পুরন্দর চক্রবর্তী, সময় কলকাতা : দুয়ারে ভোট। ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে সুজাপুর বিধানসভা কেন্দ্র নিয়ে পর্যালোচনায় কী উঠে আসছে? কে এখানে এগিয়ে? কেন এগিয়ে? প্রথমে চোখ রাখা যাক মালদা জেলার ভৌগলিক ও রাজনৈতিক আঙ্গিকে। পাশাপাশি ভৌগলিক ও রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে চোখ রাখা যাক সুজাপুরের দিকে।
বৃহৎ মুর্শিদাবাদ জেলা শেষ হওয়ার পরে ফারাক্কা ব্রিজ ও গেট পার করে মালদা জেলা। মালদা জেলার শুরুতেই সুজাপুর বিধানসভা কেন্দ্রটির অবস্থান। যদি মালদা কে উত্তরবঙ্গের গেটওয়ে বলা হয় তবে সুজাপুর হচ্ছে উত্তরবঙ্গের প্রথম বিধানসভা কেন্দ্র।
প্রসঙ্গত, উত্তরবঙ্গে রয়েছে মোট ৫৪টি বিধানসভা কেন্দ্র, তার মধ্যে সব থেকে বেশি আসন রয়েছে মালদা জেলায় যেখানে রয়েছে ১২টি বিধানসভা কেন্দ্র যার মধ্যে একটি করে আসন সংরক্ষিত আছে যথাক্রমে তফসিলি উপজাতি ও তফসিলি জাতির জন্য, বাকি ১০টি আসন সাধারন।
মালদা জেলার এই ১২টি বিধানসভা কেন্দ্র হল – হাবিবপুর(তফসিলি উপজাতি সংরক্ষিত), গাজোল(তফসিলি জাতি সংরক্ষিত), চাঁচল, হরিশ্চন্দ্রপুর, মালতীপুর, রতুয়া, মানিকচক, মালদহ, ইংরেজবাজার, মোথাবাড়ি, বৈষ্ণব নগর এবং সুজাপুর।
২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে এই ১২টি বিধানসভা কেন্দ্রের মধ্যে বিজেপি জিতেছিল মাত্র ৪টি আসন, সেগুলি হল – হাবিবপুর, গাজোল, মালদহ ও ইংরেজবাজার, বাকি ৮টি বিধানসভা কেন্দ্র গিয়েছিল তৃণমূল কংগ্রেসের দখলে।২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে কিন্তু সেই ছবি বদলে যায়, দেখা যায় জেলার ১২টি বিধানসভা কেন্দ্রের মধ্যে ৬টিতে লিড পেয়েছে বিজেপি এবং ৬টিতে লিড পেয়েছে কংগ্রেস, তৃণমূল কোনও আসন থেকেই লিড পায়নি।
ওই নির্বাচনে বিজেপি লিড পেয়েছিল হাবিবপুর, গাজোল, মালদহ, মানিকচক ও ইংরেজবাজার, বৈষ্ণবনগর বিধানসভা কেন্দ্র থেকে, অন্যদিকে কংগ্রেস লিড পেয়েছিল চাঁচল, হরিশ্চন্দ্রপুর, মালতীপুর, রতুয়া, মোথাবাড়ি, সুজাপুর থেকে।
ভোট প্রপ্তির হারের দিকে যদি দেখা যায় তাহলে দেখা যাবে ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেস পেয়েছিল ৫২.৪৬% ভোট, বিজেপি পেয়েছিল ৩২.৫% এবং কংগ্রেস পেয়েছিল ৮.৬৮% ভোট – ২০২৪ ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে বিজেপি, তৃণমূল ও কংগ্রেসের ভোট প্রাপ্তির হার ছিল যথাক্রমে ৩৭%, ২৬.৬% ও ৩২.