মা ও মেয়ের লোভ যার নির্মম শিকার আত্মীয়া। মেয়ে ফাল্গুনী ও তার মা আরতির হাতে খুন হন মেয়ের পিসি শাশুড়ি সুমিতা ঘোষ। নৃশংসভাবে হত্যার পরে দেহ টুকরো টুকরো করে গঙ্গায় ভাসানোর ব্যর্থ চেষ্টা করে মা -মেয়ে। কুমারটুলি গঙ্গার ঘাট থেকে ধরা পড়ার পরে আট মাস চলে বিচার প্রক্রিয়া। শুক্রবার দোষী সাব্যস্ত হয় মা ও মেয়ে। দোষী সাব্যস্ত হওয়ার তিনদিন পরে মধ্যমগ্রাম ট্রলি হত্যাকাণ্ডের সাজা ঘোষণা করা হয়। সোমবার বারাসাত আদালতের বিচারক মা ও মেয়ে তথা আরতি ঘোষ ও ফাল্গুনী ঘোষকে মধ্যমগ্রাম ট্রলি হত্যাকাণ্ডে সুমিতা ঘোষের খুনের সাজা হিসেবে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও এক লক্ষ টাকা করে জরিমানার নির্দেশ দিলেন। এছাড়াও প্রমাণ লোপাটের জন্য ৭ বছর সশ্রম কারাদণ্ডের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
কী ছিল মধ্যমগ্রাম ট্রলি হত্যাকাণ্ড?
*রহস্যের সূচনা*
মঙ্গলবার,২৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২৫।ভোরের দিকে মধ্যমগ্রামের গীতশ্রী ভাণ্ডার মোড়ে ভ্যান নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন নারায়ণ হালদার। এক ব্যক্তি তাদের বলেন, দুজন মহিলা তার ভ্যানে করে যেতে চান ও তাঁরা তাকে ডাকছেন। তারা তাকে ডেকে নিয়ে যান বীরেশ পল্লীর এক বাড়িতে। একটি নীল রঙের ভারী ট্রলি তাঁরা ঘরের মধ্যে থেকে আনেন এবং নারায়ণ হালদার ট্রলিটি ভ্যানে তুলতে তাদের সাহায্য করেন। দোলতলা মোড়ে তাদের তিনি নিয়ে যান ট্রলি সমেত। যেখান থেকে একটি ট্যাক্সি ভাড়া করে তারা বেরিয়ে যান। সেদিন ১৩০ টাকা ভাড়াতেই সন্তুষ্ট ছিলেন নারায়ন হালদার। যে ট্যাক্সিতে চেপে মা ও মেয়ে কুমোরটুলির দিকে রওনা হয়েছিলেন, সেই ট্যাক্সিচালক শ্যামসুন্দর দাস জানিয়েছিলেন “মঙ্গলবার ভোর ছ’টা পাঁচ নাগাদ আমি দোলতলার ট্যাক্সি স্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে ছিলাম । তখন দু’জন মহিলা এসে জানতে চাইল, কুমোরটুলির দিকে যাব কি না ! ” শেষ পর্যন্ত তিনি ৭০০ টাকা পেয়েছিলেন কুমোরটুলির গঙ্গার ঘটে তাদের নামিয়ে দেওয়ায়।
*আসামি পাকড়াও*
