Home » তারাশঙ্করের কাছে আঘাত পেয়ে যে সম্পাদক হয়েছিলেন লেখক

তারাশঙ্করের কাছে আঘাত পেয়ে যে সম্পাদক হয়েছিলেন লেখক

পুরন্দর চক্রবর্তী, সময় কলকাতা :

সাগরময় ঘোষের খ্যাতি ছিল প্রধানত ‘দেশ’ পত্রিকার সম্পাদক হিসেবেই। অথচ তাঁর অন্য অনেক গুন ছিল যা প্রায় জানাই যায় না।তিনি ছিলেন সুগায়ক। তিনি শান্তিদেব ঘোষের ভাই, রক্তে রয়েছে গান। এছাড়াও ছিল বহুমুখী প্রতিভা রবীন্দ্রনাথ যখন বেঁচে তখন শান্তিনিকেতনে গুরুদেবের সান্নিধ্যে থাকা ছাত্ররা কি আর নির্গুণ হতে পারে? সাগরময় ঘোষ দেশ পত্রিকার সম্পাদক হিসেবে দীর্ঘসময় ধরে সেরা লেখকদের সেরা লেখা আদায় করে এবং প্রতিভাবান নতুন লেখকদের স্বীকৃতি দিয়ে ‘দেশ’ পত্রিকাকে অন্য উচ্চতা দিয়েছিলেন। পাশাপাশি তিনি লেখক হিসেবেও কোনও অংশে কম ক্ষমতাশালী ছিলেন না। তাঁর লেখায় ছিল স্বতঃস্ফূর্ত বর্ণনা আর শব্দচয়ন। তাঁর রচনার মধ্যে দর্শন, গভীরতা, রসবোধ এবং তাঁর জীবনবোধ লেখক সাগরময় ঘোষকে শাশ্বত করে রাখতে বাধ্য। অথচ সম্পাদক হওয়ার পরে লেখক সাগরময় তাঁর লেখার কলম তুলেই রেখেছিলেন। একটি ঘটনা ও তার পরম্পরা সাগরময় ঘোষকে আবার নতুন করে তাঁকে লেখকের কলম ধরতে প্রভাবিত করে।অতঃপর লেখকের ভূমিকায় ধারাবাহিক আত্মপ্রকাশ করেন তিনি।সাগরময় ঘোষ সম্পাদকের বৈঠকে, হীরের নাকছাবি, একটি পেরেকের কাহিনী এবং দন্ডকারণ্যের বাঘ সহ গুটিকয়েক বই লিখেছিলেন যা পাঠককুলে এনে দিয়েছিল অপার মুগ্ধতা । কি ছিল এমন ঘটনা যা তাঁর হাতে তুলে দিয়েছিল লেখকের কলম?

লেখক সাগরময় ঘোষ নিজের লেখাতেই জানিয়েছেন কলেজজীবনে তাঁর প্রবাসী ও বিচিত্রা পত্রিকায় তাঁর একাধিক লেখা প্রকাশিত হয়েছিল। যে সময় প্রকাশিত হয়েছিল তখন একই পত্রিকার লেখক ছিলেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্র প্রমুখ । ১৯৩৯ সালে আনন্দবাজার পত্রিকায় যোগদান করেন, দেশের সহকারী সম্পাদক হন আর দেশ পত্রিকার দায়িত্ব নেন ১৯৪০ সালে। সম্পাদক হয়ে তিনি মনস্থির করে ফেলেন যে তিনি নিজে লিখবেন না, স্বনামে তো নয়ই।

