Home » স্বাধীনতার রক্তঝরা দিন ও বারাসাতের সুবর্ণপত্তনের সংগ্রামী ইতিহাস

স্বাধীনতার রক্তঝরা দিন ও বারাসাতের সুবর্ণপত্তনের সংগ্রামী ইতিহাস

পুরন্দর চক্রবর্তী, সময় কলকাতা, ১৫অগাস্ট, ২০২৬: ” “যাঁরা স্বর্গগত তাঁরা এখনো জানে ” – কি বীজ মন্ত্র তারা বর্তমান প্রজন্মকে ঠেলে দিয়ে গেছে জানতে হলে অখণ্ড  ভারতের অতীত ইতিহাসের চর্চা না হওয়া  কিছু অধ্যায় চর্চা করা প্রয়োজন। চর্চা প্রয়োজন এমন কিছু ভারতীয় স্বাধীনতার ইতিহাসের স্মৃতি বিজড়িত স্থানের যেখানে মাটিতে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম আজও মৃত্যুহীন প্রাণের কথা বলে যাবে। মননে ও স্মরণে,  হৃদয় জুড়ে স্বাধীনতা দিবসের উদযাপন যেখানের রীতি রেওয়াজ ও ঐতিহ্য এমন একটি অঞ্চলের ইতিহাসে আলোকপাত। স্বাধীনতা সংগ্রামীদের স্মৃতিঘেরা বারাসাতের সুবর্ণপত্তনের সংগ্রামী ইতিহাস নিয়ে একটি বিশেষ প্রতিবেদন।

স্বাধীনতা সংগ্রাম ও স্বাধীনতা সংগ্রামীদের স্মৃতি বিজড়িত স্থান বারাসাতের সুবর্ণপত্তন।আজও,৮০ তম স্বাধীনতা দিবসে এখানের মায়াবী হাওয়া কানে মৃদুস্বরে বলে যাবে, “রক্ত ঝরিয়ে অর্জিত স্বাধীনতা। ভেদাভেদ ভুলে এক হয়ে থাকো। একসূত্রে নিজেদের বেঁধে রাখো।” সুবর্ণপত্তনের মাটি স্বাধীনতাসংগ্রামীদের স্পর্শ ও স্মৃতিবিজড়িত। স্থানীয় অধিকাংশ পরিবারের পূর্বপুরুষরা সরাসরি স্বাধীনতা সংগ্রামের সঙ্গে জড়িয়ে ছিলেন। তাই সুবর্ণপত্তন জুড়ে বাস করা চারশোর বেশি পরিবারের সহস্রাধিক মানুষের রক্তের মধ্যে রয়েছে প্রবল স্বদেশপ্রেম যা তাঁদের স্বদেশ নিয়ে আলাপচারিতার মাধ্যমে এক লহমায় প্রকাশ করবে । এঁরা স্বাধীনতা দিবসে নিজেদের পারিবারিক উৎসবের চেয়ে বেশী উৎসবমুখর হয়ে ওঠেন। এমনকি,সুবর্ণপত্তন করোনা কালেও স্বাস্থ্য নির্দেশিকা মেনে স্বাধীনতা দিবসের  উৎসবে সামিল হয়েছিল এবং ঘরে নিজেদের আটকে রাখেনি । এখনো তারা স্বাধীনতার দিনটিকে উদযাপন করে প্রাণের সবচেয়ে প্রিয় দিন হিসেবে।

বরাবরই   সুবর্ণপত্তনে স্বাধীনতা দিবসের তোড়জোড় শুরু হয়ে যায় স্বাধীনতা দিবস আসার বেশ কয়েকদিন আগে । সুবর্ণপত্তন এদিন শ্রদ্ধায় আর ভালোবাসায় স্মরণ করবে স্বাধীনতা সংগ্রামীদের। সুবর্ণপত্তনের জল-হাওয়া-মাটিতে মিশে আছে মহাপুরুষ স্বাধীনতা সংগ্রামীদের শ্বাস যাঁরা পাঁজর দিয়ে দুর্গঘাঁটি গড়তে জানতেন।এখনও কিছু মানুষ এখানে বেঁচে রয়েছেন যাদের সঙ্গে প্রত্যক্ষ যোগ ছিল স্বাধীনতার আগের রক্তঝরা দিনগুলির।

