Home » ভেনেজুয়েলা ও ইরাকে মার্কিন আগ্রাসন : মাদুরো ও সাদ্দাম কি একসুতোয় বাঁধা?

ভেনেজুয়েলা ও ইরাকে মার্কিন আগ্রাসন : মাদুরো ও সাদ্দাম কি একসুতোয় বাঁধা?

Oplus_131072

পুরন্দর চক্রবর্তী, সময় কলকাতা : কিছু কিছু বিষয় যেন এক সুতোয় বাঁধা থাকে। বাঁধা পড়ে যায় কিছু আশ্চর্য সমীকরণের মধ্যে দিয়ে। যেমন খনিজ তেল, খনিজ বা প্রাকৃতিক সম্পদ মধ্যপ্রাচ্যর ইরাক বা লাতিন আমেরিকার ভেনেজুয়েলার যোগসূত্র। ঠিক একইভাবে এক সুতোয় বাঁধা রয়েছে সাদ্দাম হোসেন ও নিকোলাস মাদুরোর ভাগ্যলিপি। ২০০৬ সালের ৩০ ডিসেম্বর বা ২০০৬ সালের ৩ জানুয়ারি ফাঁসি হয়েছিল সাদ্দাম হোসেনের । মাঝে ১৯ বছরের ব্যবধান। বন্দি হলেন মাদুরো। সময় পাল্টেছে ঠিকই, তবুও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে  আমেরিকার সিদ্ধান্তই শেষ কথা বলছে যা অন্য দেশের ভাগ্য এবং আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে নীতিনির্ধারণ করার ক্ষমতা একই থেকে গিয়েছে বা আরও প্রবল হয়েছে। যে দেশের উপরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের চোখ পড়েছে, সেখানে তারা আগ্রাসী হয়েছে,কার্যত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যুগে যুগে আন্তর্জাতিক মঞ্চের বিচারক হয়ে থেকে গিয়েছে। আরও সবিস্তারে বলা যাক।

দীর্ঘ সময়ের ব্যবধানে ইরাক ও ভেনেজুয়েলার প্রেক্ষাপট যেন একইরকম, এক তুলিতে যেন ছবি আঁকা হয়েছে। ২০০৩ সালে ইরাকে মার্কিন সেনা হানা দেয়। সঙ্গে ছিল যুক্তরাজ্যের বাহিনী।  ইরাকের প্রেসিডেন্ট সন্ত্রাসী গোষ্ঠী আল কায়দাকে সমর্থন দিচ্ছেন এই অভিযোগ এনে ২০০৩ সালের ১৯ মার্চ যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের যৌথ বাহিনী হামলা চালায় ইরাকে। প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেন সেসময় সাধ্যমতো প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। মাসখানেক ধরে চলা সর্বাত্মক যুদ্ধে ইরাকের পরাজয় হয়। আড়াই লাখের ওপরে ইরাকের মানুষের মৃত্যু হয় এই যুদ্ধে। বাগদাদের পতন হয়  এপ্রিল মাসে। পালিয়ে গেলেও ২০০৩ সালের ১৩  নভেম্বর  ইরাকের তিকরিতের কাছে ক্ষমতাচ্যুত  প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেন ধরা পড়েন । মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সংজ্ঞা অনুযায়ী, সাদ্দাম “মানবতা বিরোধী ” অপরাধে ধরা পড়েন মার্কিন সেনার হাতে ও ইরাকেই তাঁর বিচার শুরু হয় । ২০০৬ সালের ৩০শে ডিসেম্বর  বিশেষ ট্রাইব্যুনালে সাদ্দাম হোসেনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। ফাঁসিতে ঝুলিয়ে তাঁর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। তারপরে প্রায় দু দশক কেটেছে।

