Home » তৃণমূল তুমি কার? কে পাবে নাম ও প্রতীক?

তৃণমূল তুমি কার? কে পাবে নাম ও প্রতীক?

পুরন্দর চক্রবর্তী, সময় কলকাতা, ৩ জুলাই : মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নয়, ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় দাবি করছেন তিনি বা তারাই আসল তৃণমূল।  পরিস্থিতি যেদিকে তাতে এখন বাঁশের চেয়ে কঞ্চি দড়। বলাবাহুল্য “বাঁশের চেয়ে কঞ্চি দড়” (বা “বাঁশের চেয়ে কঞ্চি বড় “)  একটি অত্যন্ত প্রচলিত বাংলা বাগধারা বা প্রবাদ প্রবচন.মূল অর্থ ও ব্যবহারসহজ কথায়, আসল মানুষের চেয়ে তার অনুসারী বা সহকারীর দাপট বা আস্ফালন যখন বেশি হয়, তখন এই প্রবাদটি ব্যবহার করা হয়। প্রশ্ন উঠছে, ১৯৯৮ সালে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যখন তৃণমূল কংগ্রেসের প্রতিষ্ঠা করেছিলেন তখন ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় সহ রাজ্যের ১৩০ জন জয়ী বা পরাজিত বিধায়ক কোথায় ছিলেন? ১৯৯৮ সালে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় রাজনীতিতে ছিলেন কিনা তা নিয়েই সন্দেহ, তাঁর হাতে খড়ি বামপন্থী রাজনীতিতে। তাতে কী? বাঁশের চেয়ে কঞ্চিকেই বড় হতে দেখা গিয়েছে বারবার। সাম্প্রতিককালে মহারাষ্ট্র তার বড় প্রমাণ। শিবসেনা ও এনসিপি-তে ভাঙ্গনের পরে দল প্রতিষ্ঠাকারী শক্তি এবং শিবির ক্ষীণবল হয়েছে। দল প্রতিষ্ঠাকারীরাই হয়ে পড়েছেন মালিকানাহীন। মমতার ক্ষেত্রেও কি তাই ঘটবে?

কী হয়েছিল  মহারাষ্ট্রের রাজনীতিতে? দলীয় প্রতীক ও নাম হাতছাড়া হওয়ার ঘটনাটি শিবসেনা (Shiv Sena) এবং এনসিপি (NCP)—উভয় দলের ক্ষেত্রেই ঘটেছে। ২০২২ এবং ২০২৩ সালে দুটি দলেই বড় ধরনের অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহের কারণে দল দুটি বিভক্ত হয় এবং ভারতের নির্বাচন কমিশন (ECI) শেষ পর্যন্ত মূল প্রতীক ও নাম বিদ্রোহী গোষ্ঠীদের হাতে তুলে দেয়। দুটি দলের ক্ষেত্রে ঠিক কী ঘটেছিল?

শিবসেনা (Shiv Sena) প্রতীক বিতর্ক ও তৎকালীন  (২০২২-২০২৩)বিদ্রোহ: ২০২২ সালের জুন মাসে একনাথ শিন্ডের নেতৃত্বে শিবসেনার একটি বড় অংশের বিধায়ক তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী উদ্ধব ঠাকরের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। এর ফলে ‘মহা বিকাশ আঘাড়ি’ (MVA) সরকারের পতন ঘটে এবং শিন্ডে বিজেপির সমর্থনে মুখ্যমন্ত্রী হন।  উভয় পক্ষই নিজেদের ‘আসল শিবসেনা’ দাবি করে দলের ঐতিহ্যবাহী ‘তীর-ধনুক’ (Bow and Arrow) প্রতীকের মালিকানা দাবি করে।  ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন কমিশন সংখ্যাগরিষ্ঠতার (লেজিসলেটিভ মেজরিটি) ভিত্তিতে রায় দেয় যে, একনাথ শিন্ডের গোষ্ঠীই আসল শিবসেনা। ফলে শিন্ডে গোষ্ঠী মূল নাম ও ‘তীর-ধনুক’ প্রতীকটি লাভ করে।উদ্ধব শিবিরের নতুন প্রতীক: উদ্ধব ঠাকরের গোষ্ঠীকে ‘শিবসেনা (উদ্ধব বালাসাহেব ঠাকরে)’ নাম এবং ‘মশাল’ (Flaming Torch) প্রতীক বরাদ্দ দেওয়া হয়।

এনসিপি (Nationalist Congress Party) প্রতীক বিতর্ক ও  তৎকালীন (২০২৩-২০২৪)বিদ্রোহ: ২০২৩ সালের জুলাই মাসে শরদ পাওয়ারের ভাইপো অজিত পাওয়ার অধিকাংশ বিধায়ককে সাথে নিয়ে দল ত্যাগ করেন এবং শিন্ডে-বিজেপি সরকারে উপ-মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে যোগ দেন।  অজিত পাওয়ার এবং শরদ পাওয়ার—উভয় পক্ষই দল ও আসল প্রতীক ‘ঘড়ি’ (Clock)-এর ওপর নিজেদের দাবি পেশ করেন। ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন কমিশন অজিত পাওয়ারের পক্ষে রায় দেয়। আইনসভায় অধিকাংশ বিধায়কের (৫৩ জনের মধ্যে ৪০ জনের বেশি) সমর্থন থাকায় অজিত পাওয়ারের গোষ্ঠীকেই ‘আসল এনসিপি’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে ‘ঘড়ি’ প্রতীক দেওয়া হয়। প্রবীণ নেতা শরদ পাওয়ারের গোষ্ঠীকে ‘জাতীয়তাবাদী কংগ্রেস পার্টি-শরদচন্দ্র পাওয়ার’ নাম এবং ‘তূর্যবাদক ব্যক্তি’ (Man Blowing a Turha / Trumpet) প্রতীক ব্যবহার করার নির্দেশ দেওয়া হয়।উভয় দলেই প্রতিষ্ঠাতা পরিবারকে (ঠাকরে এবং পাওয়ার পরিবার) সরিয়ে আইনসভার সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোই নির্বাচন কমিশনের থেকে দলের মূল প্রতীক ও নাম নিজেদের দখলে নিতে সক্ষম হয়।

