পুরন্দর চক্রবর্তী, সময় কলকাতা, ২৩ জুন : এবারের বিশ্বকাপে পর্তুগালকে আটকে দিয়ে নজর কেড়েছে কঙ্গো। কঙ্গো বলাটা অবশ্য বিভ্রান্তিকর কারণ প্রায় একই নামে দুটি দেশ রয়েছে, যে দেশটি এবারের বিশ্বকাপে খেলছে তারা কঙ্গো গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র (Congo DR ) নামেই বিশ্বকাপে সামিল । ডিআর কঙ্গো বা ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অফ দা কঙ্গো প্রথম বিশ্বকাপ খেলছে এমনটা নয়, ১৯৭৪ সালে জাইরে নামে তারা বিশ্বকাপে খেলতে এসেছিল । সেবার তারা তিন ম্যাচে ১৪ গোল খায় কোন গোল করতে পারেনি। যুগোশ্লাভিয়ার কাছেই ৯ গোল হজম করতে হয়েছিল তাদের। এই ম্যাচের পরে সেবার ব্রাজিলের বিরুদ্ধে ম্যাচে তারা একটি হাস্যকর ঘটনা ঘটিয়েছিল, যেখানে ব্রাজিল ফ্রিকিক নিতে যাবার সময় জাইরের ডিফেন্ডার ইলুংগা বলটি দূরে পাঠিয়ে হলুদ কার্ড দেখেন। যাইহোক, ১১ কোটির বেশি জনসংখ্যার এই দেশের ইতিহাস সুপ্রাচীন। আফ্রিকার দ্বিতীয় বৃহত্তম দেশটির বিরুদ্ধে অতীতে রক্তাক্ত এক কলঙ্কের উল্লেখ রয়েছে। বলা হয়, সুদূর অতীতে কঙ্গোর বিভিন্ন অংশে নরমাংস ভক্ষন করার প্রথা চালু ছিল। এই অভিযোগের পাল্টা কিছু তথ্য পাওয়া যায়। সত্যি কি নরমাংস ভক্ষণের প্রথা চালু ছিল কঙ্গোতে?
এ নিয়ে কোন সন্দেহের অবকাশ নেই, বিভিন্ন গ্রন্থ বা প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে, অতীতে কঙ্গোর ইতিহাসে এবং সাম্প্রতিক গৃহযুদ্ধের সময়ে কিছু নির্দিষ্ট গোষ্ঠী এবং বিদ্রোহীদের মধ্যে মানুষ খাওয়ার বা নরমাংস ভক্ষণের (Cannibalism) প্রমাণ পাওয়া গিয়েছে।তবে এটি কঙ্গোর সাধারণ মানুষের কোনো নিয়মিত খাদ্য অভ্যাস বা সংস্কৃতি ছিল না। মূলত যুদ্ধকালীন পরিস্থিতি, শত্রুপক্ষকে ভয় দেখানো এবং কিছু কুসংস্কার বা জাদুটোনার বিশ্বাসের কারণে এই ধরনের চরম ও নৃশংস ঘটনাগুলো ঘটেছে বলেই বিভিন্ন গ্রন্থে উল্লেখ রয়েছে।
কঙ্গোয় নরমাংস ভক্ষণের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট (১৯ শতক ও উপনিবেশ আমল) বিচার করলে দেখা যায়, ঊনবিংশ শতকের শেষের দিকে এবং বেলজিয়ামের উপনিবেশ শুরুর আগে কঙ্গো অববাহিকার কিছু নির্দিষ্ট উপজাতি বা গোষ্ঠীর মধ্যে নরমাংস ভক্ষণের প্রচলন ছিল। সাধারণত যুদ্ধে বন্দী হওয়া শত্রু বা ক্রীতদাসদের ক্ষেত্রে এই নিয়ম প্রযোজ্য হতো। বলা হয়,সে সময়ে কোনো কোনো গোষ্ঠীতে মানুষের মাংসকে একটি মূল্যবান বা বিলাসবহুল বস্তু মনে করা হতো, যা কেবল বিশেষ উৎসব বা ক্ষমতা প্রদর্শনের জন্য ব্যবহৃত হত। তবে অনেক