এবার ২০২৬ সালের জানুয়ারি মাসের ৩ তারিখে মার্কিন সেনা অভিযান চালায় ভেনেজুয়েলায়। কারাকাস থেকে বন্দি করা হয় ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে। মার্কিন অভিযোগ, তিনি মাদক পাচারের আন্তর্জাতিক পান্ডা। অভিযোগ পাল্টেছে, বিচারক রাজা পাল্টেছে তবে রাজা একই দেশের মসনদে। বিচারক দেশটির নাম আমেরিকা। মার্কিন আগ্রাসন ও সাম্রাজ্যবাদী শক্তির বিরুদ্ধে যারা সরব হতে চাইছেন, তাঁরা যতই বলুন খনিজ তেল ও প্রাকৃতিক সম্পদের জন্যই দীর্ঘ ১৯ বছরের ব্যবধানে মার্কিন আগ্রাসন ঘটেছে এশিয়ার ইরাকে ও দক্ষিণ আমেরিকার ভেনেজুয়েলায় – তাতে অবশ্য আমেরিকার কিছু আসে যায় না! সাদ্দামের ফাঁসির পরে, ২০০৬ সালে আন্তর্জাতিক বিচারকের ছড়ি হাতে  আমেরিকান তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশ বলেছিলেন, সাদ্দাম হোসেনের মৃত্যুদণ্ড  ইরাকের জন্য ন্যায়বিচার এবং গণতন্ত্রের পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। এখন বিচারকের সেই ছড়ি আমেরিকার বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের হাতে। তিনিও প্রায় একইসুরে কথা বলছেন। তাঁর মতে, ভেনেজুয়েলা হয়ে উঠেছিল আন্তর্জাতিক অপরাধের আখড়া  এবং এবার থেকে আমেরিকাযই নীতি নির্ধারক হয়ে উঠবে  ভেনেজুয়েলার। দুই যুগে আমেরিকার উদ্দেশ্য ও অভিপ্রায় আমেরিকার প্রেসিডেন্টগণ স্পষ্ট করে দিয়েছেন। খালি চোখে সেই অভিপ্রায় কে কাটাছেঁড়া করে  আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, খনিজ তেলে ভেসে গেছে ইরাক ও ভেনেজুয়েলার ভবিষ্যৎ। খনিজ সম্পদ থাকাই কাল তাদের, যার জন্য দীর্ঘ সময়ের ব্যবধানে প্রাণ সংকট হয়েছে দুই দেশের দুই প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম ও মাদুরোর। কেন খুব চাপাস্বরে বারবার  এরকম অভিযোগ উঠছে যে, দুটি দেশেই খনিজ তেল আমেরিকার আগ্রাসনের কারণ। দুটি দেশের রাষ্ট্র প্রদানের অপরাধ কি ছিল যা আমেরিকা জানিয়েছে? আন্তর্জাতিক নীতি-ই বা কী বলছে? আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও আন্তর্জাতিক নীতি বিশেষজ্ঞরা কী বলছেন?

সংশ্লিষ্ট বিষয়ে  বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ২০০৩ সালে ইরাকে মার্কিন আগ্রাসন এবং সাদ্দাম হোসেনকে ক্ষমতাচ্যুত করার পেছনে ‘তেল’ একটি অন্যতম প্রধান ও বিতর্কিত কারণ হিসেবে বিবেচনা করা হলেও , তেল একমাত্র কারণ ছিল না। এই যুদ্ধের প্রেক্ষাপট এবং উদ্দেশ্য ছিল অত্যন্ত জটিল, তবুও
তেল ও কৌশলগত স্বার্থ আমেরিকার আগ্রাসনের প্রধান কারণ বলে মনে করা হয়। ইরাকের কাছে ছিল বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ তেলের ভান্ডার। অনেক বিশ্লেষকের মতে, তেলের বাজারের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা এবং বিশ্ববাজারে তেলের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একটি কৌশলগত লক্ষ্য ছিল। সাদ্দাম হোসেন তেলের লেনদেন ডলারের পরিবর্তে অন্য মুদ্রায় করার পরিকল্পনা করেছিলেন বলেও ধারণা করা হয়, যা মার্কিন অর্থনীতির জন্য হুমকিস্বরূপ ছিল। ইরাকের কাছে গণবিধ্বংসী অস্ত্র থাকার অভিযোগ তুলেছিল তৎকালীন বুশ প্রশাসন। তারা দাবি করেছিল যে, ইরাকের কাছে পারমাণবিক বা রাসায়নিকের মতো ‘গণবিধ্বংসী অস্ত্র’ রয়েছে যা বিশ্বশান্তির জন্য হুমকি। তবে যুদ্ধ-পরবর্তী অনুসন্ধানে এ ধরনের কোনো অস্ত্রের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি।
সন্ত্রাসবাদ বিরোধী যুদ্ধর উল্লেখ করেছিল বুশের আমেরিকা।  ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের হামলার পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আল-কায়েদার সাথে সাদ্দাম হোসেনের সম্পর্কের কথা উল্লেখ করেছিল আমেরিকা, যদিও এর সপক্ষে শক্ত প্রমাণ ছিল না। বিগত কুড়ি বছরে এই বিষয়টি প্রমাণও করা যায়নি।

