Home » সবতীর্থ বারবার, গঙ্গাসাগর একবার : মথুরাপুর লোকসভা কেন্দ্রে তৃণমূল কি আরও একবার?

সবতীর্থ বারবার, গঙ্গাসাগর একবার : মথুরাপুর লোকসভা কেন্দ্রে তৃণমূল কি আরও একবার?

পুরন্দর চক্রবর্তী,সময় কলকাতা, ৩০ মে : পুণ্যতীর্থ গঙ্গাসাগর যে লোকসভা কেন্দ্রের মধ্যে স্বমহিমায় বিরাজ করছে, বাঘ ও কুমিরের বিচরণভূমি জলজঙ্গল নিয়ে গড়ে ওঠা সেই মথুরাপুর লোকসভা কেন্দ্রের আলোচনা করার আগে একটি অত্যাশ্চর্য পরিসংখ্যান দিয়েই শুরু করা যেতে পারে এখানের ভোটের সমীকরণ। বামেদের ভোট রামে যাওয়ার কারণে ২০১৯ সালের লোকসভা ভোটে বিজেপির উত্থান হয়েছিল বঙ্গে, তৃণমূলের হয়ে এমন দাবি করেন যারা তাদের অনেকেই মথুরাপুর লোকসভা কেন্দ্রের পরিসংখ্যানকে সামনে তুলে ধরেন। ২০১৪ সালের লোকসভা ভোটের তুলনায় বিজেপির ভোট ২০১৯ সালের ভোটে এখানে ৩২.০৮ শতাংশ বেড়েছিল। বামেদের ভোট কমেও যায় ৩২.০৮ শতাংশ। বিজেপির ভোট দাঁড়ায় ৩৭ শতাংশের বেশি আর বামেদের ভোট কমে হয় ৬.৫৯ শতাংশ। আশ্চর্য উলটপুরাণ। দক্ষিণ ২৪ পরগনার চারটি লোকসভা কেন্দ্রের মধ্যে মথুরাপুরে বিজেপি এবার আরও শক্তি বৃদ্ধি করতে পারে কিনা সেদিকে বঙ্গের চোখ থাকছে।এই কেন্দ্রে এবার তৃণমূলের বাজি তরুণ নেতা বাপি হালদার। তাঁর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বিজেপির অশোক পুরকায়েত ও সিপিআইএমের শরৎ চন্দ্র হালদার। আইএসএফের প্রার্থী অজয় কুমার দাস।

২০০৯ থেকে ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে মথুরাপুর লোকসভা কেন্দ্র থেকে জয়ী হওয়া তিনবারের তৃণমূল সাংসদ চৌধুরী মোহন জাটুয়া এবারের নির্বাচনে নেই। বাপি মন্ডলের সাংগঠনিক শক্তি ও ক্ষমতা ভালো হওয়ায় তিনি তার পুরস্কার পেয়েছেন দলের কাছে। ভোটাররা তাকে পুরস্কৃত করেন কিনা সেটাই দেখার। মথুরাপুর লোকসভা কেন্দ্রের অধীনে থাকা সাতটি বিধানসভা কেন্দ্র পাথরপ্রতিমা, কাকদ্বীপ, সাগর, কুলপি,রায়দিঘি, মগরাহাট পশ্চিম এবং মন্দির বাজার – সর্বত্রই ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে জয়ী হয় তৃণমূল কংগ্রেস। তবে বিগত তিন বছরে গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব বেড়েছে । দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলা যুব তৃণমূল কংগ্রেসের সভাপতি বাপি জেলা পরিষদের খাদ্য সরবরাহ কর্মাধ্যক্ষ । তাঁকে অভিষেক- ঘনিষ্ঠ বলেই জেলা রাজনীতিতে পরিচিত। গতবার ২ লক্ষ ৪ হাজার ভোটের কাছাকাছি মার্জিনে কালে কালে এই কেন্দ্রে তৃণমূল জিতলেও শক্তি বৃদ্ধি করেছে বিজেপি।অন্যদিকে, জেলা তৃণমূলের ক্ষমতাসীন নেতাদের বিরুদ্ধে রয়েছে একাধিক অভিযোগ। এমনকি বাপি হালদারের স্ত্রীর বিরুদ্ধে রয়েছে পঞ্চায়েত প্রধান থাকাকালীন দুর্নীতির চাঞ্চল্যকর অভিযোগ। রয়েছে নদীবাঁধ সমস্যা, অনুন্নয়নের একাধিক অভিযোগ। পাশাপাশি সংখ্যালঘু ভোট ব্যাংকে আইএসএফের থাবা পড়ার আশঙ্কা থাকলেও এবারের লোকসভা ভোটেও এগিয়ে রয়েছে তৃণমূল। কারণ তৃণমূলের সাংগঠনিক শক্তি, সবচেয়ে বড় কথা ভোটের আগে তৃণমূল নিজেদের শক্তি বৃদ্ধি করেছে এবং বিজেপির প্রভাবশালী দুই নেতাকে দলে ফিরিয়ে এনেছে । এরা হলেন শান্তনু বাপুলি ও দিলীপ জাটুয়া ।

