Home » মাকালী, মদ ও মহুয়া

মাকালী, মদ ও মহুয়া

সময় কলকাতা ডেস্ক :

“মহুয়া তুমি কি মহুয়া খেয়ে আছো? “

সময়টা জানুয়ারি মাসের ৩ তারিখ,২০১৭।তৎকালীন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী বাবুল সুপ্রিয়ের ওপরে চটে লাল হয়ে মামলাই করে দিলেন করিমপুরের বিধায়ক। টিভি চ্যানেলের লাইভ শো-চলাকালীন নেতাদের গ্রেফতারি নিয়ে তর্ক-বিতর্ক চলছিল।সে সময়ের বিজেপি সাংসদ বাবুল সুপ্রিয়ের পাশাপাশি উপস্থিত ছিলেন করিমপুরের তৃণমূল বিধায়ক মহুয়া মৈত্র।আচমকা বাবুল সুপ্রিয় করিমপুরের বিধায়ককে বলে বসেন, ‘‘মহুয়া তুমি কি মহুয়া খেয়ে আছো?’’ তৃণমূল বিধায়ক বলেন,‘সংবাদমাধ্যমের সামনে আলোচনায় এ কথা বলে আমায় রীতিমতো অপমান করেছেন। এক জন মহিলা হিসেবে আমার আইনি অধিকার আমি বুঝে নেব।’’কলকাতা হাইকোর্টে মহুয়া মৈত্রর মামলা অবশ্য ধোপে টেকে নি।পাল্টা মানহানির মামলা করলেন বাবুল।মামলা পাল্টা মামলা  বিষয়টি যে বক্তব্যের ওপরে দাঁড়িয়ে ছিল তাকে আমজনতা  কতটা উপভোগ করল বলা মুশকিল, তবে করিমপুরের বিধায়কের পরিচিতি অবশ্যই বাড়ল।

থাপ্পড় ও ২ পয়সা

৩ আগস্ট ২০১৮। আসাম বিমানবন্দর।এক মহিলা পুলিশ আধিকারিকের গালে থাপ্পড় কষিয়ে দিয়েছিলেন মহুয়া।আটক করা হল তাঁকে। আর কর্তব্যরত সরকারি কর্মীর কাজে ব্যাঘাত ও আঘাত করায় একরাত আটকের পাশাপাশি মামলা রুজু হল।আর যে গণমাধ্যমের সামনে ‘ মজা’ করায় “মজা টের” পাওয়াতে তিনি বাবুলের বিরুদ্ধে মামলা করেছিলেন সেই গণমাধ্যমকে অতঃপর “২পয়সার” বলে  প্রতিক্রিয়া দিলেন। আবার মানহানির মামলা। এবার দূরত্ব বাড়াতে থাকল তৃণমূল।

বিতর্কিত-বাক মহুয়া

একযুগ তিনি তৃণমূলে আছেন।তারমধ্যেই মাঝেমাঝে তিনি এমনকিছু কথা বলেন বা করে বসেন যা বিতর্ক ছড়ায়। মাঝেমাঝে দলবিরোধী মন্তব্য প্রকাশ্যে করে বসেন যার ফলে মহুয়া চর্চার খোরাক হন। যেমন,এবার ভোটের সময় বললেন, ”খেলা হবে” স্লোগান তাঁর আদৌ পছন্দ ছিল না। আবার, ভোট পার হওয়ার পরে হাঁসখালি ধর্ষণ কাণ্ড নিয়ে ধর্ষিতার ব্যখ্যা করতে গিয়ে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিপক্ষেই অবস্থান নিয়ে বসলেন। সময়ে সময়ে তাঁর সার্বিক পট পরিবর্তন হয়েছে। জন্মস্থান থেকে বড় হওয়া, শিক্ষা থেকে চাকরি এবং রাজনীতির পট পাল্টেছে।