আঞ্চলিক আধিপত্য ও সরকার পরিবর্তনও একটি বিবেচ্য বিষয়। মধ্যপ্রাচ্যে সাদ্দাম হোসেনের মতো একজন পশ্চিম-বিরোধী শক্তিশালী নেতাকে সরিয়ে সেখানে একটি মার্কিন-বান্ধব গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে পুরো অঞ্চলে আধিপত্য বিস্তার করার লক্ষ্য ছিল। ইরাকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসনের সারসংক্ষেপ ও নির্যাস কিন্তু মাটির তলায় থাকা তেল। যদিও মার্কিন সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে গণবিধ্বংসী অস্ত্র উদ্ধারের কথা বলে আক্রমণ করেছিল, কিন্তু যুদ্ধের পর তেল সম্পদ এবং ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের উদ্দেশ্যই অধিকাংশ বিশ্লেষকের কাছে মূল কারণ হিসেবে প্রাধান্য পেয়েছে একথা বলাই বহুল্য। এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করা দরকার,বিশ্বে এ মুহূর্তেও সর্বোচ্চ খনিজ তেলের মজুত রয়েছে যে কয়েকটি দেশে, তার মধ্যে পঞ্চম স্থানে রয়েছে ইরাক। ১৪৫ বিলিয়ন ব্যারেল তেল বা বিশ্বের ভূগর্ভস্থ তেলের প্রায় ৯ শতাংশ রয়েছে ইরাকে।

এবার আসা যাক ভেনেজুয়েলার কথায়।ভেনেজুয়েলার খনিজ তেল ও খনিজ সম্পদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘকালীন আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু হলেও, বর্তমান ২০২৬ সালের প্রেক্ষাপটে এই সম্পর্কের অবনতি এবং সাম্প্রতিক সামরিক পদক্ষেপের পেছনে একাধিক রাজনৈতিক ও কৌশলগত কারণ রয়েছে। তবুও সর্বাগ্রে খনিজ তেলের কথা বলতে হবে। ২০২৬ সালের শুরুতে এসে আমেরিকার আগ্রাসনের  প্রধান কারণ তেল ও খনিজ সম্পদের নিয়ন্ত্রণ।ভেনেজুয়েলায় বিশ্বের বৃহত্তম খনিজ তেলের ভান্ডার মজুদ রয়েছে। ওয়ার্ল্ডো মিটার তথ্য অনুযায়ী, ৩০৩ বিলিয়ান ব্যারেল তেল সঞ্চিত রয়েছে ভেনেজুয়েলা যা বিশ্বের ১৮.২ শতাংশ।  ২০২৬ সালের ৩ জানুয়ারি নিকোলাস মাদুরোকে আটকের পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা করেছেন যে, যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলার তেলের খনিগুলো সংস্কার করতে এবং সেখান থেকে তেল আহরণ করতে বড় মার্কিন কোম্পানিগুলোকে সেদেশে পাঠাবে। উল্লেখ্য, ভেনেজুয়েলা সরকারের বেশ কিছুদিন ধরেই অভিযোগ সম্বলিত  দাবি, মার্কিন হামলার মূল লক্ষ্যই হলো তাদের সম্পদ দখল করা।
মাদুরোর আটক কেন, আইনি অভিযোগ কী ছিল?  ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে মার্কিন বাহিনী একটি বড় ধরনের সামরিক অভিযানের মাধ্যমে নিকোলাস মাদুরো ও তার স্ত্রীকে আটক করে নিউ ইয়র্কে নিয়ে যায়। তাদের বিরুদ্ধে ‘নার্কো-টেরোরিজম’ বা মাদক-সন্ত্রাসবাদ এবং যুক্তরাষ্ট্রে কোকেন আমদানির ষড়যন্ত্রের অভিযোগ আনা হয়েছে।
মাদক পাচার রোধ তত্ত্ব সামনে তুলে ধরা হয়েছে । মার্কিন প্রশাসন দাবি করেছে যে, ভেনেজুয়েলা থেকে আসা মাদকের কারণে প্রতি বছর অসংখ্য আমেরিকানের মৃত্যু হচ্ছে আর তার নাকি মদতদাতা ভেনেজুয়েলা। এই মাদক প্রবাহ বন্ধ করার অজুহাতে গত কয়েক মাস ধরে যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলার উপকূলে নৌ-অবরোধ এবং সন্দেহভাজন নৌযানে হামলা চালিয়ে আসছিল।  অবশেষে মার্কিন সেনারা ২০২৬ শুরু হতে না হতেই আক্রমণ করে বসে ভেনেজুয়েলায়। আরেকটি বিষয় উল্লেখ না করলেই নয়  তা হল ভূ-রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা। ভেনেজুয়েলা দীর্ঘদিন ধরে চীন, রাশিয়া এবং ইরানের মতো মার্কিন প্রতিদ্বন্দ্বীদের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখেছে এবং তাদের কাছে তেল রফতানি করেছে এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র  একে নিজেদের নিরাপত্তার জন্য হুমকি এবং তাদের প্রভাব বলয়ে হস্তক্ষেপ হিসেবে দেখে আসছে।