প্রসঙ্গত, একদা ডিলিমিটেশনের ফলে অস্তিত্বহীন মথুরাপুর বিধানসভা কেন্দ্রের প্রবাদপ্রতিম নেতা ও প্রাক্তন বিধায়ক সত্যরঞ্জন বাপুলির ছেলে শান্তনু বাপুলি ২০২১ সালে তৃণমূল ছেড়ে বিজেপিতে যান। কিন্তু রায়দিঘি কেন্দ্রে তৃণমূলের অলোক জলদাতার কাছে হেরে যান। কিন্তু তাঁর বাবা সত্য বাপুলি দীর্ঘ সফল রাজনৈতিক জীবনের শেষ প্রান্তে যার কাছে বিধানসভা নির্বাচনে হার মেনেছিলেন সেই কান্তি গাঙ্গুলিকে রায়দিঘি কেন্দ্রে তিন নম্বর স্থানে ঠেলে দেন। প্রসঙ্গত রায়দিঘি বিধানসভা কেন্দ্রে কান্তি গাঙ্গুলি ২০১১ ও ২০১৬ সালের নির্বাচনে তৃণমূলের তারকা প্রার্থী দেবশ্রী রায়ের কাছে হার মানলেও ভোটের ব্যবধান ছিল সামান্য। কান্তি গাঙ্গুলী ২০১৬ সালের বিধানসভা ভোটে হেরেছিলেন মাত্র ১২০০ ভোটে। ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে শান্তনু বাপুলি ৮০হাজারের বেশি ভোট পেয়েও তৃণমূলের অলোক জলদাতার কাছে হেরে যান, তবে তাঁর সাংগঠনিক শক্তি ও ফেলনা নয়। তবে ২০২১ সালে বিজেপির উত্থানের সাথে সাথে কান্তি গাঙ্গুলী যেন অস্তাচলে যান। তাঁর ভোটবাক্সে পড়ে মাত্র ৩৬ হাজার ভোট। অপরজন দিলীপ জাটুয়া। দিলীপ জাটুয়া আবার মন্দিরবাজার অঞ্চলের প্রভাবশালী নেতা। তিনিও মন্দির বাজার বিধানসভা কেন্দ্রে তৃণমূলের জয়দেব হালদারের সঙ্গে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার পরে ২৩ হাজার ভোটে হেরে যান। এই কেন্দ্রে সংযুক্ত মোর্চার হয়ে আইএসএফ প্রার্থী পেয়েছিলেন ২৫ হাজার ভোট । এখানেই এবারের লোকসভা ভোটে বাম প্রার্থী শরৎ চন্দ্র হালদার ২০১৬ সালে ৬৯ হাজার ভোট পেয়েছিলেন। অর্থাৎ তৃণমূল ছেড়ে বিজেপিতে গিয়ে বামেদের প্রভাব রায়দিঘি ও মন্দিরবাজারে কার্যত নিশ্চিহ্ন করে দেন শান্তনু ও দিলীপ। বাপি মন্ডলের হয়ে কুলপির ঢোলাহাটে জনগর্জন সভায় এসেছিলেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়।মন্টুরাম পাখিরা, গিয়াসউদ্দিন মোল্লা, বঙ্কিম হাজরা, যোগরঞ্জন হালদার, জয়দেব হালদার, অলোক জলদাতার মত বিধায়ক ও নেতাদের উপস্থিতিতে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রচারমঞ্চে তৃণমূল ছেড়ে যাওয়া বিজেপির দুজন শীর্ষস্থানীয় তৃণমূলে ফেরেন। স্বাভাবিক ভাই মনে করা যেতে পারে, মথুরাপুরে তৃণমূলের সংগঠন এবারের ভোটে আরও জোরদার। অশোক পুরকায়েত মুখে যতই বলুন বিজেপি সর্বভারতীয় দল, দুজনের দলত্যাগে কিছু যায় আসে না এবং শুভেন্দু অধিকারী মথুরাপুর কেন্দ্রে যতই তৃণমূলের দুর্নীতির তত্ত্ব আউড়ে চলুন, বিগত দুবারের মত, চৌধুরী মোহন জাটুয়ার মতই, তৃণমূলের প্রার্থী এগিয়ে আছেন। গঙ্গাসাগর থেকে দিল্লির দিকে এক পা বাড়িয়ে বসে আছেন বাপি হালদার।।

About Post Author