বঙ্গের ক্ষেত্রেও সেরকমটাই হয়তো হতে চলেছে।সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেসের (AITC) অফিশিয়াল নাম এবং ‘জোড়া ঘাস ফুল’ প্রতীকটি কোন পক্ষ পাবে, তা নিয়ে এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি এবং বিষয়টি বর্তমানে ভারতের নির্বাচন কমিশনের (ECI) বিবেচনাধীন রয়েছে। ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে পরাজয়ের পরে দলটির নিয়ন্ত্রণ ও প্রতীক পেতে দুটি প্রতিদ্বন্দ্বী পক্ষ নিজেদের ‘আসল তৃণমূল’ বলে দাবি করছে।  দলের প্রতিষ্ঠাতা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ইতিমধ্যেই নির্বাচন কমিশনে তাঁর অনুগত পদাধিকারীদের তালিকা জমা দিয়ে মূল দলের ওপর নিজের নিয়ন্ত্রণ বহাল রাখার দাবি জানিয়েছেন।  অন্যদিকে, বিধানসভার বিরোধী দলনেতা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে বিদ্রোহী বিধায়করা একজোট হয়ে অরূপ রায়কে দলের নতুন চেয়ারম্যান ঘোষণা করেছেন.। তাঁরা দাবি করেছেন যে, অধিকাংশ বিধায়ক, কাউন্সিলর এবং জেলা পরিষদ সদস্য তাঁদের সঙ্গে রয়েছেন, যা দুই-তৃতীয়াংশের বেশি। এই বিদ্রোহী প্রতিনিধি দলটি সম্প্রতি নতুন দিল্লিতে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার এবং পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চের সঙ্গে দেখা করে প্রতীক ও তহবিলের আইনি দাবি পেশ করেছে।

নির্বাচন কমিশন কীভাবে সিদ্ধান্ত নেবে?১৯৬৮ সালের ‘ইলেকশন সিম্বলস (রিজারভেশন অ্যান্ড অ্যালটমেন্ট) অর্ডার’-এর ১৫ নম্বর ধারা অনুযায়ী নির্বাচন কমিশন উভয় পক্ষের নথিপত্র, সাংগঠনিক শক্তি এবং বিধায়ক-সাংসদদের সংখ্যা খতিয়ে দেখে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে. অতীতে মহারাষ্ট্রে শিবসেনা কিংবা এনসিপির (NCP) ক্ষেত্রে যেভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে প্রতীক বণ্টন করা হয়েছিল, তৃণমূলের ক্ষেত্রেও কমিশন সেই আইনি প্রক্রিয়া মেনেই পদক্ষেপ নেবে। অর্থাৎ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের শিবির বা বর্তমানে কালীঘাট তৃণমূল বলে যা পরিচিত -তারা হীন বল এবং নাম ও প্রতীক হাতছাড়া হওয়ার সম্ভাবনা  মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের যথেষ্ট মাত্রায় রয়েছে।

বর্তমানে, মহারাষ্ট্রে অজিত পাওয়ারের মৃত্যুর পরেও অজিত পাওয়ার শিবির এখনো শক্তিশালী।  বিগত নির্বাচনে অজিত পাওয়ারের শিবিরের প্রার্থীরা শারদ পাওয়ারের শিবিরের বিরুদ্ধে ২৯ টি আসনের মধ্যে ২৭ টি আসনে জয়ী হয়েছিল। উদ্ধব ঠাকরে শিবিরের শক্তি ও প্রভাব এখন অত্যন্ত দুর্বল। মহারাষ্ট্রের ছবি যেন ধরা পড়তে শুরু করেছে পশ্চিমবঙ্গে। বঙ্গে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের শিবিরের হয়ে যে নেতা-নেত্রীরা লড়ছেন তাঁদের সংখ্যাও হাতে গোনা। তবুও মহুয়া মৈত্র- কুনাল ঘোষরা বলছেন, নির্বাচন হলে বিদ্রোহীরা মানুষের রায়ে সমুচিত জবাব পাবেন।

এখন প্রশ্ন উঠছে জনসমর্থন কাদের দিকে থাকে তা নিয়ে।আর প্রাসঙ্গিকভাবে প্রশ্ন হচ্ছে, বিধানসভা নির্বাচন ও লোকসভা নির্বাচন হতেও অনেক দেরি তাই মমতা শিবির কালের প্রবাহে রাজনীতিতে কতটা প্রভাব বজায় রাখতে পারবে? নাম ও প্রতীক হারাতে হলে( যে সম্ভাবনা যথেষ্ট মাত্রায় রয়েছে ) আগামী দিনে মমতা পন্থী তৃণমূল গোষ্ঠী আদৌ কতটা নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখে সেকথা সময়ই বলবে। এখন, “বাঁশের চেয়ে কঞ্চি দড়” হওয়ার আশু সম্ভবনা।।

About Post Author