মহুয়া গাছের শেকড়

৪৭ বছর বয়সী মহুয়ার জন্ম আসামে। কলকাতায় বড় হওয়া ও স্কুলেশিক্ষা, উচ্চ শিক্ষা আমেরিকায় যেখানে রেজাল্টে অর্থনীতিতে তাঁর শাখায় শীর্ষস্থান তিনি পান , এবং জেপি মর্গ্যানে উচ্চপদ অলংকৃত করেন। তাঁর প্রাক্তন ডেনমার্কজাত স্বামী লার্স ব্ররসনের সঙ্গে স্ক্যানডিনেভিয়াতেও কিছুদিন ছিলেন। জেপি মর্গ্যানের কাজ ছেড়ে মহুয়া ভারতে চলে আসেন।

স্বতন্ত্র মহুয়া রাজনীতিতে

দেশে ফিরে এসে ঢুকে পড়েন রাজনীতির আবর্তে। ২০০৮ সালে যোগদান কংগ্রেসে।  তিনি ছিলেন রাহুল গান্ধীর পশ্চিমবঙ্গে  একদা সবচেয়ে বিশ্বস্ত সেনানী।বঙ্গে আম আদমি কা সিপাহীর উদ্যোগ তিনি নিয়েছিলেন। কিন্তু মহুয়া পট পরিবর্তনে খুব সাবলীল। ২০১০ সালে তৃণমূলে যোগদান। মুখ্যমন্ত্রীর নজরে পড়েন,উত্থান হয় দ্রুত।২০১৬ সালে করিমপুর বিধানসভা কেন্দ্রে জয়ী হয়ে বিধায়ক। তিন বছরের মধ্যে বিধায়ক থেকে সাংসদ হয়ে যান মহুয়া।কৃষ্ণনগরে বিজেপির কল্যাণ চৌবেকে ৬৫হাজারের ভোটে হারিয়ে দেন মহুয়া।

চড়াই উৎরাই

২০১৯ সালে লোকসভায় তাঁর প্রথম ভাষণ তাক লাগিয়ে দেয়। সুললিত ইংরেজি হিন্দির মিশেলে ফ্যাসিবাদের তত্ত্ব থেকে গরীব কৃষক ও নাগরিক সনদের ব্যখ্যা এবং রাহাত ইন্দোরির উর্দু শায়রীর ব্যবহার নির্ভর নিজের বক্তব্যকে উপস্থাপন করে সাংসদ বক্তা হিসেবে নজর কেড়ে নেন শুরুর দিনেই। কিন্তু থামার নয় মহুয়া। করিমপুরে বিধায়ক থাকার সময় তোলাবাজি নিয়ে তিনি সোজাসাপ্টা আঘাত করেন দলকেই। সে সময় তৎকালীন রাজ্য বিজেপি সভাপতি রাহুল সিনহা বলেছিলেন,মাঝেমধ্যে তাঁর মধ্যে দলের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করার ইচ্ছে মাথাচাড়া দেয়। বিধায়ক ও সাংসদ মিলে ছ’বছরের আগেই “দু পয়সার সাংবাদিক” ইস্যুতে তৃণমূল তাঁকে, বলা ভালো তাঁর জিভের ব্যবহারকে ডরাতে শুরু করে । গোয়ার নির্বাচনে দায়িত্ব পাওয়া ছাড়া তাঁর উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দলে সাম্প্রতিক সময়ে হয় নি। দেবী কালী ইস্যুতে “বেফাঁস” বলে বেকায়দায় পড়েছেন তিনি। তৃণমূল হাত তুলে নিয়েছে। মহুয়া অটল।

