Home » দেড়শো ক্যুইন্টালের অষ্টধাতুর মা দুর্গা

দেড়শো ক্যুইন্টালের অষ্টধাতুর মা দুর্গা

পুরন্দর চক্রবর্তী, দীপ সেন, চুমকী সূত্রধর, সময় কলকাতা  (মহালয়ার বিশেষ পুজো প্রতিবেদন) :  অষ্টধাতুর মা দুর্গা এবার চোখ টানবে পুজোয়। একটি বিশেষ প্রতিবেদন।

“কে বলেরে মাকে আমার মাটির গড়া মৃন্ময়ী!” – বারবার ভক্তের ও সাধকের চোখে এভাবেই মায়ের রূপ ধরা পড়েছে। হৃদয়ের ভক্তি ও নিষ্ঠা যেখানে পুজোর মূল কথা, মাটি দিয়ে প্রতিমা গড়তেই হবে এমন কোনও কথা সনাতনী ধর্মীয় অভিধানেও ছিল না। প্রতিটি প্রতিমার ক্ষেত্রে একথা যেমন খাটে, দুর্গা পূজার সময় একই কথা প্রযোজ্য। প্রতিমা গড়ার ক্ষেত্রে উপাদানের ব্যবহারে বারবার বহু পরীক্ষা-নিরীক্ষার মধ্যে দিয়ে গিয়েছেন বহু শিল্পী কারণ শিল্পী সাধকের নামান্তর। তিনি সাধকের চোখ দিয়ে মায়ের মূর্তিকে দেখেন, উদ্ভাবনী শক্তি মিশিয়ে দেন আধ্যাত্মিকতার সঙ্গে কল্পনার রঙে। দুর্গা পুজো সমাগত। আকাশে বাতাসে তারই আগমনী বার্তা। এমন সময় এক সাধক শিল্পী প্রতিমা নির্মাণ কাজে কার্যত এক বিপ্লব ঘটিয়ে বসেছেন। অভিনবত্ব ও শিল্প শৈলী মিশে গিয়েছে। সর্বজনীন মূর্তির মধ্যে সাবেকি আধ্যাত্মিক ভাবনার কোথাও খামতি নেই। অথচ এক অভূতপূর্ব ঘটনা ঘটিয়ে বসে আছেন উত্তর ২৪ পরগনার হাবড়ার বাসিন্দা শিল্পী ইন্দ্রজিৎ পোদ্দার।  তাঁর শিল্পভাবনা এবং অভিনবত্ব এবার হয়ে উঠতে চলেছে সর্বজনীন যার প্রকাশ অষ্টধাতুর মা দুর্গা ।

  মৃন্ময়ী মূর্তি গড়ার ক্ষেত্রে গতে বাঁধা বা বাঁধাধরা ছক বহুদিন আগে বহু শিল্পী ভেঙেছেন। প্রতিমা নির্মাণে উপাদানের ক্ষেত্রেও বারবার চমক দেখিয়েছেন বহু শিল্পী। এদের মধ্যে আচমকাই নববিপ্লব বা নবজোয়ার ঘটিয়ে ফেলেছেন হাবড়া বাণীপুরের শিল্পী ইন্দ্রজিৎ পোদ্দার। অসামান্য দক্ষতায় দেবী বা বাহন ও উমার পুত্র কন্যার নির্মাণে প্রয়োগ ঘটিয়েছেন অষ্টধাতুর। প্রথমে জেনে নেওয়া যাক অষ্টধাতু কি কি। সোনা, রূপা, তামা, সীসা, দস্তা, টিন, লোহা এবং পারদ এই আটটি ধাতুর সমন্বয়ে গঠিত একটি সংকর ধাতুকে অষ্টধাতু বলে বলা হয়। শিল্পী ইন্দ্রজিৎ দুর্গা অষ্টধাতুর মা দুর্গা তথা প্রতিমা নির্মাণে আলাদা আলাদা ভাবে আটটি ধাতুর ব্যবহার করেছেন।

বলাবাহুল্য,অষ্টধাতু দিয়ে দুর্গা প্রতিমা নির্মাণ করার কথা সেভাবে শোনা যায় না। তবে বিরল হলেও আগেও অষ্টধাতু দিয়ে দুর্গা প্রতিমা নির্মাণ হয়েছে কিন্তু আকারে- আয়তনে,ভাবনায় ইন্দ্রজিতের প্রতিমা শিল্প অসামান্য মাত্রাবাহী।

 বছর দুয়েক আগে অষ্ট ধাতু দিয়ে কলকাতার বেনিয়াটোলায় সারা বছর পূজিতা হওয়ার জন্য মা দুর্গার আবির্ভাব ঘটেছিল শারদীয়া লগ্নে। তবে ওজনে ও বৈচিত্র্যে ব্যারাকপুর এভারগ্রীন ক্লাব তাক লাগিয়ে দিয়েছে যা ব্যারাকপুরের সুকান্ত সরণি ও পূর্ব তালবাগান অধিবাসী বৃন্দ দুর্গোৎসব কমিটি নামেও পরিচিত। প্রকৃতিকে ভালোবাসা এবং পরিবেশকে বাঁচানোর বার্তা তাদের ৩৭তম বর্ষের পুজোয়। এবার তাঁদের ভাবনা ‘স্পন্দন’। তবে সবকিছুকেই যেন ছাপিয়ে গিয়েছেন শিল্পী ইন্দ্রজিৎ। শিল্পী জানিয়েছেন, মা দুর্গা পরিবারসহ মর্তে আসছেন। সবমিলিয়ে ব্যবহার করা হয়েছে প্রায় দেড়শো কুইন্টাল অষ্টধাতু। অর্থাৎ পুজো কমিটির প্রাথমিক চমকপ্রদ ভাবনা আরও চমকপ্রদ রূপ নিয়েছে শিল্পী এবং পুজো কমিটির ঐক্যান্তিক প্রচেষ্টা এবং শিল্প ভাবনার প্রয়াসে। শিল্পী ইন্দ্রজিৎ নিজেই বললেন, তাঁর মানস প্রতিমা এবার স্থান পাবে ব্যারাকপুর এভারগ্রিনে।

হীরে সোনা মুক্ত জহরতকে পেছনে ফেলে ইন্দ্রজিৎ পোদ্দার ব্যারাকপুরে পুজো মণ্ডপে যে প্রতিমার রূপ তুলে ধরছেন, সার্বিকভাবে শিল্প সুষমায় তার তুলনা মেলা ভার। পুজোর আধ্যাত্মিকতা এবং ধর্মীয় ভাবনার বাইরেও শিল্পী ইন্দ্রজিতের নতুনত্বের ছোঁয়ায় অগণিত মানুষকে অষ্টধাতুর দেড়শো ক্যুইন্টালের প্রতিমার মধ্যে দিয়ে অষ্টধাতুর মা দুর্গা শিল্প ভাবনার নিরিখেও কাছে টেনে নেবেন। শরতের দশদিশা আলো করে মা হয়ে উঠবেন চিরায়ত ও সর্বজনীন।।

About Post Author