বারাসাতের সুবর্ণপত্তনে স্বাধীনতা দিবসে যে আনন্দোজ্জ্বল মানুষগুলিকে দেখতে পাওয়া যাবে তাঁদের অনেকেরই পূর্বপুরুষ ছিলেন স্বাধীনতা সংগ্রামী। কেউ সূর্যসেন বা কেউ নেতাজি সুভাষের অনুগামী। কেউবা ঝাঁসী রানী রেজিমেন্টের সঙ্গে যুক্ত। স্বদেশী করার “দায়ে”কারাগারে এঁদের অনেকেই কাটিয়েছেন অনেকটা করে সময়। ভারত ছাড়তে হয়েছে মন্ত্রের সাধনে। দেশকে স্বাধীন করতে হবে, ছিল অগ্নিযুগের বীজমন্ত্র। সাতচল্লিশ সালে স্বাধীনতার সময় সুবর্ণপত্তনের পত্তন হয় নি, এখানের বাসিন্দা চারশো একান্ন পরিবারের সদস্যরা ছিলেন বার্মায়, প্রবাসে দৈবের বশে।অথচ প্রবাসে থাকলেও তাঁদের অনেকেরই ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে কমবেশী অবদান ছিল। অন্তত সাতাশ জন স্বাধীনতা সংগ্রামী সহ দেশে ফিরতে উন্মুখ মানুষগুলি তেষট্টি -চৌষট্টি সালে প্রত্যাগত হন।দেশে ফিরে তাঁদের বিজয় আনন্দ পালনের দিন ছিল ১৫ আগস্ট। বিগত পঞ্চাশ বছরেরও বেশী সময় ধরে বারাসাতের বার্মা কলোনির স্বাধীনতা উৎসবে প্রাণ ও আবেগ মিশে থাকে বড্ড বেশী করে।

