সময় কলকাতা ডেস্ক, ৩ জুলাই : মানবাধিকার লঙ্ঘনকারী, অভিযুক্তদের কোমরে দড়ি এবং হাফ প্যান্ট পরিয়ে রাজপথে ঘোরানো ওসিদের জেলে যেতে হবে, বললেন কৃষ্ণনগরের সাংসদ মহুয়া মৈত্র। তাঁর উপরে সম্প্রতি ডিম ও সবজি ছুঁড়ে আক্রমণ নিয়ে বিজেপির বিরুদ্ধে বঙ্গের রাজনৈতিক সংস্কৃতির অবমূল্যায়ন ও সমালোচনার ফাঁকে বঙ্গের পুলিশকে দলদাস বলে আখ্যা দিলেন মহুয়া মৈত্র। তিনি বললেন, পুলিশ দলদাস বা “চাকর “। তাঁর মতে, ভৃত্য কখনও প্রভুকে জেলে পাঠাতে পারে না, তা প্রকৃতির নিয়মের পরিপন্থী। মহুয়া এও বললেন, পুলিশ গ্রেফতার হওয়া অভিযুক্তকে কোমরে দড়ি বেঁধে হাফপ্যান্ট পরিহিত অবস্থায় ঘোরাতে পারে না, এটা আইনবিরোধী। তিনি বলেছেন এরকম ঘটনায়, ওসিদের জেলে যেতে হবে। এই প্রসঙ্গে মহুয়া মৈত্র ঠিক কী বলেছেন?
মহুয়া মৈত্র বলেছেন, “যখন কেউ গ্রেফতার হয়ে যায় তখন সেই মানুষের সম্পূর্ণ দায়িত্ব পুলিশের, একটা মানুষ গ্রেফতার হয়ে যাওয়ার পরে তাকে পায়ে দড়ি, কোমরে দড়ি, হাফ প্যান্ট পরিয়ে ঘুরিয়ে প্রত্যেকটা ওসি যা করেছে তাতে তাদের একশো ভাগ জেলে যেতে হবে। ”
মহুয়া মৈত্র বলেছেন, পুলিশ ভাবছে ওদের সময় ভালো তাই আদালতের নির্দেশও তারা মানছে না। পুলিশ ভাবছে, আদালতের নির্দেশের অবমাননার কোনও অভিযোগ তাদের বিরুদ্ধে দায়ের হচ্ছে না। তিনিও বলেছেন সময় পাল্টাতে সময় লাগবে না।
মহুয়া মূত্র যা বলেছেন তা অনেকাংশে সত্যি হলেও, তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী সবেমাত্র এই আইন পাস হয়েছে। বলাবাহুল্য, এই আইন দীর্ঘদিন ধরেই কার্যকর। উল্লেখ্য, ভারতের নতুন ফৌজদারি আইন (ভারতীয় ন্যায় সংহিতা বা বি.এন.এস)-এর ৩৫৬ ধারা অনুযায়ী, অভিযুক্ত ব্যক্তির সম্মানহানির (Defamation) অভিযোগ প্রমাণিত হলে সর্বোচ্চ ২ বছরের কারাদণ্ড, জরিমানা, অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত করার বিধান রয়েছে। প্রথমবার বা ছোট অপরাধের ক্ষেত্রে জেলের পরিবর্তে সমাজসেবা (Community service) দেওয়ারও নির্দেশ দেওয়া যেতে পারে। ২০২৩ সালে আনা এই বিল ২০২৪ সালে কার্যকর হয়ে যায়।
ভারতীয় সংবিধানেও এই আইনের উল্লেখ রয়েছে। পুলিশ হেফাজতে কোনো অভিযুক্তকে প্রকাশ্যে কোমরে দড়ি বেঁধে ঘোরানো বা প্যারেড করানো সম্পূর্ণ বেআইনি, অমানবিক এবং ভারতীয় সংবিধানের ২১ নম্বর অনুচ্ছেদের (ব্যক্তি স্বাধীনতা ও সম্মানের অধিকার) পরিপন্থী।
এখন দেখা যাক, এই আইন কতটা বাস্তবমুখীভাবে প্রযোজ্য হয়েছে।সত্যিই কী পুলিশের বিরুদ্ধে কোথাও মানবাধিকার লঙ্ঘন বা কাউকে কোমরের দড়ি বেঁধে ঘোরানোর জন্য কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল? কোথাও কি পুলিশের সাজা হয়েছে?
