Home » স্বপ্না বর্মনের অবসর

স্বপ্না বর্মনের অবসর

সানি রায়, সময় কলকাতা , ৩১ জুলাই : তার প্রধান পরিচিতি আন্তর্জাতিক ক্রীড়া মঞ্চে।রাজনীতিতে স্বল্পকালীন যাত্রায় পরাজয়ের পরে কার্যত গৃহবন্দি রেখেছিলেন নিজেকে।  ভোটের ফল প্রকাশের আড়াই মাসের মাথায় তিনি এবার অবসর ঘোষণা করলেন ট্র্যাক এন্ড ফিল্ড থেকে।ভারতীয় অ্যাথলেটিক্সে এক সোনালী অধ্যায়ের অবসান ঘটিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে বুট জোড়া তুলে রেখে অবসর ঘোষণা করলেন দেশের অন্যতম সফল অ্যাথলেট, জলপাইগুড়ির মেয়ে স্বপ্না বর্মন।

নিজের ফেসবুক পেজে দীর্ঘ ও গৌরবময় ক্রীড়া জীবনের ইতি টেনে ট্র্যাক অ্যান্ড ফিল্ডকে বিদায় জানানোর এই কঠিন সিদ্ধান্তটি স্বপ্না সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এক আবেগঘন বার্তার মাধ্যমে প্রকাশ করেছেন। ২০১৮ জাকার্তা এশিয়ান গেমসে চোয়ালের অসহ্য যন্ত্রণা নিয়েও দেশের জন্য সোনা জয় করা এই লড়াকু অ্যাথলিট চোটের কারণে শেষ পর্যন্ত শরীরের কাছে হার মানতে বাধ্য হলেন। ২০২৬ সালে নিজের খেলার জগৎ থেকে নিজেকে সরিয়ে রাজনীতির ময়দানে নামিয়ে নেন। ২৬ এর বিধানসভা নির্বাচনে জলপাইগুড়ি জেলার রাজগঞ্জ বিধানসভা কেন্দ্রটিতে প্রাক্তন বিধায়ক ভাগেশ্বর রায়ের পরিবর্তে স্বপ্না বর্মনকে এই বিধানসভা কেন্দ্রের তৃণমূল কংগ্রেস টিকিট দেয়। টিকিট পেতেই রাজ্যের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় থেকে শুরু করে তৃণমূল কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সেকেন্ড ইন কমান্ড অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় পর্যন্ত তার মাথায় হাত রাখেন। তৃণমূল কংগ্রেসের গোটা রাজ্যে ভরাডুবির পাশাপাশি জলপাইগুড়ি জেলার রাজগঞ্জ বিধানসভা কেন্দ্রটি হারিয়ে ফেলেন তৃণমূল। স্বাভাবিকভাবেই স্বপ্না বর্মনের স্বপ্ন আর পূরণ হলো না। স্বপ্না বর্মনকে বিপুল ভোটে হারিয়ে সেই আসনটিতে বিধায়ক পথ পান বিজেপির নেতৃত্ব। বিপুল পরিমাণ ভোটে পরাজয়ের পর স্বপ্না বর্মন  গৃহবন্দি হয়ে পড়েন। তারপর দীর্ঘ দুমাস পর সামাজিক মাধ্যমে নিজেকে তৎপর দেখিয়ে আবার মানুষের জন্য কাজ করার বার্তা দেন স্বপ্না বর্মন।

এবার তিনি জানিয়ে দিলেন তিনি কি ক্রীড়াক্ষেত্র থেকে অবসর নিচ্ছেন। অ্যাথলেটিক্সকে শুধু নিজের পেশা নয়, বরং পরিচয়, আবেগ এবং জীবনের একমাত্র স্বপ্ন হিসেবে দেখতেন জলপাইগুড়ির এই অ্যাথলিট। দীর্ঘ দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে কঠোর পরিশ্রম, আত্মত্যাগ এবং অসংখ্য সংগ্রামের স্মৃতিতে ঘেরা এই যাত্রার অবসান ঘটানো তাঁর জীবনের সবচেয়ে কঠিনতম সিদ্ধান্তগুলোর একটি ছিল।তবে গত কয়েক বছর ধরে একের পর এক চোট তাঁর কেরিয়ারকে বিপর্যস্ত করে তুলেছিল। বিশেষ করে স্লিপড ডিস্ক (মেরুদণ্ডের সমস্যা) এবং হাঁটুর মারাত্মক ক্রনিক চোটের কারণে তিনি দীর্ঘদিন ধরে ভুগছিলেন। মানসিক দৃঢ়তা এবং ট্র্যাকে ফেরার অদম্য ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও, তীব্র শারীরিক সীমাবদ্ধতার কারণে শেষ পর্যন্ত তিনি নিজের বুট জোড়া তুলে রাখার সিদ্ধান্ত নেন।স্বপ্না বর্মন ভারতীয় অ্যাথলেটিক্সের ইতিহাসে এমন এক নাম, যিনি প্রতিকূলতাকে জয় করতে শিখিয়েছেন। দুই পায়ে ১২টি আঙুল নিয়ে জুতো পরার তীব্র কষ্ট সহ্য করেও তিনি বিশ্বমঞ্চে ভারতের তেরঙ্গা উড়িয়েছেন।প্রথম ভারতীয় হেপ্টাথলিট হিসেবে এশিয়ান গেমসে সোনা জিতে ইতিহাস গড়েছিলেন। জাকার্তায় দাঁতের ও চোয়ালের তীব্র ব্যথার কারণে মুখে টেপ বেঁধে অংশ নিয়েও ৬০২৬ পয়েন্ট স্কোর করে সোনা ছিনিয়ে নেন তিনি।এশিয়ান গেমসে দেশের নাম উজ্জ্বল করার অনন্য স্বীকৃতিরূপে ২০১৯ সালে ভারত সরকার তাঁকে সম্মানজনক ‘অর্জুন পুরস্কার’-এ ভূষিত করে।২০১৯ এবং ২০২৩ সালের এশিয়ান অ্যাথলেটিক্স চ্যাম্পিয়নশিপে তিনি দেশের জন্য রুপোর পদক জেতেন। এ ছাড়া ২০২৩ সালের এশিয়ান ইনডোর চ্যাম্পিয়নশিপেও তিনি পেন্টাথলনে রুপো অর্জন করেন।অবসরের বার্তা দিতে গিয়ে স্বপ্না জানান, দেশের জন্য তিনি নিজের সর্বস্ব উজাড় করে দিয়েছেন এবং ট্র্যাক ছাড়ার মুহূর্তে তাঁর মনে কোনো আক্ষেপ নেই। বরং দীর্ঘ এই যাত্রায় যাঁরা প্রতি মুহূর্তে তাঁর পাশে ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন সেই পরিবার, কোচ, সতীর্থ, সমর্থক এবং সকল শুভানুধ্যায়ীদের প্রতি তিনি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন।চোখে জল আর হৃদয়ে একরাশ স্মৃতি নিয়ে বিদায় জানানো এই মহান অ্যাথলিটের অনুপস্থিতি ভারতীয় ক্রীড়াজগতে শূন্যতা সৃষ্টি করবে বলাই বাহুল্য।।

About Post Author