Home » পাবলো নেরুদা : বিশ্বসেরা কবি, বিতর্কিত ব্যক্তিত্ব

পাবলো নেরুদা : বিশ্বসেরা কবি, বিতর্কিত ব্যক্তিত্ব

পুরন্দর চক্রবর্তী, সময় কলকাতা :

 

“আজ রাতে আমি সেই বিষণ্ণ শব্দগুলো লিখে উঠতে পারি।

লিখতে পারি, যেমন ধরা যাক : ‘এই রাত তারকাখচিত ঘন নীল আর ওরা দূরে বসে কাঁপে।’
রাতের বাতাস আকাশে ঘুরপাক খায় আর গান করে।
আজ রাতে আমি সেই বিষণ্ণ শব্দগুলো লিখে ফেলতে পারি,
আমি ভালোবাসতাম, আর সে-ও, সময় পেলে,
আমায় ভালোবাসতো।”
অনুবাদ – শক্তি চট্টোপাধ্যায়

উপরের মূল কবিতাটি পাবলো নেরুদার লেখা, যার সম্পর্কে কলম্বিয়ার খ্যাতনামা ঔপন্যাসিক গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস তাঁর সম্পর্কে বলেছেন   “বিংশ শতাব্দীর যে কোন ভাষার সেরা কবি”।

রিকার্দো এলিসের নেফতালি রেইয়েস বাসোয়ালতো নামে খুব কম মানুষই তাঁকে চিনবেন। তাঁর ছদ্মনাম পাবলো নেরুদা আর এই নামেই বিশ্বের অধিকাংশ কবিতাপ্রেমী মানুষ তাঁকে চেনেন ।অনেকের মতে পাবলো নেরুদা কার্যত ছিলেন চিলির জাতীয় কবি। সাহিত্যিক হিসেবে উপন্যাস, প্রবন্ধ রচনা করলেও কবি হিসেবেই তাঁর বিশ্বজোড়া খ্যাতি।তাঁর সৃষ্টিকর্ম বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয়ই শুধুমাত্র নয় প্রভাব বিস্তারকারীও বটে । সাহিত্যিক হিসেবে পরিচয়ের বাইরে তিনি ছিলেন কূটনীতিক ও আমলা।১৯০৪ সালের ১২ জুলাই তিনি লাতিন আমেরিকার চিলিতে জন্মেছিলেন।

১৯৭১ সালে সাহিত্যের সর্বোচ্চ সম্মান নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন তিনি।১৯৫০ সালে আন্তর্জাতিক শান্তি পুরস্কার ও ১৯৫৩ সালে লেনিন শান্তি পুরস্কার পেয়েছিলেন।অসংখ্য বিভিন্ন ধারার কবিতা লিখেছেন তিনি। প্রেমের কবিতা বা রাজনৈতিক কবিতার পাশাপাশি পরাবাস্তববাদী ( সুররিয়ালিসম, বাংলায় যে ধরণের কবিতার লেখক জীবনানন্দ দাস উল্লেখযোগ্য )কবিতার ক্ষেত্রে পাবলো নেরুদার দক্ষতা ছিল অসামান্য।

“প্রেয়সী আমার
তোমার চোখ ছাড়া আমার ঘুম আসবে না
তোমার চাহনিতে ছাড়া আমার অস্তিত্ব থাকবে না
বসন্তকে আমি এমনভাবে বদলাই
যাতে চোখ দিয়ে তুমি আমাকে অনুসরণ করতে পারো।”

[আমি চাই স্তব্ধতা – অনুবাদ সুভাষ মুখোপাধ্যায়]

তাঁর বাল্যকাল ও শৈশব কেটেছে খুব সুখকর ছিল না। শিক্ষিকা মা তাঁর জন্মের কিছুদিনের মধ্যে মারা যান, পিতা আবার বিবাহ করেন। আর্থিক প্রয়োজনে ১৯২৭ সালে তিনি রেঙ্গুনে কর্মসূত্রে যান।সিঙ্গাপুর, কলম্বো, বাটাভিয়া তেও তিনি কাজের সূত্রে ছিলেন। এই সময়কালের মধ্যে ১৯৩০ সালে তিনি বাটাভিয়াতে ডাচ ব্যাঙ্কের আধিকারিক মহিলা মারুকাকে বিয়ে করেন।

