Home » অমর শিল্পী যোগেন চৌধুরী অনন্তলোক-যাত্রী : একটি ক্যানভাস পড়ে রইল

অমর শিল্পী যোগেন চৌধুরী অনন্তলোক-যাত্রী : একটি ক্যানভাস পড়ে রইল

Oplus_131072

চুমকী সূত্রধর ও পুরন্দর চক্রবর্তী :

“হৃদয় কথাটি কত পুরনো,

তবু কি পুরনো হয় সে?

ভালবাসা কথাটি কত পুরনো

তবু কি ভাল না বেসে থাকা যায়?”

— যোগেন চৌধুরী

কার্যত জমিদার পরিবারের ছেলে। বাবা প্রমথ নাথ চৌধুরী ফরিদপুরের এক বিস্তীর্ণ অংশের ভূ সম্পত্তির অধিকারী । তবুও দেশভাগ তাঁকে স্বদেশহারা করেছিল। দেশবিভাগের ক্ষত, মানুষের ভাঙাচোরা মুখ, দেহ-মন সবই হয়ে উঠেছিল তাঁর তুলির ভাষা। আধুনিক ভারতীয় চিত্রকলার অন্যতম স্তম্ভ সেই যোগেন চৌধুরী আর নেই। বাইপাস সংলগ্ন একটি বেসরকারি হাসপাতালে রবিবার সকালে প্রয়াত হলেন তিনি। গত ১৪ মাস ধরে ক্যানসারের সঙ্গে লড়াই করছিলেন ৮৭ বছর বয়সি এই শিল্পী। সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল মূত্রনালীর সংক্রমণ। যার জেরে ষষ্ঠীর দিন হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল তাঁকে। অবস্থায় বিশেষ উন্নতি হয়নি, বরং আরও খারাপের দিকে যেতে থাকে। শেষমেশ মৃত্যু হল শিল্পীর। লড়াই শেষ হল ৮৭-তে। ১৯৩৯ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি অবিভক্ত বাংলার ফরিদপুরের ডহরপাড়া গ্রামে জন্ম যোগেন চৌধুরীর। শিল্পী হয়ে ওঠার প্রথম পাঠ শুরু হয়েছিল সেই গ্রামেই। দেশভাগের সময় পরিবারের সঙ্গে কলকাতায় চলে আসেন যোগেন। ১৯৫০ সাল থেকে থিতু হন এদেশে। ১৯৫৫ সালে কলকাতার গভর্নমেন্ট কলেজ অব আর্ট অ্যান্ড ক্র্যাফটে ভর্তি হন। ১৯৬০ সালে সেখান থেকে পাশ করে হাওড়া জেলা স্কুলে এই বিভাগেই শিক্ষকতায় যোগ দেন। শিক্ষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। পরে কলকাতার হ্যান্ডলুম বোর্ডে ডিজাইনার হিসেবে কাজ করেন। মাদ্রাজেও টেক্সটাইল ডিজাইনারের দায়িত্ব সামলেছেন। ১৯৬৫ সালে ফরাসি সরকারের বৃত্তি নিয়ে প্যারিসে শিল্পশিক্ষার জন্য যান যোগেন চৌধুরী। পরবর্তীতে তাঁর শিল্পকর্ম দেশের গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক পরিচিতি পায়। শিল্পী হিসেবে স্বতন্ত্র পরিচিতি গড়ে তোলার পাশাপাশি রাষ্ট্রপতি ভবনের আর্ট গ্যালারিতে কিউরেটরের দায়িত্বও পালন করেছেন। এই যোগেন চৌধুরী ছিলেন রাজ্যের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বেশ কাছের। চিত্রশিল্পী হিসেবে তাঁর নামডাক থাকায় মমতা রাজ্যসভায় পাঠিয়েছিলেন। দাদা ছিলেন বামপন্থী । রাজনৈতিক জীবন দীর্ঘ না হলেও অতলান্ত ছিল শিল্পী সত্তা। দেশ-বিদেশে খ্যাতি অর্জন করলেও শিল্পী নিজের ভিটে বাড়ি ভোলেননি। ঘাঘর নদী, ফুলপুকুর, বাঁশঝাড়, মাছ ধরার স্মৃতি আর বাড়ির উঠোন — যোগেন চৌধুরীর ছবির পরতে পরতে ছড়িয়ে রয়েছে গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ার ডহরপাড়া। দেশভাগ তাঁকে শৈশবের সেই গ্রাম থেকে বিচ্ছিন্ন করেছিল, কিন্তু স্মৃতি মুছে দিতে পারেনি। প্রকৃতি আর ফেলে আসা জীবনের নানা অনুষঙ্গ ফিরে ফিরে এসেছে তাঁর ক্যানভাসে। তবে সেই ডহরপাড়ার পথঘাটে ধুলোয় মেশা শৈশব, নদীতে খেলে বেরানো কল্পনা, জবা গাছের গল্প আর হৃদয়ের গান শেষ হয়ে গেল এক লহমায়। ভোলা যাবে না যোগেন চৌধুরীর, শিল্পীর মৃত্যু হয়না – শিল্পে অমর থেকে যাবেন যোগেন চৌধুরী।।

About Post Author