সময় কলকাতা ডেস্ক, ১ অক্টোবরঃ শরতের কাশফুলে ভরে গেছে মাঠঘাট। লেগেছে পুজোর গন্ধ। ফুরফুরে মেজাজে আট থেকে আশি। রাত পোহালেই মহালয়া। দেবীপক্ষের শুরু। ব্যাস, একপা-দুপা করে পুজোর দিকে এগিয়ে যাওয়া। কাল ঠিক ভোর পাঁচটায় ঘুম থেকে ওঠা চাই। বেতারে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের গলায় মহিষাসুরমর্দিনী না শুনলে পুজোর সূচনাটাই হাতছাড়া হয়ে যায় বাঙালির। এই দিনই মাতৃ প্রতিমার চোখদান করেন প্রতিমা নির্মাতারা। তবে পুজোর আগে কেন পালন করা হয় মহালয়া? কবেই বা শুরু হয়েছিল এর সম্প্রচার? জেনে নিন ইতিহাস…

কেন পুজোর আগে পালন করা হয় মহালয়া?
হিন্দু পুরাণ অনুসারে মনে করা হয়, মহালয়ার দিন পিতৃপক্ষের অবসান হয়। শুরু হয় দেবীপক্ষের। এর পরের দিনটি হয় নবরাত্রি। বেশ কিছু অবাঙালিরা নবরাত্রি থেকে দেবীর ভিন্ন ভিন্ন নয়টি রূপের পুজো শুরু করে দেয়। তাছাড়া হিন্দু পুরাণ মতে জীবিত কোন ব্যক্তির পূর্বের তিন পুরুষ পর্যন্ত পিতৃ লোকে বাস করেন। আর এই পিতৃলোক স্বর্গ ও মর্ত্যের মাঝামাঝি জায়গায় অবস্থান করে। যার শাসক হলেন মৃত্যুর দেবতা যমরাজ। তিনি সদ্যমৃত ব্যক্তির আত্মাকে পিতৃলোক এ নিয়ে যান। বিস্বাস করা হয় এই মহালয়ার পুণ্য তিথিতে পিতৃলোক থেকে মৃত পিতৃ পুরুষদের আত্মা নেমে আসে মর্ত্যলোকে। তাই কলকাতা সহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় এই দিনে অনেকেই নদীর ঘাটের মত পবিত্র স্থানে পূর্বপুরুষদের আত্মার শান্তি কামনায় পিন্ডদান করে। তারপর স্নান করে শুদ্ধ হয়। যা তর্পণ নামে পরিচিত।
তবে এই তর্পণ শুধুমাত্র পিতৃ পুরুষদের জল দিতেই করা হয় না। পাশাপাশি তর্পণের মাধ্যমে আহ্বান জানানো হয় দেবী দুর্গাকে। মর্ত্যে আসার আহ্বান। পুরান মতে এই দিনেই দেবীকে মহিষাসুর বধ করতে আহ্বান জানিয়েছিলেন স্বর্গের দেবতারা।
মহালয়ার সম্প্রচার শুরুর ইতিহাস কী?
মহালয়ার দিন ভোরে শ্রোতাদের মুগ্ধ করে তোলে মহিষাসুরমর্দ্দিনীর কাহিনী। দেবী দুর্গা কিভাবে স্বর্গের অশুরকে বধ করলেন তার গল্পই হল মহালয়া। বীরেন্দ্র কৃষ্ণ ভদ্রের গলায় বেতারে তা শোনা সত্যিই এক অসাধারণ অনুভূতি। তবে তিনি মহালয়া পাঠ করলেও এর সৃষ্টি তার হাতে নয়। মাত্র পঁচিশ বছর বয়সে বৈদ্যনাথ ভট্টাচার্য মার্কেন্ডেয়- চণ্ডীর বিষয়বস্তুর ওপর ভিত্তি করে একটি চম্পু রচনা করেন। চম্পু অর্থ্যাৎ গদ্য এবং পদ্য মিশিয়ে তৈরি একটি গল্প বা কাহিনী। সালটি ছিল ১৯৩০। বৈদ্যনাথ ভট্টাচার্য কাহিনীটির নাম দিয়েছিলেন ‘বসন্তেশ্বরী’। বাসন্তী পুজোর ষষ্ঠীতে আকাশবাণী এই কাহিনীর সম্প্রচার শুরু করে। পাঠ করতেন বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র ও সংগীত সংযােজনায় ছিলেন পঙ্কজকুমার মল্লিক। এর পরের বছরই বাসন্তী পুজোর বদলে দুর্গা পুজোর ষষ্ঠীতে আকাশবাণী এর সম্প্রচার শুরু করে। তার পরের বছর আবার দিন পরিবর্তন। ১৯৩২ সাল থেকে ষষ্ঠীর বদলে অনুষ্ঠানটির সম্প্রচার এগিয়ে আনা হয় পুজোর আগে মহালয়ার ভোরে। এরপর টানা চৌত্রিশ বছর বীরেন্দ্র কৃষ্ণ ভদ্রের কণ্ঠেই সম্প্রচারিত হয় মহিষাসুরমর্দ্দিনী।
১৯৭৬ সালে অনুষ্ঠানটিতে এক বিশেষ পরিবর্তন করেছিল আকাশবাণী। বীরেন্দ্র কৃষ্ণ ভদ্রের পরিবর্তে মহানায়ক উত্তম কুমারের কণ্ঠে মহিষাসুরমর্দ্দিনী সম্প্রচার করা হয়েছিল। পরে শ্রোতাদের বিক্ষোভ এবং পত্রপত্রিকায় পাঠক ও বিদ্বজ্জনেরা সমালােচনার তোপ সহ্য করতে হয় আকাশবাণীকে। তাই কর্তৃপক্ষ সিদ্ধান্ত নেয় এরপর থেকে বীরেন্দ্র কৃষ্ণ ভদ্রের কণ্ঠেই মহালয়ার দিন সম্প্রচারিত হবে মহিষাসুরমর্দ্দিনী। এমনকি, তাঁর অবর্তমানেও তারই কণ্ঠে রেকর্ড করা অনুষ্ঠানটি শোনাবে আকাশবাণী। কার্যত বর্তমানে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র স্বর্গবাসী। তা সত্ত্বেও আজও আকাশবাণীতে প্রতি মহালয়ার ভোরে আমরা তারই কন্ঠে মহিষাসুরমর্দ্দিনী অনুষ্ঠানটি শুনি। শুনবো সম্ভাব্য ভবিষ্যতেও।


More Stories
বাংলা নববর্ষের ইতিহাস
চিকিৎসকের বঙ্গসংস্কৃতির উদযাপন নববর্ষে
পাটুলিতে শুট আউট, নিহত যুবক