ভারত স্বাধীন হওয়ার পরে এক যুগের বেশি সময় কেটে গেছে তখন। তৎকালীন বার্মা সরকারের নির্দেশিকা জারি হল হয় বার্মার নাগরিকত্ব নিতে হবে অথবা দেশ ছাড়তে হবে। বার্মার বাসিন্দা ভারতীয়রা ফিরতে শুরু করলেন দেশে। ৬৩-৬৪ সাল নাগাদ ভারতে প্রত্যাগত হতে শুরু করলেন বার্মা ফেরত ভারতীয়রা। প্রত্যাগত বাঙালি মানুষগুলি ছড়িয়ে রইলেন এদিকে ওদিকে ।চৌষট্টি সালে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পরে এঁদের পুনর্বাসন দেওয়ার কথা ভাবলেন লাল বাহাদুর শাস্ত্রী।তাঁর গঠনমূলক ভাবনার অনুসারী পদক্ষেপ নেওয়া শুরু হল। কিন্তু লালবাহাদুর শাস্ত্রী প্রয়াত হলেন অসময়ে। এর পরে সাতষট্টি সালে মূলত রাজ্যপাল ধরমবীরার উদ্যোগে বারাসাত সুবর্ণপত্তন বা বার্মা কলোনী পত্তন হতে শুরু করল। ১৯৬৮ সালে আড়াই কাঠা জায়গা ও দু কামরার বাড়ি এবং ব্যবসার জন্য পাঁচ হাজার টাকা বার্মা প্রত্যাগতদের হাতে দিয়ে বারাসাত শহরের এক প্রান্তে পত্তন হল বার্মা কলোনীর যা কিনা সুবর্ণপত্তন নামে স্বীকৃতি পেল। চৌষট্টি থেকে সাতাত্তর পর্যন্ত বার্মা প্রত্যাগতদের নিয়ে বারাসাতে কলোনী গড়ে উঠল। শুরুতে ঊনত্রিশ বা তিরিশ ঘর বার্মা প্রত্যাগত এলেও সুবর্ণপত্তন শেষ পর্যন্ত প্রায় পাঁচশো পরিবার নিয়ে গঠিত হল। এঁদের অনেকেই ছিলেন চট্টগ্রামের বাসিন্দা। উল্লেখ্য প্রথমে আসা উনত্রিশ -ত্রিশ পরিবারের মধ্যে সাতাশ জনই ছিলেন সক্রিয় বিপ্লবী ও তাঁদের পরিবার। এঁদের কেউ কেউ ব্রিটিশ পুলিশের চোখে ধুলো দিয়ে পালিয়েছিল বার্মায়। কেউ আবার বার্মায় পালিয়ে সেদেশে নেতাজির আজাদ হিন্দ ফৌজ বা আই এন এ -র সঙ্গে সক্রিয় ভাবে জড়িয়ে পড়েন। এই সাতাশটি পরিবার ছাড়াও বার্মা কলোনির মানুষদের মধ্যে আরো বেশ কিছু পরিবারের মানুষ ছিলেন পরোক্ষ ভাবে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের সঙ্গে যুক্ত। তাঁদের বৈপ্লবিক কর্মকান্ডের ব্যাপ্তি ও চরমপন্থী হিসেবে তাঁদের পূর্ব পরিচয় প্রথমে গোপন ছিল। ফরোয়ার্ড ব্লক বারাসাতে রাজনৈতিক ভাবে ক্ষমতাসম্পন্ন হয়ে উঠতেই প্রত্যাগত স্বাধীনতা সংগ্রামীরা আলোর বৃত্তে আসেন। তাঁদের দেশের প্রতি অবদানের প্রকাশ পায়, স্বীকৃতিও মেলে। চিরস্মরণীয়   সাতাশ জন বিপ্লবীর মধ্যে সর্বশেষ নক্ষত্র পতন ঘটে শম্ভুনাথ দত্তের প্রয়াণে।স্বাধীনতা সংগ্রামী মানুষগুলি আজ আর নেই কিন্তু তাঁদের পরিবার আজও আছে বার্মা কলোনীতে যাঁরা স্বাধীন ভারতবর্ষের নাগরিক হিসেবে প্রতিনিয়ত গর্ব বোধ করেন।বারাসাতের ছোটো এলাকাটির মাটি আর জলে রয়েছে দেশকে নিয়ে স্বাধীনতা সংগ্রামীদের স্বপ্ন । আর সুবর্ণপত্তনের হাওয়ায় মিশে আছে তাঁদের দেশাত্মবোধ।

 

বারাসাতের সুবর্ণপত্তনের সংগ্রামী ইতিহাস আলোচনার পরিশেষে বলতে হয় কিভাবে এখানে স্বাধীনতা দিবস পালন অন্য মাত্রা পায়!১৯৬৯ সালে গঠিত নেতাজি বাল ব্রিগেডের স্বাধীনতা দিবস উদযাপন অনুষ্ঠানে প্রয়াত স্বাধীনতা সংগ্রামীদের পরিবারের সদস্যরা আসেন। একসুত্রে বাঁধা মানুষেরা বলেন ভেদাভেদহীন ভারতের কথা। সুবর্ণপত্তন আলোকিত হয় দেশাত্মবোধের ভাবনায়।

যারা স্বর্গগত তাঁরা সত্যি জানতেন স্বর্গের চেয়ে প্রিয় জন্মভূমি, তাদের বংশধরেরাও একই বীজ মন্ত্র বয়ে নিয়ে চলেছেন । তাই ২০২৬ সালের স্বাধীনতা দিবস ব্যতিক্রম নয়। তাই সুবর্ণপত্তনে উৎসবের সৌরভে দিনটি উদযাপিত । বারাসাতের সুবর্ণপত্তন আর ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম বড্ড সমার্থক। ১৫ অগাস্ট দিনটি সুবর্ণপত্তনের প্রতিটি মানুষের নতুন করে বেঁচে থাকার দিন, আবেগের দিন। হৃদয় জুড়ে স্বাধীনতার এমন যাপন খুঁজে পাওয়া বিরল!

#বারাসাতের সুবর্ণপত্তনের সংগ্রামী ইতিহাস

ছবি : সময় কলকাতা আর্কইভ ও ফাইল ( অধিকাংশ ছবি ২০২৩ সালের আর্কাইভ থেকে গৃহীত )

About Post Author