৬%। এই গণিত পরিষ্কার বুঝিয়ে দিয়েছে মালদা জেলায় বিজেপি নিজেদের শক্তি প্রবল ভাবে বৃদ্ধি করেছে। আমাদের পর্যালোচনার পরিষ্কারভাবে উঠে এসেছে যে বিজেপি যে ছটি বিধানসভা কেন্দ্রে লোকসভা ভোটে এগিয়েছিল সেগুলি ছাড়াও চাঁচলে জিততে পারে। লোকসভা ভোটে সুজাপুর বিধানসভা কেন্দ্রে কংগ্রেস এগিয়ে ছিল কিন্তু ২০২৪ সালের বিধানসভা ভোটে পরিস্থিতি পাল্টাতে পারি বলে মনে করছেন ওয়াকিবহাল মহল। অথচ সুজাপুর থেকে ২০২৪ সালে ৮৩ হাজার ভোটে এগিয়ে ছিলেন ঈশা খান চৌধুরী। এই কেন্দ্রে প্রায় ৬৪ শতাংশ ভোট পেয়েছিল কংগ্রেস। বিজেপির শ্রীরূপা মিত্র চৌধুরীর লোকসভা ভোটে পরাজয়ের পেছনেও এই কেন্দ্রে বিজেপির ভরাডুবি। তৃণমূল প্রার্থী রায়হান এই কেন্দ্র থেকে প্রায় ৪৬০০০ ভোট পেয়েছিলেন, রুপা পেয়েছিলেন মাত্র ১৮হাজার ভোট। ইশা খান এখান থেকে ১ লক্ষ ২৯ হাজারের বেশি ভোট পেয়ে এই লোকসভা কেন্দ্রে নিজের জয় সুনিশ্চিত করতে পেরেছিলেন। অথচ এবার এই কেন্দ্রে পট পরিবর্তন হতে পারে। বিজেপির যথারীতি এই কেন্দ্র কোন সম্ভাবনাই নেই কারণ দুর্গাপুর বিধানসভা কেন্দ্রে প্রায় ৮৮ শতাংশ মুসলিমের বাস। স্বাভাবিকভাবেই এই ভোটে অন্য দলগুলিকে কতটা থাবা বাসায় সেটাই দেখার। প্রসঙ্গত উল্লেখযোগ্য সুজাপুর বিধানসভা কেন্দ্রটি কার্যত গনি খান চৌধুরীদের পরিবারের মৌরসিপাট্টা। এই কেন্দ্র থেকে বরাবর গণি খানের পরিবারের সদস্যরাই রাজত্ব করে এসেছেন। বিধানসভা কেন্দ্র থেকে পাঁচবার বিধায়ক নির্বাচিত হয়েছিলেন এছাড়াও তার বোন ও মৌসুম নূরের মা রুবিনুর চারবার বিধায়ক করেছিলেন এই কেন্দ্র থেকে। মৌসুম নূর ও ঈশা খান চৌধুরী রাও এই কেন্দ্রে জয়ী হয়েছেন। ২০২১ সালে এই কেন্দ্রে ৭৩ শতাংশের বেশি ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছিলেন তৃণমূল কংগ্রেসের আব্দুল গনি। একাধিক বার মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মন্ত্রিসভায় মন্ত্রীর পদ সামলে আসা সাবিনা ইয়াসমিন এবার এই কেন্দ্রের প্রার্থী। তিনি বিগতদিনে মোথাবাড়ি কেন্দ্র থেকে জয়ী হলেও এবার তৃণমূল কংগ্রেস সাবিনা ইয়াসমিনকে সুজাপুরে টিকিট দেয়। বিতর্ক দেখা দেয় বেগতিক বুঝে তাঁকে সুজাপুর বিধানসভা কেন্দ্র থেকে টিকিট দেওয়া হয় নাকি মৌসুম নূরের বিরুদ্ধে তাকে খাড়া করতে চেয়েছিল তৃণমূল কংগ্রেস। এনিয়ে সন্দেহের অবকাশ নেই তৃণমূল কংগ্রেস এই আসনটিকে মোথাবাড়ির তুলনায় নিরাপদ মনে করেছিল এবং তৃণমূল কংগ্রেসে সাবিনা ইয়াসমিনের মতো জনপ্রিয় নেত্রী এই মুহূর্তে মালদায় নেই । বাস্তবে কী