পুরন্দর চক্রবর্তী,সময় কলকাতা : এবারের বিধানসভা নির্বাচনে মালদা জেলার ১২ টি আসনে বঙ্গবাসীর চোখ থাকছে। এই ১২ টি আসনে ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে ৮ টি আসনে জয় পেয়েছিল তৃণমূল, ৪ টি আসনে জয় পেয়েছিল বিজেপি। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করতে শুরু করেছেন সমীকরণে উলটফের ঘটবে। বলা হচ্ছে, এবার কংগ্রেস বিধানসভা নির্বাচনে মালদা জেলায় অন্যতম প্রধান শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে। সত্যি কি তাই? বাস্তবে কতটা উলটফের ঘটতে পারে মালদার বিধানসভা কেন্দ্র গুলিতে? এই প্রতিবেদনে চোখ রাখা যাক মালদা জেলার ভৌগোলিক চালচিত্রে এবং রাজনৈতিক আঙ্গিকে। এই কেন্দ্রে হরিশ্চন্দ্রপুর নিয়ে থাকছে চুলচেরা বিশ্লেষণ। কে এগিয়ে আছে হরিশ্চন্দ্রপুর বিধানসভা কেন্দ্রে?
মালদা জেলায় মোট ১২ টি বিধানসভা কেন্দ্র।মালদা জেলার এই ১২ টি কেন্দ্রের দিকে এবার বঙ্গের নির্বাচনে বঙ্গবাসীর চোখ। ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে সাফল্যের পরে মালদা জেলাকে পাখির চোখ করেছে কংগ্রেস। অন্যদিকে, কংগ্রেসের উত্থান হল তৃণমূলের শক্তি খর্ব যেন না হয় সেজন্যও মরিয়া রাজ্যের শাসক দল। পাশাপাশি, মালদায় বিগত কিছুদিনে উত্থান ঘটে চলেছিল বিজেপির। সেই গ্রাফ কি উর্ধুমুখী হবে নাকি নিম্নমুখী হবে – তা নিয়েও রয়েছে চৰ্চা। বলে রাখা ভালো মালদা জেলায় বাম দলগুলির শির্থে প্রভাব এবারে ভোটে এখনো পর্যন্ত পড়ছে না। মালতিপুর বিধানসভা কেন্দ্রে সম্মুখ সমরে রয়েছেন কংগ্রেসের মৌসম নূর এবং তৃণমূলের আব্দুর রহিম বক্সি । এখানে বিজেপির সম্ভাবনা আপাতদৃষ্টিতে কম। মালতিপুরে কংগ্রেস এবং তৃণমূলের মধ্যে সেনে সেনে কোলাকুলি জিততে পারেন যে কেউ তবুও প্রাথমিকভাবে কংগ্রেসের মৌসুম নূরের পাল্লা ভারী বলেই বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। কি হবে বাকি ১১ টি বিধানসভা কেন্দ্রে? প্রথমেই চোখ রাখা যাক মালদার কোন কোন বিধানসভা আসন রয়েছে? মালদায় মালতিপূর ছাড়া যে আসন গুলি রয়েছে সেগুলি হল – হরিশ্চন্দ্রপুর, রতুয়া, চাঁচল, মানিকচক, ইংরেজবাজার, মালদা, হবিবপুর,গাজোল, মোথাবাড়ি, বৈষ্ণবনগর এবং সুজাপুর। এই জেলার আসন গুলিতে ভূতাত্ত্বিক এবং যোগাযোগ ও জনবিন্যাসের ভিত্তিতে আলোচনার সুবিধার স্বার্থে আমরা তিন ভাগে ভাগ করে নিতে পারি। মালদা শহরের প্রাণকেন্দ্র ইংরেজ বাজারের পর থেকে মোটামুটি ১৮ কিলোমিটার পরে শোভানগরের পরে রাস্তা দুদিকে বেঁকে যাচ্ছে। মাদিয়া ঘাট হয়ে একটি অংশ হরিপুর হয়ে চলে যাচ্ছে রতুয়া হয়ে ভালুকার দিকে। আরেকটি অংশ সোজা বেরিয়ে যাচ্ছে মানিকচক হয়ে চাঁচল এবং মালতিপুর অঞ্চল ছুঁয়ে। হরিশ্চন্দ্রপুর এখান থেকে খুব দূর নয়। এই অংশের থেকে বিহার সীমান্ত ও কাটিহারের দূরত্ব খুব বেশি নয়। ভৌগোলিকভাবে মানিকচক, চাঁচল, মালতিপুর,রতুয়া এবং হরিশ্চন্দ্রপুরকে এই পাঁচটি আসনে ভৌগলিক কারণে