১৯৫৪ সালের ঘটনা।সেসময় ডিভিসি পরিকল্পনার কাজ চলছে। বিধানচন্দ্র রায়ের মন্ত্রীসভার অন্যতম সেচমন্ত্রী অজয় মুখোপাধ্যায় ঠিক করেন বিধায়কদের সঙ্গে ডিভিসি প্রকল্পের অগ্রগতি দেখতে যাবেন বিধায়ক ও লেখকরা। লেখকদের তালিকা প্রস্তুতির ভার বর্তায় বিখ্যাত লেখক তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের ওপরে। তিনি তাঁর তালিকায় প্রথমসারির সব লেখককে রাখলেও রাখেন নি সাগরময় ঘোষকে। বিষয়টি অভিমানাহত করেছিল সাগরময় ঘোষকে যা তাঁর লেখায় এই ঘটনার বারংবার সবিনীত উল্লেখে প্রমাণ মেলে । লেখকদের অনেকেই ছিলেন সাগরময় ঘোষের কাছের। তাঁরা সাগরময় ঘোষকে লেখকগোষ্ঠীতে না রাখার বিষয়টিকে ভালোভাবে না নিলেও প্রতিবাদ করতে পারেন নি। কিন্তু আনন্দবাজার গোষ্ঠীর কর্ণধার কানাইলাল সরকার বিষয়টি এত সোজা ভাবে নেন নি। তিনি তারাশঙ্কর বন্দোপাধ্যায়ের মতামত শোনেন এবং জানতে পারেন তারাশঙ্কর জানিয়েছেন যে তিনি সাগরময় ঘোষকে লেখক বলে মনেই করেন না। তারাশঙ্কর মনে করতেন যে সাগরময় ঘোষ এককলম কখনও লেখেন নি তাই তিনি লেখকের দলে পড়েন না। কানাইলাল সরকার জানতেন যে সাগরময় ঘোষ ছিলেন লেখক গড়ার কারিগর। সাগরময় ঘোষ জহুরির চোখ দিয়ে লেখকদের মঞ্চ সাজিয়ে দিয়েছেন। সাগরময় ঘোষের লেখক হিসেবে দক্ষতার কথাও তাঁর জানা ছিল।তাই সরাসরি অজয় মুখোপাধ্যায়ের কাছে সাগরময় ঘোষের লেখকগোষ্ঠীতে থাকার গুরুত্ব ও তাৎপর্য বুঝিয়ে সাগরময়ের নাম সরকারি ভাবে আমন্ত্রিত লেখকগোষ্ঠীর তালিকাভুক্ত করান।  সাগরময় ঘোষ সংশয়ে ছিলেন,অতঃপর লেখকদের সেই সফরের দলনেতা তারাশঙ্কর তাঁকে কি ভাবে গ্রহণ করবেন । যেকোনো কারণেই হোক সেবারের সফর থেকে সরেই দাঁড়ান তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়। কিন্তু অস্বস্তির কাঁটা থেকেই যায় সাগরময়ের মনে।

সাগরময় ঘোষ হয়তো অনুভব করেছিলেন যে ছাত্রজীবনে প্রবাসী ও বিচিত্রায় তাঁর লেখা তাঁকে লেখক হিসেবে স্থান করে দেবে না। হয়তো তিনি ভেবেছিলেন তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের উক্তি যেভাবে তাঁকে আহত করেছে তা আবার ক্ষতবিক্ষত করতে পারে।তিনি তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের বক্তব্যে যে ব্যথিত হয়েছিলেন তার প্রমাণ একাধিকবার রয়েছে তার একাধিক গ্রন্থে।এমন সময় আচমকা তিনি পান এক  প্রস্তাব।

সেসময় ‘জলসা’ পত্রিকা প্রকাশ করবেন ঠিক করে উল্টোরথের প্রাক্তন সম্পাদক ক্ষিতীশ সরকার একটি অসামান্য প্রস্তাব নিয়ে তাঁর কাছে আসেন যা সব ঘটনার অভিমুখ পাল্টে দেয়।সাগরময় ঘোষের ঝুলিতে লেখকদের সঙ্গে সম্পাদক সাগরময়ের ঘনিষ্ঠতার সুবাদে জানা ও জমে থাকা অনেক বিচিত্র অভিজ্ঞতার কথা ছিল। সেকথা জানতেন ক্ষিতীশ সরকার । তিনি সাগরময় ঘোষকে অনুরোধ করেন সেই অভিজ্ঞতার কথা লিখে ফেলতে।ক্ষিতীশ সরকার জলসা পত্রিকায় প্রকাশ করতে চেয়েছিলেন সাগরময়ের অভিজ্ঞতার কথা। সাগরময় ঘোষ এরকম অনুরোধ ফিরিয়ে দিতে পারেন নি। জেদ ছিল লেখক হিসেবেও নিজেকে প্রমাণ করার।সাবলীল ভাষায় ধারাবাহিক আকারে প্রকাশ পেতে থাকে তাঁর এই লেখা। কানাইলাল সরকার পরে তাঁর প্রকাশনী ‘ত্রিবেণী’ থেকে বই হিসেবে সম্পাদকের বৈঠকে ছেপে বের করেন। এখানেই না থেমে সাগরময় লেখেন ঝরাপাতার ঝাঁপি, সে বই অধুনাবিলুপ্ত। ঝরাপাতার ঝাঁপির কিছু লেখা ও অন্য আরও লেখা নিয়ে পরবর্তীতে বেরোয়’ হীরের নাকছাবি’ যেখানে ‘সম্পাদকের বৈঠকে’ লেখার কারণ তুলে ধরেন সাগরময় ঘোষ।

সাগরময় ঘোষ আরও লিখেছেন। ১৯৯৯ সালে মৃত্যুর বছর দুই আগে,পঞ্চাশ বছরের বেশি সময় দেশ পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত থাকার পরে,অবসর নেন সাগরময় ঘোষ । তাঁর জন্মদিন ১৯১২ সালের ২২ জুন।।

About Post Author