সময় কলকাতা ডেস্ক, ২৪ জুলাই : বেঁচে থাকলে আগামী সেপ্টেম্বর মাসের ৩ তারিখ তাঁর বয়স হত একশো বছর। তিনি বেঁচেছিলেন মাত্র ৫৩ বছর। ১৯৮০ সালের ২৪ জুলাই ওগো বধূ সুন্দরীর শুটিং চলাকালীন সেটেই হৃদ যন্ত্রের দুর্বল্যজনিত কারণে অসুস্থ হয়ে পড়েন। বেলভিউ নার্সিংহোমে নিয়ে গেলেও তিনি শেষ পর্যন্ত ফিরে আসেননি। আচমকা খুব অসময়ে প্রয়াত হন তিনি। আর মানুষ জন্মের দিনের চেয়ে তাঁর মৃত্যুর দিনটিকে বেশি মনে রেখেছে। তিনি বাংলা ছায়াছবির মহানায়ক উত্তম কুমার ।
একটি বিখ্যাত প্রবাদ রয়েছে—”কীর্তিমানের মৃত্যু নেই।” অর্থাৎ, মানুষ তার জন্মের কারণে নয়, বরং মৃত্যুর আগে রেখে যাওয়া মহান কর্মের জন্যই চিরস্মরণীয় হয়ে থাকেন। কৃতকর্মের ও সারাজীবনের অর্জিত গুণাবলীর মাধ্যমে একটি মানুষকে মনে রাখা হয়। প্রায়শ দেখা যায়,জন্মের চেয়ে সেই সমস্ত মানুষের মৃত্যু অধিক স্মরণীয় হয়ে থাকে, যাঁরা নিজেদের জীবনকে মানবকল্যাণ, দেশ বা কোনো মহান আদর্শের জন্য উৎসর্গ করে গেছেন। এই তালিকায় সর্বাগ্রে রয়েছেন দেশপ্রেমিক ও স্বাধীনতা সংগ্রামীরা। মহানায়ক উত্তম কুমার কোনো স্বাধীনতা সংগ্রামীর নাম নয় যিনি দেশের স্বার্থে প্রাণ বলি দিয়েছেন। তবুও তাঁর জন্মের চেয়ে মৃত্যুর দিনটিকে মানুষ কেন স্মরণে রেখেছে?
বস্তুত, উত্তম কুমারের আকস্মিক চলে যাওয়া বাঙালি জাতিকে স্তব্ধ করে দিয়েছিল। এই চরম অপূর্ণতা ও আকস্মিকতার ধাক্কাই মানুষের মনে চিরস্থায়ী ক্ষত তৈরি করে। শ্রাবণের চিরন্তন আবেগ ও আবহাওয়াবাঙালির সংস্কৃতিতে বর্ষা বা শ্রাবণ মাস এমনিতেই বিরহ ও শোকের প্রতীক। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং কাজী নজরুল ইসলামের প্রয়াণের মতোই উত্তম কুমারের প্রয়াণও ঘটেছিল এই বর্ষণমুখর শ্রাবণে। বৃষ্টির আবহ এই শোকের দিনটিকে বাঙালির আবেগ ও নস্টালজিয়ার সঙ্গে স্থায়ীভাবে যুক্ত করে দিয়েছে। ২৪ জুলাই এমনই এক স্মরণ তিথি।

উত্তম কুমারের মৃত্যুর পর কলকাতার রাস্তায় মানুষের যে স্বতঃস্ফূর্ত এবং অভূতপূর্ব ঢল নেমেছিল, তা কলকাতার ইতিহাসে বিরল। সংবাদমাধ্যম ও সাধারণ মানুষের মুখে মুখে সেই শেষ যাত্রার বিবরণ বছরের পর বছর ধরে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বাহিত হয়ে আসছে। ফলে দিনটি একটি ঐতিহাসিক স্মারকে পরিণত হয়েছে। ২৫ জুলাই তাঁর মরদেহ গিরিশ মুখার্জি রোড ও ভবানীপুরের রাস্তা দিয়ে কেওড়াতলা শ্মশানে নিয়ে যাওয়া হয়।স্তব্ধ হয়ে যায় কলকাতা। মহানায়ককে শেষ দেখা দেখতে লক্ষ লক্ষ মানুষ রাস্তায় ভিড় জমান, যার ফলে কলকাতার ট্রাফিক ও জনজীবন থমকে গিয়েছিল।
মনস্তাত্ত্বিকভাবে যদি দেখা যায় তাহলে উপলব্ধি করা যাবে যে উত্তম কুমারের মৃত্যু আদতে ছিল পশ্চিমবঙ্গের বাঙালির কাছে এক সাংস্কৃতিক অবসান। বাঙালির চলচ্চিত্র শিল্পের রসাস্বাদনে তার ভূমিকা ছিল অপরিহার্য। প্রযুক্তির যুগের আগমন হওয়ার আগে ও বর্তমান বাজার ভাবনার আগে যখন শিল্পকলার কদরই ছিল শিল্পের সবচেয়ে বড় সাফল্য, তখন উত্তম কুমারের রাজত্বই ছিল বাঙালির স্বর্ণময় স্বপ্নের বিচরণভূমি।১৯৮০ সালের ২৪ জুলাই শুটিং চলাকালীন হঠাৎ হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মাত্র ৫৩ বছর তাঁর প্রয়াণ বড্ড আকস্মিক ছিল। খ্যাতির শীর্ষে থাকা অবস্থায় তাঁর এই হঠাৎ চলে যাওয়া বাঙালি মনে গভীর ও স্থায়ী শোকের জন্ম দেয়, যা জন্মদিনের আনন্দের চেয়ে মৃত্যুর দিনের বেদনাকে বেশি তীব্র করে তুলেছে।সেটির আচমকা পতন বাঙালিকে এতটাই ধাক্কা দেয় যে ২৪ জুলাই দিনটিকে এক চূড়ান্ত ট্র্যাজেডির দিন হিসেবেই ইতিহাসে জায়গা করে নিয়েছে। আজও তাই বাঙালি তাঁকে ভুলতে পারেনি, আজও বলা হয় তাঁর আরো অনেক কিছু দেওয়ার ছিল বাংলা চলচ্চিত্রকে। উত্তম কুমারের মৃত্যুর দিনটিকে তাই আপামর বাঙালি স্মরণ করে থাকে স্বজন হারানোর ব্যথা নিয়ে।।


More Stories
শহীদ দিবসে স্মরণ : “ক্ষুদিরাম নিচে অদৃশ্য হইয়া গেল”
অজানা অলৌকিক রবীন্দ্রনাথ : গুরুদেবের প্রেতচর্চা
অসমের বন্যাদুর্গতদের পাশে দাঁড়ালেন উত্তরবঙ্গের দম্পতি