একটি অংশের মধ্যে ধরে আলোচনা করা যেতে পারে। এই অংশে কংগ্রেস ও তৃণমূলের শক্তি বেশি। দ্বিতীয় অংশে, আলোচনায় থাকবে মালদা শহর থেকে যে রাস্তাটি গাজোল হয়ে দিনাজপুর ও বৃহত্তম উত্তরবঙ্গের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। ইংরেজবাজার, মালদা, গাজোল এবং হবিবপুর আসন দ্বিতীয় অংশে ধরে আলোচনা করা যেতে পারে উল্লেখযোগ্য ভাবে বিজেপির শক্তি বেশি। তৃতীয় অংশটিতে থাকছে তিনটি বিধানসভা কেন্দ্র যেখানে রয়েছে ফারাক্কা গেট থেকে পরবর্তী অঞ্চল । সরাসরি মুর্শিদাবাদ থেকে মালদা শহরের মূল যোগাযোগের রাস্তার অদূরে রয়েছে সুজাপুর, সুজাপুর থেকে মোথাবাড়ি ও বৈষ্ণবনগর বিধানসভা কেন্দ্রর দূরত্ব বেশি নয়। আলোচনা স্বার্থে এভাবেই তিনটি অঞ্চল আলাদা আলাদা করে বিশ্লেষণ করলে বুঝতে সুবিধা হবে।
প্রথম অংশের আলোচনায় বাংলা বিহার সীমান্ত থেকে শুরু করা যাক। প্রথমেই ভৌগোলিক দিক থেকে আলোচনা করা যাক। হরিশ্চন্দ্রপুরের কিশান্গঞ্জ ও কাটিহার জেলা যা বিহারের অন্তর্গত। হরিশ্চন্দ্রপুর বিধানসভা আসনটি ভৌগোলিকভাবে যেমন তাৎপর্যপূর্ণ তেমনই রাজনৈতিকভাবে উল্লেখযোগ্য। হরিশ্চন্দ্রপুরের আম যেরকম বিখ্যাত তেমনই এই বিধানসভা ক্ষেত্রটি বহু খ্যাতনামা রাজনীতিবিদদের চারণভূমি হয়েছে। স্বাধীনতার পর থেকে এখানে নির্দল ও ওয়ার্কার্স পার্টির হয়ে ইলিয়াস গাজী তিনবার জয়ী হয়েছিলেন। পরবর্তীকালে কংগ্রেসের গৌতম চক্রবর্তী এবং জনতার বীরেন্দ্র কুমার মৈত্র জয়ী হন। বামফ্রন্ট জমানায় বীরেন্দ্র কুমার মৈত্র ফরওয়ার্ড ব্লকে যোগদান করেছিলেন এবং ফরওয়ার্ড ব্লকের হয়ে টানা তিনবার জয়ী হয়েছিলেন। তিনি বাম আমলে মন্ত্রী ও হয়েছিলেন। এই অঞ্চলের রাজনীতিতে দীর্ঘদেহী ও সুবক্তা বীরেন্দ্র কুমার মৈত্রের প্রভাব অনস্বীকার্য । এই শতকে এই কেন্দ্রে বিগত আড়াই দশক ধরে লড়াই সীমাবদ্ধ ছিল তাজমূল হোসেন ও মোস্তাক আলমের মধ্যে। বিগত পাঁচটি নির্বাচনের মধ্যে তিনবার জয়ী হয়েছিলেন তাজমুল, দুবার জয়ী হন মোস্তাক। তাজমুল প্রথম দুবার জয়ী হয়েছিলেন ফরোয়ার্ড ব্লকের থেকে। পরে তিনি তৃণমূল কংগ্রেসের যোগদান করেন। দল পাল্টান নি কংগ্রেসের মোস্তাক আলম। এবারও তিনি এই বিধানসভা কেন্দ্র থেকে লড়ছেন। তবে তাজমুল হোসেন প্রার্থী হিসেবে নেই আবার না থেকেও প্রবল ভাবে আছেন। বিগত হরিশ্চন্দ্রপুর বিধানসভা আসনে এবার লড়াই মূলত ত্রিমুখী মনে হলেও ভোটের ঠিক আগে সুস্পষ্ট এখানে তৃণমূল কংগ্রেস এবং কংগ্রেসের মধ্যে লড়াই জোরদার। এই বিধানসভা আসনটি কে পাবে তা নিয়ে লড়াই এই দুই দলের মধ্যেই। এখানে বিজেপির প্রার্থী রতন দাসের যে সম্ভাবনা একেবারেই নেই তা নয় এবং বিজেপি ২০২১ সালের নির্বাচনে এই বিধানসভা আসনে রানার্সআপ হয়েছিল। এই আসনে তৃণমূলের তাজমূল হোসেন বিজেপি প্রতিপক্ষকে ৭৭ হাজারের বেশি ভোটের মার্জিনে হারিয়ে দিয়েছিলেন। বিদায়ী বিধায়ক ও মন্ত্রী এবং প্রবীণ রাজনীতিক ব্যক্তিত্ব তাজমুল হোসেনকে এবার তৃণমূল