এই প্রসঙ্গে প্রথমে উল্লেখ করা ভালো, স্টেট অব মহারাষ্ট্র বনাম রবিকান্ত এস পাতিল’ মামলা (১৯৯১)এটি এই বিষয়ের ঐতিহাসিক মামলাটির । এই ঘটনায় এক বিচারাধীন বন্দিকে পুলিশ হাতকড়া পরিয়ে এবং কোমরে দড়ি বেঁধে রাস্তায় প্রকাশ্যে ঘুরিয়েছিল।আদালতের সাজা ও পর্যবেক্ষণ: বোম্বে হাইকোর্ট এই ঘটনাকে সংবিধানের ২১ নম্বর অনুচ্ছেদের (জীবন ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতার অধিকার) চরম লঙ্ঘন বলে গণ্য করে। আদালত এই অমানবিক কাজের জন্য দায়ী পুলিশ ইন্সপেক্টরকে ব্যক্তিগতভাবে ১০,০০০ টাকা জরিমানা (ক্ষতিপূরণ) দেওয়ার নির্দেশ দেয়। পরবর্তীতে সুপ্রিম কোর্টও পুলিশের এই দোষী সাব্যস্তকরণ বহাল রাখে, তবে ক্ষতিপূরণের অর্থটি ব্যক্তিগতভাবে অফিসারের বদলে রাজ্য সরকারকে দেওয়ার নির্দেশ দেয়।
আদালত অবমাননা নির্দেশে পুলিশের শাস্তির বিষয়টি নতুন কিছু নয়। পুলিশ মানবাধিকার লঙ্ঘন করায় হাল আমলেও তাদের শাস্তির উদাহরণ রয়েছে। ২০২৬ সালেও সুপ্রিম কোর্টের ঐতিহাসিক ‘আর্নেশ কুমার’ নির্দেশিকা লঙ্ঘন করে এক যুবককে বেআইনিভাবে গ্রেফতার এবং থানায় মারধর করার অপরাধে আগরতলা পূর্ব থানার একজন সাব-ইন্সপেক্টরকে (SI) আদালত অবমাননার দায়ে দোষী সাব্যস্ত করেছে। ত্রিপুরা হাইকোর্ট তাকে ২,০০০ টাকা জরিমানা এবং অনাদায়ে ১ মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ডের নির্দেশ দিয়েছে ।
পশ্চিমবঙ্গে একাধিক অভিযুক্তকে কোমরে দড়ি বেঁধে ঘোরানোর ঘটনায় কলকাতা হাইকোর্ট তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেছে. আদালত সাফ জানিয়েছে, “কোনো অভিযুক্তের কোমরে দড়ি পরিয়ে ঘোরানো কখনই আইনত সমর্থনযোগ্য নয়” এবং রাজ্য সরকারের কাছে এই পুলিশি ‘অতি-সক্রিয়তা’র বিরুদ্ধে দ্রুত রিপোর্ট তলব করা হয়েছে। মহুয়া মৈত্র এই ঘটনাকেই বলেছেন, এখন হচ্ছে না, পুলিশ ভাবছে বিচারের বাণী নীরবে নিভৃতে কাঁদে, কিন্তু বেশিদিন এটা চলে না। সাংসদ মহুয়া পুলিশের উদ্দেশ্যে বার্তা দিয়ে বলেছেন, দেখতে থাকুন, আমরাও দেখছি।।
ওসিদের জেলে যেতে হবে #মহুয়ামৈত্র


More Stories
তৃণমূল তুমি কার? কে পাবে নাম ও প্রতীক?
৫ টাকায় মাছ ভাত মা আহার ক্যান্টিনে পাতে পেল মানুষ
সাতদিনের পুলিশি হেফাজত দেবরাজের