Home » বালাসাহেব-উদ্ধব ও একনাথই কি যথাক্রমে মমতা – অভিষেক ও ঋতব্রত?

বালাসাহেব-উদ্ধব ও একনাথই কি যথাক্রমে মমতা – অভিষেক ও ঋতব্রত?

Oplus_131072

পুরন্দর চক্রবর্তী, সময় কলকাতা, ৩ জুন : আশ্চর্য সামঞ্জস্য ও সাদৃশ্য। ১৯৬৬ সালের  প্রতিষ্ঠা হয়েছিল বালাসাহেব ঠাকরে মহারাষ্ট্রে শিবসেনা দলটির প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। ১৯৯৮ সালে বঙ্গে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রতিষ্ঠা করেছিলেন তৃণমূল কংগ্রেস। ২০২২ সালের শুরুতেও মহারাষ্ট্রে বালাসাহেব ঠাকরে বা বাল ঠাকরের উত্তরাধিকারী হিসেবে উদ্ধব ঠাকরের হাতেই ছিল শিবসেনার চাবিকাঠি। ২০২৬ সালে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং তার উত্তরাধিকারী অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাতে ছিল তৃণমূল কংগ্রেসের চাবিকাঠি। ২০২২ সালে একনাথ শিন্ডে-র নেতৃত্বে ভাঙ্গন ধরে শিবসেনায়। ২০২৬ সালে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় কে সামনে রেখে ভাঙ্গনের মুখে দাঁড়িয়ে আছে তৃণমূল কংগ্রেস। বাল ঠাকরেকে জীবদ্দশায় দেখে যেতে হয়নি যে পরিণতি,সেই পরিণতি দেখতে হতে চলেছে তৃণমূলের প্রতিষ্ঠাতা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে। ২০২২ সালে বিজেপির সমর্থনে সরকার গড়ার লক্ষ্যে দলে বিদ্রোহ করে ভাঙ্গনের অগ্রভাগে ছিলেন একনাথ শিন্ডে। উদ্ধব ঠাকরের আধিপত্য খর্ব হয়ে যায়।এবার বঙ্গে প্রধান বিরোধী দল কে হবে সেই প্রশ্নে তৃণমূলে নেতৃত্ব দিচ্ছেন ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়। ভারতের নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, শিবসেনার মূল প্রতীক “ধনুক ও তীর” (Bow and Arrow) এবং দলীয় নাম এখন বর্তমান মহারাষ্ট্রের মুখ্যমন্ত্রী একনাথ শিন্ডের নেতৃত্বাধীন শিবসেনার কাছে রয়েছে。অন্যদিকে, উদ্ধব ঠাকরের নেতৃত্বাধীন শিবসেনা (ইউবিটি) দলটিকে নির্বাচন কমিশন “মশাল” (Flaming Torch) প্রতীকটি বরাদ্দ করেছে। এখন ঘাষফুল প্রতীকটি হাতবদল হয়ে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছ থেকে চলে যাচ্ছে ঋতব্রতর কাছে বা প্রতীক ঋতব্রতের কাছে যাওয়ার পথে।  মহারাষ্ট্রে কি হয়েছিল আগে? বঙ্গে এখন কি হচ্ছে?

বলে নেওয়া ভালো মহারাষ্ট্র যা হয়েছিল পরবর্তীতে আঞ্চলিক দলগুলিকে ভেঙে ফেলার যে মডেল ব্যবহার করা হয় তাকে ‘শিন্ডে মডেল’ (Shinde Model) বলেই আখ্যা দেওয়া হয়। এই মডেলে মূলত দলত্যাগ বিরোধী আইনকে ফাঁকি দিয়ে আইনি ও রাজনৈতিক কৌশলে একটি ক্ষমতাসীন আঞ্চলিক দলকে আড়াআড়ি ভেঙে ফেলার প্রক্রিয়া সুকৌশলে কার্যকর ।