নেতৃত্ব টিকিট দেয়নি। তাঁর বদলে প্রার্থী হয়েছেন তৃণমূলের মাতিবার রহমান এবং মাতিবার রাজনীতিতে নবাগত না হলেও পোড় খাওয়া রাজনৈতিক ব্যক্তি নন। তাঁর বিপক্ষে বিজেপির রতন দাস ছাড়াও রয়েছেন কংগ্রেসের ঝানু রাজনীতিবিদ মোস্তাক আলম। মোস্তাক আলম হরিশ্চন্দ্রপুর বিধানসভা কেন্দ্র থেকে ২০০১ ও ২০১৬ সালে জয়ী হয়েছিলেন। শুধু তাই নয়, ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে তিনি কংগ্রেসের প্রার্থী ছিলেন। এই কেন্দ্রটি মালদা উত্তরের অন্তর্গত এবং মালদা উত্তর কেন্দ্রে ২০২৪ সালে সাংসদ নির্বাচিত হন খগেন মুর্মু। তবে মোস্তাক আলম হরিশ্চন্দ্রপুর বিধানসভা কেন্দ্রে ৪৩৪৩ ভোটে তৃণমূল কংগ্রেসের প্রসূন বন্দ্যোপাধ্যায়ের চেয়ে এগিয়েছিলেন। মোস্তাক আলম প্রায় ২৫ হাজার ভোটে বিজেপি প্রার্থী এবং মালদা উত্তরের জয়ী প্রার্থী খগেন মুর্মুর তুলনায় এগিয়েছিলেন। অর্থাৎ, পরিষ্কার বিগত দু বছরের অস্বাভাবিক কিছু পট পরিবর্তন না হলে মোস্তাক আলমের এই কেন্দ্রে সম্ভাবনা প্রবল এবং তাজমুল হোসেন না থাকায় তৃণমূলের এই আসনটি হারানোর সম্ভাবনা প্রবল হয়ে উঠেছে। কারণ হিসেবে বলা যায়, তৃণমূল কংগ্রেসের পায়ের তলা থেকে মাটি সরছিল তা পরিসংখ্যান থেকেই পরিষ্কার। এমতাবস্থায় তাজমুল হোসেন প্রার্থী হলে সেয়ানে সেয়ানে লড়াই হতে পারত।কারণ তাজমুলের সংগঠন শক্তিশালী এবং তার ভাই জম্মু দীর্ঘদিন ধরে যুবদের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে বিধানসভা নির্বাচনকে পাখির চোখ করেছিলেন। তৃণমূল শক্তি ফিরে পাচ্ছিল বলেই স্থানীয় তৃণমূল নেতৃত্বের বক্তব্য।এই আসনটি ধরে রাখার জন্য মাতিবর কে টিকিট দিয়েছে তৃণমূল এবং তৃণমূলের বিক্ষুব্ধ গোষ্ঠী বলছে, মাতিবার ভালো করে বাংলায় বলতে পারেন না। দীর্ঘদিন বিজেপি বলয়ে কাটিয়ে ফেরা মাতিবার জনসংযোগও করে উঠতে পারছেন না। শামসির জনসভায় মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সামনে মাতিবার জনতার উদ্দেশ্যে একটি বাক্য সম্পূর্ণ করে বলে উঠতে পারেনি। অন্যদিকে কংগ্রেস তাদের প্রচারে মাতিবরকে কাটাছেঁড়া করছে।একদা পরিযায়ী শ্রমিক মাতিবার কিভাবে প্রভূত সম্পত্তির অধিকারী হয়েছে তা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। শুধু তাই নয়, ভিন রাজ্যে তার অপরাধী যোগসাজস ছিল এমন অভিযোগও তুলছে কংগ্রেস। মাতিবারের পাশে থাকা তৃণমূলের সাংগঠনিক শক্তি দিয়ে অনেক যুদ্ধের সৈনিক মোস্তাক আলমের সঙ্গে এঁটে ওঠা কার্যত অসম্ভব। তারসঙ্গে যোগ হয়েছে তৃণমূলের ভেতরে বইতে থাকা চোরাস্রোত। সবমিলিয়ে এই কেন্দ্রে মোস্তাক আলম জিতছেন একথা এক কথায় নিশ্চিত। হরিশচন্দ্রপুর বিধানসভা আসনটি আবার যেতে চলেছে কংগ্রেসের দখলে।
হরিশ্চন্দ্রপুর সম্ভাব্য বিজয়ী প্রার্থী মোস্তাক আলম (কংগ্রেস )


More Stories
পদ্মে ছেয়ে আছে ইংরেজবাজার
সুজাপুর : কেন এগিয়ে তৃণমূলের সাবিনা ইয়াসমিন?
নাড়ু-কাঞ্চনযোগে অধীরের জয় কি নিশ্চিত?