বিতর্ক ও তৃণমূলের সঙ্গে দূরত্ব

দুদিনও হয় নি। ২০২২ সালের জুলাই মাসের প্রথম মঙ্গলবার এক অনুষ্ঠানে কানাডাবাসী দক্ষিণ ভারতের এক পরিচালক লীনা মনিমেকালাইয়ের ‘কালী’ তথ্যচিত্র নিয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে বড্ড বিতর্কিত হয়ে পড়েছেন মহুয়া। রাজ্য, দেশ ছাড়িয়ে বিদেশে আলোড়ন পড়েছে। শশী থারুরের মত কেউ কেউ পাশে দাঁড়ালেও ক্ষোভ বিক্ষোভে উত্তাল দেশ। মধ্যপ্রদেশে তাঁর বিরুদ্ধে এফআইআর করা হয়েছে। অন্য রাজ্যেও অবস্থা তথৈবচ। আর পশ্চিমবঙ্গেও তাঁর গ্রেপ্তারের দাবি তুলেছে বিজেপি। পঞ্চাশটির বেশি থানায় তাঁর বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ দায়ের হয়েছে।অভিযোগ করা হচ্ছে, সনাতন ভাবাবাগে আঘাত করেছেন মহুয়া। শিবরাজ চৌহানের মত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বরা সরব।উল্লেখ্য,  চলচ্চিত্র নির্মাতা লীনা মণিমেকলাই ছবিটির পোস্টার সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করার পর বিতর্ক শুরু হয়। পোস্টারে দেবী কালীর রূপ একজন মহিলাকে দেখানো হয়েছে। ছবিতে তাঁকে সিগারেট খেতে দেখা যাচ্ছে।  মহুয়া মৈত্র বিতর্ক আরও বাড়িয়ে দেন। মহুয়া বলেন, তাঁর কাছে মা কালী মাংসভোজী এবং মদ গ্রহণকারী দেবী।আর তারাপীঠে গেলে দেখা যাবে, সাধুরা ধূমপান করছেন।  তিনি বলেন, হিন্দুধর্মের মধ্যে তিনিও কালীর উপাসক। কালীকে কল্পনা করার অধিকার তাঁর রয়েছে, সেটাই তাঁর স্বাধীনতা বলেও
দাবি করেছিলেন মহুয়া। তারপরেই সোশ্যাল মিডিয়ায় আলোড়ন তৈরি হয়। বিজেপি রাস্তায় নেমে পড়েছে প্রতিবাদে। কানাডার অটোয়ায় অবস্থিত হাইকমিশন থেকে বিবৃতি জারি করা হয়েছে।

বিক্ষোভ: অনড় অটল মহুয়া

থামতে নারাজ মহুয়া। নিজের অবস্থান থেকে নড়তে নারাজ এবং উত্তরোত্তর সুর চড়াচ্ছেন তিনি। বুধবার তিনি একটি বৈদ্যুতিন মাধ্যমে নিজের অবস্থান খোলসা করে  নূপূর শর্মা প্রসঙ্গও। সে প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘‘নূপূর শর্মা নবি মহম্মদকে অপমান করেছেন। আমি দেবী কালীকে উদ্‌যাপন করেছি।’’ তাঁর কথায়,‘‘আমি নিজের ধর্মের উপর মন্তব্য করেছি। কাউকে আঘাত করার জন্য নয়।’’ টুইট করছেন মহুয়া।সাংসদের বক্তব্য , ‘‘আমি এমন ভারতে থাকতে চাই না যেখানে আমি ধর্ম নিয়ে কথা বলতে পারব না।’’তিনি বিজেপিকে আক্রমণ করছেন। অথচ তাঁর নিজের দল তৃণমূল তাঁর পাশে নেই। তৃণমূল দল থেকে জানানো হয়েছে, মতামত মহুয়ার ব্যক্তিগত, দলের নয়। তৃণমূলের প্রবীণ নেতা সৌগত রায় সাফ জানিয়েছেন,  ধর্মের ভাবাবেগে আঘাত করায় তাঁদের সায় নেই।

কালীর শরণে মহুয়া

তৃণমূল তাঁর পাশে নেই বুঝেই তৃণমূলের টুইটার হ্যান্ডেল আনফলো করেছেন মহুয়া। তিনি খালি মুখ্যমন্ত্রীর ফলোয়ার। বুধবারের সন্ধ্যে র পরে তাঁর হোয়াটস্যাপ ডিসপ্লে পিকচারে ভাসছে কালীঘাটের মাকালীর পটের ছবি। অ্যাকাউন্টে পটের কালীর ছবি বসিয়ে পট পাল্টানোর কথাই কি ভাবছেন তিনি?মহুয়া মৈত্রের খেদোক্তি ফুটে বেরোচ্ছে টুইটে। পট পরিবর্তন করতে চাওয়া মহুয়া কি চাইছেন?  খড়কুটো আঁকড়ে বাঁচতে? মহুয়ার ভাবগতি বলছে তিনি নিশ্চিতভাবে চাইছেন যে তাঁর মূল্যই এবার যেন দুপয়সা না হয়ে যায়!

About Post Author