তাই? ২০২৪ সালের লোকসভা ভোটের ফল দেখে তেমন বোধ নাও হতে পারে। উল্লেখ্য, এই বিধানসভা কেন্দ্রে এবার যথারীতি বহুমুখী প্রতিদ্বন্দ্বিতা। মিম ও আইএসএফ ছাড়াও বিজেপিও রয়েছে। তথাপি এই কেন্দ্রে লড়াই কংগ্রেসের আব্দুল হান্নান ও সাবিনা ইয়াসমিনের মধ্যে। কিন্তু ভোটের ঠিক আগে সাবিনা ইয়াসমিনের জয়ের সম্ভাবনা দেখছে রাজনৈতিক মহল। মনে করা হচ্ছে, সাবিনা কিছুটা হলেও এগিয়ে রয়েছেন। কিন্তু প্রশ্ন কোন সমীকরণে তিনি এগিয়ে রয়েছেন? আব্দুল হান্নান যদি তাঁর পাশে পূর্ণ শক্তির কংগ্রেসকে পেতেন তাহলে সাবিনা ইয়াসমিনের পক্ষে লড়াই অনেক কঠিন হত। সাবিনা ইয়াসমিন এই কেন্দ্রে প্রার্থী হওয়ার পরে কংগ্রেসের ভাঙ্গন লক্ষ্য করা গেছে। ভোটের ঠিক তিন সপ্তাহ আগে গয়েশপুর গ্রাম পঞ্চায়েতের চার নেতা-শরিফ আলি, সাকিরুল ইসলাম, ইউসুফ আলী এবং মোক্তারুল হক-তৃণমূলে যোগদান করেন। মৌসুম নূর মালতিপুর কেন্দ্রে প্রার্থী হওয়ার পরে গনি খানের পরিবার মূল মনোযোগ দিয়েছে মৌসমের কেন্দ্রে। অন্যদিকে, সাবিনা বলছেন,তিনি লড়াইকে ভয় পাচ্ছেন না। তাঁর কথায়, “আমি সুজাপুরের ঘরের মেয়ে। এখানে আমার বাবার বাড়ি, শ্বশুরবাড়ি। ১৫ বছর মোথাবাড়িতে কাজ করার পর ঘরে ফিরে এসে আমি খুশি।” সাবিনা এও বলেন প্রার্থী তিনি নন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তৃণমূল আমলের শুরু থেকে মন্ত্রী হিসেবে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ দফতর সামলে এসে মালদার এই অঞ্চলে বেশ জনপ্রিয়। ৪৯ বছরের সাবিনা উচ্চশিক্ষিতা এবং দীর্ঘদিনের রাজনীতিক। কংগ্রেস ইতি মধ্যেই এই কেন্দ্রা হাই প্রোফাইল প্রচার শুরু করে দিয়েছে। দেখা গেছে ইউসুফ পাঠানকেও। সর্বশক্তি দিয়ে এই কেন্দ্র জয় করার লক্ষ্যে তৃণমূল ও সাবিনা ইয়াসমিন অন্যদিকে, কংগ্রেসে কিছুটা ভাটার স্রোত। খাড়া মালদা জেলায় নির্বাচনী ফলাফল যাই হোক না কেন, সুজাপুর বিধানসভা কেন্দ্রে সাবিনা ইয়াসমিন জয়ী হতেই পারেন। কার্যত মালদা জেলায় একা কুম্ভ হয়ে বুঁদিগড় রক্ষা করছেন সাবিনা। এই মুহূর্তে রহিম বকসি এবং সমর মুখার্জীদের মতো তৃণমূল কংগ্রেসের প্রবীণ নেতাদের আসন যখন টলোমলো তখন জয়ের দিকে নিশ্চিত পদক্ষেপে এগোচ্ছেন সাবিনা ইয়াসমিন।।
সুজাপুর বিধানসভা কেন্দ্র সম্ভাব্য জয়ী প্রার্থী সাবিনা ইয়াসমিন (তৃণমূল কংগ্রেস )


More Stories
সোনার ডিম পাড়ছেন সব্যসাচী!
কেন মমতা আবার হাইকোর্টে?
রাজ্যে মন্ত্রীদের দফতর বন্টন, মন্ত্রীরা কে কোন দায়িত্ব পেলেন?