ভেনেজুয়েলায় সরকার পরিবর্তনের জন্য দীর্ঘদিন ধরেই কলকাঠি  নাড়ছিল  যুক্তরাষ্ট্র। দীর্ঘদিন ধরেই মাদুরো সরকারকে অবৈধ হিসেবে গণ্য করে আসছে তারা এবং একটি “যথাযথ ও বিচারিক” রূপান্তরের মাধ্যমে সেখানে নতুন শাসন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার কথা বলছে। সেকথা আমেরিকা ঘোষণা করে দিয়েছে ইতিমধ্যেই । এ মুহূর্তে মাদুরোর আসনে কাউকে বসতে না দিয়ে ভেনেজুয়েলার যাবতীয় নীতি নির্ধারণ করবে আমেরিকা। যদিও ভেনেজুয়েলায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসনের পেছনে  খনিজ তেল এবং খনিজ সম্পদ একটি বড় কারণ হিসেবে বিশ্লেষকরা দেখছেন , তবুও আমেরিকা মুখে তা বলছে না। ২০২৬ সালের সাম্প্রতিক হামলা ও হস্তক্ষেপের ক্ষেত্রে মাদক-সন্ত্রাসবাদ দমন এবং রাজনৈতিক শাসন পরিবর্তনের লক্ষ্যকেও যুক্তরাষ্ট্র সমান গুরুত্ব দিচ্ছে- এমনটাই বলেছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প।

তবে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে যাদের সামান্যতম চৰ্চা রয়েছে, এমনকি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আগাম হামলা বা আগ্রাসন অথবা সামরিক নীতি যারা জানে- তারা কমবেশি বোঝে এই আগ্রাসনের কারণ, গুরুত্ব এবং প্রভাব। খনিজ তেলই যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইরাকে বা ভেনেজুয়েলা আগ্রাসনের পেছনে কারণ তা আলোচনায় স্পষ্ট। ভেনেজুয়েলা ও ইরাক বাদ দিলে প্রথম পাঁচটি খনিজ তেল সমৃদ্ধ দেশের মধ্যে বাকি আছে ইরান, সৌদি আরব ও কানাডা। ২০২৬ এর শুরুতে ইরানে ইতিমধ্যেই হুমকি বার্তা দিয়েছেন ট্রাম্প। সুতরাং ২০২৬ এ শুরুতে এসে স্পষ্ট যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র  খনিজ সম্পদ ও তেলের জন্য তাদের সাম্রাজ্যবাদের নীতি অপ্রতিহত গতিতে এগিয়ে নিয়ে চলেছে। কার্যত এখানেই এক সুতোয় গাঁথা হয়েছে সাদ্দাম ও মাদুরোর ভাগ্য। আগামী দিনে জ্বালানি রূপান্তর বিশ্বের চালিকা শক্তি হয়ে ওঠার ক্ষেত্রে কতটা প্রভাব ফেলবে তা এক কথায় বলা সম্ভব নয়। সময় হয়তো অনেক কথাই বলবে, তবে তাৎপর্যপূর্ণভাবে,  খনিজ তেল এই মুহূর্তে বিশ্বের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। পাশাপাশি একথা অনস্বীকার্য, লিথিয়াম ও কোবাল্টের মত খনিজ সম্পদ আগামী দিনের অন্যতম চালিকা শক্তি হয়ে উঠতে চলেছে। আর ভেনেজুয়েলার বলিভার প্রদেশে লিথিয়ামের বিপুল ভান্ডার রয়েছে বলেই মনে করা হয়। পাশাপাশি, উল্লেখযোগ্য ভাবে কোবাল্ট বা কোবাল্ট নাইট্রেটের সম্ভাবনা রয়েছে ভেনেজুয়েলায়।