গোষ্ঠী এই প্রথাকে সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যানও করেছিল। তবে এও অভিযোগ রয়েছে যে,বেলজিয়াম বা ইউরোপীয় উপনিবেশ স্থাপনকারীরা আফ্রিকানদের “অসভ্য” বা “বন্য” হিসেবে তুলে ধরতে অনেক সময় এই নরমাংস ভক্ষণের গল্পগুলোকে বাড়িয়ে বলত, যাতে তারা সেখানে নিজেদের শাসন ও নির্যাতনকে বৈধতা দিতে পারে।

আধুনিক যুগে গৃহযুদ্ধ এবং জাতিসংঘের (UN) রিপোর্ট
আধুনিক ইতিহাসে, বিশেষ করে ১৯৯৯ সালের পর থেকে শুরু হওয়া কঙ্গোর অভ্যন্তরীণ কাসাই (Kasai) এবং ইতুরি (Ituri) অঞ্চলের রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধে নরমাংস ভক্ষণের বেশ কিছু ভয়াবহ ঘটনা পুনরায় সামনে আসে। জাতিসংঘের মানবাধিকার সংস্থা (UN Human Rights Council) এবং আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের রিপোর্টে এর সত্যতা প্রমাণিত হয়েছে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (Human Rights Watch)-এর তদন্ত অনুযায়ী, কঙ্গোর বিদ্রোহী দলগুলো (যেমন- মাই-মাই বা বিভিন্ন সশস্ত্র মিলিশিয়া গ্রুপ) সাধারণ মানুষ এবং প্রতিপক্ষকে চরম আতঙ্কিত করতে এই প্রথাকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে। এ প্রসঙ্গে উল্লেখযোগ্য, কঙ্গোর বনাঞ্চলে বসবাসকারী প্রাচীন পিগমি (বা মবুতী) উপজাতির মানুষদের বন্দি করে তাদের মাংস খেতে বাধ্য করার বা তাদের ওপর নরভক্ষী নৃশংসতা চালানোর একাধিক অভিযোগ বিভিন্ন বিদ্রোহী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে উঠেছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে, প্রতিবেদনে প্রকাশ পেয়েছে, কঙ্গোর কিছু উগ্রপন্থী যোদ্ধাদের বিশ্বাস যে, শত্রুর শরীরের নির্দিষ্ট অংশ (যেমন হূৎপিণ্ড) ভক্ষণ করলে বা রক্ত পান করলে অলৌকিক ক্ষমতা পাওয়া যায় এবং যুদ্ধে অপরাজেয় হওয়া যায়। তবুও সংক্ষেপে বলতে গেলে, কঙ্গোর সমস্ত বা সাধারণ মানুষ কখনোই নরখাদক ছিলেন না। অতীতে কিছু উপজাতীয় আচার এবং বর্তমানে যুদ্ধবিধ্বস্ত এলাকায় কিছু উগ্র বিদ্রোহী ও মিলিশিয়া গোষ্ঠীর চরম নৃশংসতার অংশ হিসেবে এই মানবতাবিরোধী অপরাধটি ঘটেছে। তবে বর্তমানে সভ্যতার আলো কঙ্গোতে পুরো মাত্রায় রয়েছে । রক্তাক্ত নরমাংস ভক্ষণের কাহিনী এখন কেবলমাত্র ইতিহাস।।


More Stories
উত্তর সিকিমের শিক্ষার্থীদের পাশে ভারতীয় সেনা
ছাত্র শাসন মামলায় শিক্ষকের জামিন, আদালতের যুগান্তকারী বার্তা
জন্মদিনে বাড়ি নিয়ে যেতে নারাজ বাবা-মা, সহপাঠীর হাত ধরে হোস্টেল থেকে চম্পট নাবালক পড়ুয়ার!