মহারাষ্ট্র কি হয়েছিল? ঠিক চার বছর আগে,২০২২ সালের জুন মাসে শিবসেনা নেতা একনাথ শিন্ডের নেতৃত্বে তত্কালীন মহাবিকাশ আঘাড়ি (MVA) সরকারকে ফেলে দেওয়ার মাধ্যমে এই মডেলটি রূপ পায়।দল ভাঙার পুরো  প্রক্রিয়াটি রূপ পায় সুনির্দিষ্ট ভাবে। এই ঘটনার প্রাথমিক ধাপ ছিল ভিন রাজ্যে বিধায়কদের গোপন স্থানান্তর। ২০২২ সালের ২০ জুন বিধান পরিষদ নির্বাচনের পরপরই একনাথ শিন্ডে ও শিবসেনার একদল বিধায়ক হঠাৎ নিখোঁজ হয়ে যান। উদ্ধব ঠাকরে শিবিরের নাগাল এড়াতে এবং দলীয় চাপমুক্ত থাকতে তাঁরা প্রথমে বিজেপিশাসিত গুজরাটের সুরাটের একটি বিলাসবহুল হোটেলে আশ্রয় নেন। পরবর্তীতে সেখান থেকে বিশেষ বিমানে তাঁদের বিজেপিশাসিত অসমের গুয়াহাটিতে উড়িয়ে নিয়ে যাওয়া হয়।

মহারাষ্ট্রের শিন্ডে মডেলে দলত্যাগ বিরোধী আইন এড়াতে নেওয়া হয় কৌশল। আর এখানেই উল্লেখযোগ্য হয়ে ওঠে সংবিধানের দলত্যাগ বিরোধী আইন। দুই-তৃতীয়াংশ বিধায়ক জোগাড় (2/3rd Rule)ভারতের সংবিধানের ১০ম তফসিল (দলত্যাগ বিরোধী আইন) অনুযায়ী, কোনো দলের আইনসভার অন্তত দুই-তৃতীয়াংশ (২/৩) সদস্য একসঙ্গে দল না ছাড়লে তাঁদের বিধায়ক পদ খারিজ হয়ে যায়।শিন্ডে কৌশলগতভাবে শিবসেনার ৫৫ জন বিধায়কের মধ্যে ৩৯ জন বিধায়ককে (যা দুই-তৃতীয়াংশের বেশি) নিজের পক্ষে টানতে সক্ষম হন।এর ফলে দলত্যাগ বিরোধী আইনের আওতা থেকে তাঁদের বিধায়ক পদ বেঁচে যায়।

আসল দল’ ও মতাদর্শের দাবিশিন্ডে অন্য কোনো দলে যোগ না দিয়ে দাবি করেন যে, তাঁরাই “আসল শিবসেনা”। তাঁদের যুক্তি ছিল, উদ্ধব ঠাকরে কংগ্রেস ও এনসিপি (NCP)-র সঙ্গে জোট করে প্রতিষ্ঠাতা বালাসাহেব ঠাকরের মূল “হিন্দুত্ব” মতাদর্শ থেকে বিচ্যুত হয়েছেন। নিজেদের মূল দল দাবি করার কারণে তাঁদের ওপর দলীয় হুইপ অমান্য করার আইনি নোটিশ তাৎক্ষণিকভাবে কার্যকর করা যায়নি।

সুপ্রিম কোর্ট ও আইনি রক্ষাকবচউদ্ধব শিবির যখন বিদ্রোহী বিধায়কদের অযোগ্য ঘোষণার জন্য ডেপুটি স্পিকারের মাধ্যমে নোটিশ পাঠায়, তখন শিন্ডে গোষ্ঠী সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয়। সুপ্রিম কোর্ট বিদ্রোহীদের জবাব দেওয়ার জন্য অতিরিক্ত সময় মঞ্জুর করে এক ধরণের অন্তর্বর্তীকালীন আইনি রক্ষাকবচ দেয়, যা উদ্ধব শিবিরের পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার গতি ধীর করে দেয়। রাজ্যপালের ভূমিকা ও আস্থা ভোট (Floor Test) অনুযায়ী পর্যাপ্ত বিধায়ক নিজের পক্ষে থাকার প্রমাণ নিশ্চিত করে শিন্ডে গোষ্ঠী রাজ্যপালের কাছে উদ্ধব সরকারের ওপর থেকে সমর্থন প্রত্যাহারের কথা জানায়। রাজ্যপাল অবিলম্বে উদ্ধব ঠাকরেকে বিধানসভায় আস্থা ভোটের মুখোমুখি হতে নির্দেশ দেন। পরাজয় নিশ্চিত জেনে ২৯ জুন ২০২২ তারিখে উদ্ধব ঠাকরে মুখ্যমন্ত্রী পদ থেকে পদত্যাগ করেন।