এরপরে কুমোরটুলি ঘাটে ট্রলি ব্যাগ থেকে উদ্ধার হয় এক মৃতদেহ। পরে জানা যায়, মৃতা বয়স্কা মহিলার নাম সুমিতা ঘোষ। সেদিন সুমিতার টুকরো দেহ ট্রলিব্যাগ থেকে উদ্ধার হয়েছিল। পুলিশ সূত্রে পরে আরও জানা যায়, ওই ট্রলি ব্যাগটি গঙ্গায় ফেলতে এসেছিলেন যে মহিলা তাঁদের নাম ফাল্গুনী ঘোষ এবং আরতি ঘোষ। তাঁরা সম্পর্কে মা এবং মেয়ে। মৃতা সুমিতা সম্পর্কে মেয়ে ফাল্গুনীর পিসি শাশুড়ি। দুই মহিলাকে অর্থাৎ মা -মেয়েকে হাতে থাকা ট্রলি ব্যাগ নিয়ে উদ্দেশ্যবিহীন ভাবে গঙ্গার ঘাটে ঘুরতে দেখে ঘুরতে দেখে এবং ট্রলি ব্যাগটিতে সন্দেহজনক দাগ (?)দেখে দেখে স্থানীয়দের সন্দেহ হয়। পরে স্থানীয়েরাই তালা ভেঙে ট্রলি ব্যাগ খুলে সুমিতার দেহ উদ্ধার করেন। পুলিশ আসে ঘটনাস্থলে। পরে জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়, ঘটনার শিকড় মধ্যমগ্রামে। মধ্যমগ্রামের দক্ষিণ বীরেশপল্লির বাসন্তী মন্দির এলাকায় ফাল্গুনীদের বাড়িতে থাকতে গিয়েছিলেন ফাল্গুনীর পিসিশাশুড়ি সুমিতা।
*কার্যকারণ*
পুলিশ সূত্রে খবর, সম্পত্তির লোভে মধ্যমগ্রামে সুমিতাকে রবিবার বিকেলে অর্থাৎ ২৩ ফেব্রুয়ারী খুন করা হয়। ফাল্গুনী এবং আরতিকে পুলিশ গ্রেফতার করার পরে পুলিশি তদন্তে ও জেরায় কোন সম্পর্কে নিশ্চিত হয় পুলিশ। প্রাথমিক তদন্তে জানা যায়, মধ্যমগ্রামে খুনের অস্ত্র পুকুরে ফেলার পর কলকাতায় আসে ফাল্গুনী-আরতি। কুমোরটুলি ঘাটে ট্রলি ব্যাগে মৃত দেহ ভরে এনে ভাসিয়ে দিতে চেয়েছিল মধ্যমগ্রামের বাসিন্দা মা-মেয়ে।
*কিভাবে খুন*
ময়নাতদন্তের প্রাথমিক রিপোর্ট থেকে জানা গিয়েছে, একেবারে পাকা খুনির মতো ঠান্ডা মাথায় দেহ লোপাটের প্ল্যান করে ফেলেন মা-মেয়ে। পুলিশ সূত্রে খবর, মধ্যমগ্রামের বীরেশ পল্লির বাড়িতেই একদিন রাখা ছিল সুমিতার দেহ !দেহ নিয়ে কী হবে, বাড়িতে থাকলে তো গন্ধ ছড়াবে। এই রকম সাত সতেরো বিভিন্ন কথা ভেবে এক ধরনের স্প্রে কিনে আনে তারা। তারপর সেই স্প্রে করে মৃহদেহের পচা গন্ধ আটকানোর চেষ্টা করা হয়। এরপর তারা ঠিক করে দেহ ট্রলি ব্যাগে ভরে পাচার করতে হবে। দেহ পোরার চেষ্টা হয় বাড়িতে থাকা ট্রলি ব্যাগে। তাতে ফলপ্রসূ না হয়ে , সোমবার কিনে আনে বড় ট্রলি ব্যাগ। কিন্তু দেহ ঢোকাতে গিয়ে দেখা যায়, ব্যাগটি দেহের তুলনায় ছোট।নার্সিংহোমে আয়ার কাজ করার অভিজ্ঞতা থাকা ফাল্গুনীর মা আরতি ঘোষ ছুরি কাঁচি চালাতে মোটামুটি সিদ্ধহস্ত। ব্যাগের ভিতর ঢোকানোর আগে সে বঁটি দিয়ে কেটে ফেলে দুই পায়ের নীচের অংশ। কাটা হয়েছিল দুই পায়ের গোড়ালি। বঁটি ফেলে দেওয়া হয় পুকুরে। দেহ কোথায় ফেলা হবে, তার জন্য রেকি করতে বের হন মা-মেয়ে। কলকাতায় আসেন। সিদ্ধান্ত হয়, চেনা এলাকা বলে কুমোরটুলিতে এনে গঙ্গায় দেহ ফেলা হবে। কিন্তু বিধি বাম ধরা পড়ে যেতে হয় তাদের।