তথাপি প্রশ্ন খনিজ ভান্ডারে পরিপূর্ণ কোনো দেশকে ইচ্ছামত আক্রমণ করা কি যায়? কোনও দেশ খেয়ালখুশিমতো আরেকটি দেশকে আক্রমণ করতে পারে কি? রাষ্ট্রসঙ্ঘের সনদ কী রয়েছে? জাতিসংঘের সনদ অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী, কোনও দেশ অন্য কোনও দেশকে খেয়াল খুশিমতো আক্রমণ করতে পারে না।সনদের ২(৪)(article 2/4 )অনুচ্ছেদে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, কোনো রাষ্ট্র অন্য কোনো রাষ্ট্রের আঞ্চলিক অখণ্ডতা বা রাজনৈতিক স্বাধীনতার বিরুদ্ধে শক্তিপ্রয়োগ করতে পারবে না। অর্থাৎ, এক দেশ কর্তৃক অন্য দেশকে কোনোভাবেই আক্রমণ করা যাবে না যদি না সেটি আত্মরক্ষা  বা জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের অনুমোদন ক্রমে হয়। তবে অতীতে যুক্তরাষ্ট্র অনেক সময় “প্রি-এমপ্টিভ স্ট্রাইক” বা আগাম হামলার নীতি গ্রহণ করেছে। United Nations Charter অনুযায়ী এই নিয়মগুলো পরিচালিত হয়। তাতে অ্যামেরিকা বিশেষ পরোয়া করে না।  তবে একমাত্র পারমাণবিক শক্তিধর দেশগুলির উপরে হামলা চালালে পাল্টা পারমাণবিক যুদ্ধের আশঙ্কা থেকে যায়।

 সর্বোপরি, আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে বিপুল ভূসম্পদ নিয়ে কম সামরিক শক্তিধর দেশরাও রয়েছে যারা আক্রান্ত হয়ে চলেছে । সাদ্দাম হোসেনের কাছে গণবিধ্বংসী অস্ত্র আছে বলে আমেরিকা ও তার মিত্ররা (যেমন যুক্তরাজ্য) কোনো সুনির্দিষ্ট আন্তর্জাতিক ম্যান্ডেট বা জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের সরাসরি অনুমতি ছাড়াই ইরাকে আক্রমণ শুরু করেছিল। পরবর্তীতে,  ইরাকে কোনো গণবিধ্বংসী অস্ত্র বা আল-কায়েদার সঙ্গে যোগসূত্র খুঁজে পাওয়া যায়নি। একই কথা প্রযোজ্য ভেনেজুয়েলার ক্ষেত্রেও। মাদকের সঙ্গে ভেনেজুয়েলার সংযোগ তত্ত্ব আদৌ প্রমাণিত হবে কিনা কেউ জানে না। ফলে, কখনও মানবতা আর কখনও বা মাদকের দোহাই দিয়ে, ক্ষেত্রবিশেষে খনিজ তেল ও খনিজ সম্পদ, আবার কখনও ভু-রাজনৈতিক আধিপত্য দখল বা বিস্তার করতে আগ্রাসন চলবেই। মিশে যেতে থাকবে সাদ্দাম আর মাদুরোর ভাগ্য।।

 

 

About Post Author