনতে হচ্ছে সৌমিত্র সুজাতাকেও। বিষ্ণুপুর লোকসভা কেন্দ্রের একটি বিরাট অংশের মানুষের সঙ্গে তাঁত শিল্প ও বালুচরি – স্বর্ণচরী এবং সোনামুখী সিল্কের মত বয়ন শিল্প জড়িয়ে রয়েছে। মল্ল রাজাদের সময় থেকে বিষ্ণুপুরের বয়ন শিল্প ছিল এই অঞ্চলের প্রধান জীবন জীবিকা। এখনও এই অঞ্চলের অধিকাংশ মানুষ শাড়ি শিল্পের সঙ্গে যুক্ত আছেন। কিন্তু হ্যান্ডলুমের দাপটে তাঁরা সুখে নেই। তৃণমূল কেন্দ্রীয় সরকারের আর্থিক নীতিকে দায়ী করে এসেছে শাড়ি শিল্পের সঙ্গে যুক্ত থাকা মানুষদের দুরবস্থার জন্য। সৌমিত্র এখানের শাড়ি শিল্প নিয়ে বেশ কিছু পরিকল্পনার কথা প্রচার করছেন। শাড়ি শিল্প এবং শাড়ি শিল্পের সঙ্গে যুক্ত থাকা মানুষদের দুরবস্থা বিষ্ণুপুর কেন্দ্রের অন্যতম কি ফ্যাক্টর। তবে, রাজনৈতিকভাবে এই কেন্দ্রে এডভান্টেজ রয়েছে বিজেপির সেকথা মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও জানেন। বাম আমলের অবসান ঘটিয়ে ঘাসফুল ফুটিয়েছিলেন সৌমিত্র খাঁ। সেই সৌমিত্র খাঁকে হারাতে হলে তাঁর প্রাক্তন সুজাতাকে জিততে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দাওয়াই, ওন্দা জিততে হবে। অথচ এই ওন্দা বিধানসভা কেন্দ্রে ২০২১ সালে ১১ হাজারের বেশি ভোটে জিতে ছিলেন বিজেপি প্রার্থী অমরনাথ শাখা । তিনি এ মুহূর্তে বিষ্ণুপুর সাংগঠনিক জেলা বিজেপির সভাপতি। তিনি নিদান দিয়ে রেখেছেন, ভোটের ফল প্রকাশের পরে ওন্দার সব পঞ্চায়েত বিজেপি দখল করে নেবে। তৃণমূলও পাল্টা রাজনৈতিক আক্রমণ শানিয়েছে। ওন্দা সহ এই লোকসভার অন্তর্গত বিধানসভা ক্ষেত্রগুলিতে যদি চোখ রাখা যায় তাহলে দেখা যাবে, এই মুহূর্তে বিষ্ণুপুর লোকসভা কেন্দ্রে তৃণমূলের বিধায়কের সংখ্যাধিক্য রয়েছে।২০২১ সালে বিষ্ণুপুর কেন্দ্রের অধীনে থাকা পূর্ব বর্ধমান জেলার খণ্ডঘোষ বিধানসভা কেন্দ্রে জয়ী হয়েছিল তৃণমূল। বাকি ছটি বিধানসভা কেন্দ্র বাঁকুড়া জেলায়। এই কেন্দ্রের মধ্যে বড়জোড়া ছাড়া পাঁচটিতেই জিতেছিল বিজেপি। তবে এঁদের মধ্যে বিষ্ণুপুরের তন্ময় ঘোষ ও কোতুলপুরের হরকালি প্রতিহার বিজেপি থেকে তৃণমূলে চলে যান। অর্থাৎ এই মুহূর্তে বিষ্ণুপুর লোকসভা কেন্দ্রের চারজন বিধায়ক তৃণমূলের। তবে বিজেপির সৌমিত্র খাঁ দুবার সাংসদ থেকেছেন। এই অঞ্চলে তৃণমূলের প্রভাবও বিগত পাঁচ বছরে বৃদ্ধি পায় নি।

দেব ও হিরণের মধ্যে কে জিতবেন? ভোটের আগে ঘাটালে পাল্লা ভারি কার?

তৃণমূলের প্রার্থী সুজাতা আরামবাগ বিধানসভা নির্বাচনে ২০২১ সালে হেরে গিয়েছিলেন ঠিকই কিন্তু বিষ্ণুপুর লোকসভা কেন্দ্রকে তিনিও খুব কম চেনেন না। বিগত লোকসভা নির্বাচনে প্রাক্তন স্বামীর হয়ে দিনরাত এক করে লড়েছিলেন। সাফল্যও এসেছিল। যদিও সৌমিত্র সুজাতাকে কৃতিত্ব দিতে নারাজ। তিনি বলেছেন, মোদির সুনামি ও তাঁর সততার জেরেই জয় এসেছিল। এবার স্বামীর বিরুদ্ধে লড়ছেন, দিনরাত এক করে প্রচার করছেন সুজাতা। সাফল্য আসবে কিনা পরের প্রশ্ন তবে সুজাতার ফাইট খুব টাফ। প্রাক্তদের যুদ্ধে কে জয়ী হন এখন সেটাই দেখার।।

 

About Post Author