*কাহিনীর প্রেক্ষাপট ও বিচার প্রক্রিয়া :*
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে নৃশংস ঘটনার তদন্তে উঠে আসে, বিবাহবিচ্ছেদের পর সুমিতা ঘোষ অসমে জোরহাটে ভাইয়ের বাড়িতে থাকতেন। সেখান থেকে ফাল্গুনী ঘোষের সঙ্গে বিয়ে হয় তার ভাইপোর। সংসারে অশান্তি শুরু হলে ফাল্গুনী তার মা আরতি ঘোষের কাছে ফিরে আসে। দু’জনে ভাড়া থাকতেন মধ্যমগ্রামের দক্ষিণ বীরেশপল্লিতে। সেখানেই থাকতে আসেন বিবাহ বিচ্ছিন্না বছর পঞ্চাশের বেশি বয়স্কা। ফিরে আর যাওয়া হয় নি। ২৩ ফেব্রুয়ারি তাঁর জীবনে যবনিকা নেমে আসে।কথায় আছে, লোভে পাপ পাপে মৃত্যু। মধ্যমগ্রাম ট্রলিকাণ্ডে তাঁর অর্থে ও সম্পত্তির কারণে সুমিতা ঘোষ খুন হয়ে যান । সুমিতার সঙ্গে ঝগড়ার সময় ফাল্গুনী ভারী কিছু দিয়ে মাথায় আঘাত করেন। মৃত্যু নিশ্চিত করার জন্য পরে মা আরতির সঙ্গে মিলে সুমিতার শ্বাসরোধ করা হয়। মৃতার দেহ থেকে সোনার গয়না বের করে তারা বিক্রি করে প্রায় ২ লক্ষ ৫৯ হাজার টাকা আয় করে, যার একটি অংশ দিয়ে ফাল্গুনী নতুন গয়না কেনেন। অর্থাৎ মধ্যমগ্রামের কুখ্যাত ট্রলি হত্যাকাণ্ডে (Trolley Murder Case) সোনা ও সম্পত্তির লোভই শেষ পর্যন্ত কাল হয়ে দাঁড়াল পিসি-শাশুড়ি সুমিতা ঘোষের জন্য।
বারাসতের সপ্তম অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা আদালত শুক্রবার মা-মেয়ে আরতি ঘোষ ও ফাল্গুনী ঘোষকে দোষী সাব্যস্ত করে। আট মাসের মধ্যে সম্পন্ন হয় পুরো বিচারপ্রক্রিয়া। সোমবার বিচারক প্রজ্ঞা গার্গী ভট্টাচার্য হোসেন এই মামলার সাজা ঘোষণা করেন।
*সাজা*
সোমবার বারাসাত আদালতে বিচারক দুই দোষী মা ও মেয়ে আরতি ঘোষ ও ফাল্গুনী ঘোষকে খুনের অভিযোগে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও এক লক্ষ টাকা করে জরিমানা এবং প্রমাণ লোপাটের জন্য আলাদা করে সাত বছরের সশ্রম কারাদণ্ডের নির্দেশ দেন। (পাবলিক প্রসিকিউটার )সরকারি কৌঁসুলি বিভাস চট্টোপাধ্যায় জানিয়েছেন, সাত বছর সশ্রম কারাদণ্ডের পরে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের শুরু হবে, এমনটাই নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।অর্থাৎ আমৃত্যু কারাবাসের নির্দেশ দিয়েছেন বিচারক।।
More Stories
ময়নাগুড়িতে গাড়ি দুর্ঘটনায় নিহত ২ তরুণী , আহত ৫
মধ্যমগ্রামে ভয়াবহ আগুন, মৃত্যু ১
ভূমিকম্প কলকাতা ও উত্তর চব্বিশ পরগনায়