বিজেপির সমর্থনে সরকার গঠন ও দলের প্রতীক দখল করার পদক্ষেপ হিসেবে উদ্ধব ঠাকরের পদত্যাগের পরদিনই (৩০ জুন ২০২২) একনাথ শিন্ডে বিজেপির সমর্থনে মহারাষ্ট্রের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন এবং দেবেন্দ্র ফড়নবীশ উপ- মুখ্যমন্ত্রী  হন। পরবর্তীতে ভারতের নির্বাচন কমিশন (ECI) এবং বিধানসভার স্পিকার আইনি পর্যালোচনার পর আইনসভার সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে শিন্ডে গোষ্ঠীকেই “আসল শিবসেনা” হিসেবে স্বীকৃতি দেয় এবং দলীয় প্রতীক (ধনুক-তীর) তাদের হাতে তুলে দেয়।ভারতীয় রাজনীতিতে কোনো মূল দলের সিংহভাগ নির্বাচিত প্রতিনিধিকে বের করে এনে পুরো মূল দল ও প্রতীকের আইনি মালিকানা ছিনিয়ে নেওয়ার এই কৌশলকেই ‘শিন্ডে মডেল’ বলা হয়।

২০২৬ সালে শিন্ডে মডেলকে কৌশলে ব্যবহার করা হল।সংবিধানের নিয়ম বলছে, দুই তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা যে গোষ্ঠীর সঙ্গে থাকে, তারাই নিজেদের আসল দল বলে দাবি করতে পারে। সেই মতোই বুধবার তৃণমূলের তিন ভাগের দুই ভাগের বেশি বিধায়ক বিধানসভায় বৈঠক করেছেন। ৫২ জন হলেই হয়ে যেত। তবে তৃণমূলের বিদ্রোহী বিধায়কের সংখ্যা প্রায় ৫৮- ৫৯। এই ৫৮ জন যে সিদ্ধান্ত নেবেন, তা-ই ‘আসল তৃণমূলে’র সিদ্ধান্ত হিসেবে গৃহীত হবে। কারণ দুই-তৃতীয়াংশ সমর্থন যার দিকে থাকে, তাদের হাতেই দলের ‘মালিকানা’ ওঠে। সেই মতোই স্পিকারের কাছে দাবি জানিয়েছেন ঋতব্রত এবং সন্দীপনরা। জানাবেন, তাঁরাই ‘আসল তৃণমূল’। বিধানসভার স্পিকারের কাছে জমা দেওয়া তৃণমূলের বিদ্রোহী বিধায়ক ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের চিঠিতে ৫৮ জন (কারো কারো মতে ৫৯ জন) বিধায়কের সই রয়েছে। ফলে মমতার ঘাসফুল এবার চলে যাচ্ছে অন্যহাতে। সময়ের অপেক্ষা মাত্র। একই মডেল। রাজ্য পাল্টেছে। ফারাক বলতে মহারাষ্ট্রে ছিল রাজ্যের ক্ষমতা দখল আর বঙ্গে বিরোধী দলের ক্ষমতা দখল। লক্ষ্য ছিল একটাই, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় -অভিষেক বন্দোপাধ্যায় কে উদ্ধব ঠাকরের মতোই রাজনীতিতে অপ্রাসঙ্গিক করে দেওয়া এবং বিরোধিতার জায়গা থেকে সমূলে অপসারণ।।

 

About Post Author