সময় কলকাতা ডেস্ক:- মে মাসেই চূড়ান্ত পর্যায়ের আলোচনা শেষ হয়েছিল। বৃহস্পতিবার ব্রিটেনের সাথে মুক্ত বাণিজ্যচুক্তি স্বাক্ষর করে ভারত। বৃহস্পতিবার লন্ডন থেকে যৌথ সাংবাদিক বৈঠকে এই ঘোষণা করেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী কিয়ের স্টারমার।
বৃহস্পতিবার লন্ডনে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বৈঠকের পর ভারতের বাণিজ্য মন্ত্রী পীযূষ গোয়েল এবং ব্রিটেনের ব্যবসা ও বাণিজ্য সচিব জনাথন রেনল্ডস এই ঐতিহাসিক মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষর করেন।
এটি ব্রেক্সিটের পর স্বাক্ষরিত সবচেয়ে বড় বাণিজ্য চুক্তি এবং ভারতের সঙ্গে ব্রিটেনের প্রথম পূর্ণাঙ্গ বাণিজ্যিক অংশীদারিত্ব। প্রধানমন্ত্রী মোদি জানান, এই চুক্তি দু’দেশের সমৃদ্ধির রূপরেখা। এই চুক্তির ফলে বছরে ৩৪ বিলিয়ন ডলারের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য বৃদ্ধির সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
কিন্তু প্রশ্ন হল, এই বাণিজ্য চুক্তির ফলে ঠিক কী লাভ হবে ভারতের?
মনে করা হচ্ছে, এই চুক্তির ফলে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের সঙ্গে যুক্ত ব্যবসায়ীরা বিশেষ সুবিধা পাবেন। কৃষক, মৎসজীবীরাও উপকার পাবেন। ভারত থেকে ব্রিটেনে রপ্তানি করা সামুদ্রিক খাবার, টেক্সটাইল, রত্ন, গয়না, চামড়াজাত পণ্য, বিভিন্ন যন্ত্রাংশ শুক্ল ফ্রি হয়ে যাবে। এর উপকার পাবেন ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীরা।
উল্টো দিকে ব্রিটেন থেকে ভারতে আমদানি করা চিকিৎসাজাত দ্রব্য, মহাকাশ গবেষণার যন্ত্রাংশ, গাড়ি, হুইস্কি, চকোলেট-সহ বিভিন্ন পণ্যগুলি বিনাশুল্কে ভারতীয় বাজারে প্রবেশ করবে। ফলে গড়ে শুল্কের পরিমাণ ১৫ শতাংশ থেকে ৩ শতাংশে নেমে আসবে। চুক্তির আওতায় ৯৯ শতাংশ ভারতীয় পণ্য ব্রিটেনের বাজারে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার পাবে। এতে করে ২০৩০ সালের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য মূল্য ১২০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছনোর লক্ষ্যমাত্রা রাখা হয়েছে।
এ ছাড়াও চুক্তিতে একটি সামাজিক নিরাপত্তা চুক্তিও রয়েছে, যার ফলে ভারতীয় কোম্পানিগুলি ব্রিটেনে কর্মী পাঠাতে পারবে দ্বিগুণ সামাজিক নিরাপত্তা খরচ ছাড়াই, যা ব্যবসার জন্য খরচ কমাবে।
বহু বছর ধরেই মূলত তিনটি বিষয় নিয়ে দুই দেশের মধ্যে দর কষাকষি চলছিল। অ্যালকোহল ও মোটরগাড়ির উপর ভারতের আরোপিত আমদানি শুল্ক হ্রাস করা এবং কাজের উদ্দেশ্যে ভারত থেকে ব্রিটেন অভিমুখী কর্মপ্রার্থীদের উপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ। অ্যালকোহল ও মোটরগাড়ির উপর আমদানি শুল্ক হ্রাসে নরম মনোভাব দেখালেও ‘অভিবাসন’ ইস্যুতে ভারতের কঠোর হওয়ার সম্ভাবনা প্রথম থেকেই বেশি ছিল।
২০২১ সালে বরিস জনসনের আমলে নতুন করে দু’দেশের মধ্যে এই চুক্তি আলোচনা শুরু হয়। তারপর লিজ ট্রাসের জমানাতেও জট খোলার কোনও সম্ভাবনা দেখা যায়নি। এরপর ২০২২ সালে ব্রিটেনের ক্ষমতায় আসেন ভারতীয় বংশোদ্ভূত ঋষি সুনাক। ফের নতুন করে এই ঐতিহাসিক চুক্তি স্বাক্ষর হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়। ২০২৩ সালে দিল্লি অনুষ্ঠিত জি-২০ সম্মেলনে যোগ দিতে এনিয়ে তিনি মোদির সঙ্গে বৈঠকও করেন। যা ফলপ্রসূও হয়েছিল।
তারপর এই চুক্তি নিয়ে আলোচনা চলছিল দুদেশের মধ্যে। কিন্তু এর মাঝেই ব্রিটেনে ক্ষমতায় আসে স্টার্মারের লেবার পার্টি। ভারতের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক মজবুত করার ক্ষেত্রে স্টার্মারের বিদেশনীতির প্রধান বিষয় ছিল মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি। যার পথ প্রশস্ত করার পাশাপাশি শিক্ষা, প্রযুক্তি, নিরাপত্তা-সহ নানা ক্ষেত্রে দিল্লির সঙ্গে একযোগে কাজ করার ইচ্ছে প্রকাশ করেছিলেন তিনি। এবার স্টার্মারের জমানাতেই জট কাটল বহু প্রতীক্ষিত এই চুক্তির।
এটি গত এক দশকে ভারতের কোনও উন্নত দেশের সঙ্গে করা প্রথম বড় বাণিজ্য চুক্তি। পাশাপাশি ব্রিটেনের জন্যও এই চুক্তি ইউরোপীয় ইউনিয়ন যাওয়ার পর সবচেয়ে অর্থবহ বাণিজ্যিক পদক্ষেপ। বর্তমানে ব্রিটেন ভারতের ষষ্ঠ বৃহত্তম বিনিয়োগকারী। দেশটিতে প্রায় ১ হাজার ভারতীয় কোম্পানি ১ লক্ষেরও বেশি মানুষকে নিয়োগ দিয়েছে এবং প্রায় ২ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ভারতের ব্রিটেনে রফতানি হয়েছে ১৪.৫ বিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের তুলনায় ১২.৬ শতাংশ বেশি। অন্যদিকে, আমদানি বেড়েছে ২.৩ শতাংশ হারে, যা ৮.৬ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। এই ঐতিহাসিক চুক্তি দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ককে আরও মজবুত করবে।


More Stories
জার্সিতে যৌন অপরাধে প্রাক্তন শিক্ষকের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি
বিপত্তারিণী রক্ষাকবচ, অবশেষে হরমুজ প্রণালী ভারতের জন্য খুলে গেল, রান্নার গ্যাস আসছে
মোদি ও বিজেপিকে খোঁচা : আগাম জামিন পেলেন নিয়ে নেহা সিং রাঠোর