বামপন্থী রাজনৈতিক আদর্শে বিশ্বাসী ছিলেন পাবলো নেরুদা। কবি হিসেবে তিনি বিখ্যাত হলেও তাঁর জীবন ছিল নানা ঘাত- প্রতিঘাতে ভরা। ছিল বহুবিধ বিতর্ক।বিয়ের পরে তিনি চিলিতে ফিরে তাঁকে আর্জেন্টিনায় চিলির কুটনৈতিক পদ পান। কূটনৈতিক আধিকারিক হিসেবে তিনি স্পেনের বার্সেলোনা ও মাদ্রিদে ছিলেন। এ সময় তাঁর একমাত্র কন্যার জন্ম হয়।

১৯৩৮ সালে পেদ্রো আগিরে সের্দার চিলির রাষ্ট্রপতি হওয়ার পরে নেরুদা প্যারিসে স্পেনীয় অভিবাসীদের জন্য বিশেষ কনস্যুল হিসেবে নিযুক্ত হন। সেখানে তিনি শরণার্থী ক্যাম্পে ফরাসিদের দ্বারা আটক ২,০০০ স্পেনীয় শরণার্থীকে উইনিপেগ নামক পুরনো একটি জাহাজে করে চিলিতে স্থানান্তরের দায়িত্ব পালন করেন। নেরুদার বিরুদ্ধে প্রায়ই অভিযোগ ওঠে যে তিনি যারা প্রজাতন্ত্রের পক্ষে লড়াই করেছিলেন তাদের বাদ দিয়ে শুধু সহকর্মী সাম্যবাদীদের নিরাপদে দেশত্যাগের জন্য বেছে নিতেন।

১৯৪৫ সালে সেনেটর হিসেবে নিযুক্ত হলেও ১৯৪৮ সালে চিলিতে বামপন্থা নিষিদ্ধ হয় ও তাঁর নামে গ্রেপ্তারী পরোয়ানা জারি হয়।তিনবছর আর্জেন্টিনায় পালিয়েছিলেন তিনি। তার বহু আগে তিনি তাঁর স্ত্রীর থেকে বিচ্ছিন্ন হন ও ১৯৪৩ সালে আর্জেন্টিনার অভিজাত বংশীয় শিল্পী দেল কারিলকে বিয়ে করেন। এ বিয়ে চিলিতে স্বীকৃতি পায় নি, বৈধ বলে মানা হয় নি।তাঁর প্রথম স্ত্রী একমাত্র কন্যাকে নিয়ে মোনাকো হয়ে নেদারল্যান্ডসে চলে যান। আর্থিকঅনটনে থাকা তাঁর রুগ্ন ৯ বছরের কন্যা অকালপ্রয়াত হলেও মৃত্যুর আগে কন্যার সঙ্গে দেখা হয় নি নেরুদার।প্রথমা স্ত্রীও থেকেছেন উপেক্ষিতা। নেরুদার চেয়ে বয়সে কুড়ি বছরের বড় দ্বিতীয়া স্ত্রী  দেল কারিল তাঁর জীবনে বেশ প্রভাব ফেলেছিলেন। এই বিয়েও শেষপর্যন্ত টেকে নি। নেরুদা ১৯৬৬ সালে ৬২ বছরে তৃতীয় বিয়ে করেন।

কবি হিসেবে বিশ্বসেরাদের অন্যতম তকমা পেলেও ব্যক্তি নেরুদা বারবার সমালোচিত হয়েছেন। আর্জেন্টিনীয় কবি ও সাহিত্যিক  হোর্হে লুইস বোর্হেস একসময়  পাবলো নেরুদা সম্পর্কে বলেন , “আমি মনে করি তিনি খুব ভালো কবি, একজন খুবই ভালো কবি। আমি ব্যক্তি হিসেবে তার প্রশংসা করি না, আমি মনে করি তিনি খুবই খারাপ একজন মানুষ।”খ্যাতি ও যশ প্রত্যাশায় স্পষ্টকথা সত্যভাষণ চতুর ভাবে এড়িয়ে যেতেন পাবলো নেরুদা,এই অভিযোগ তোলেন বোর্হেস।

১৯৭০ সালে পাবলো নেরুদার নাম রাষ্ট্রপতি পদের জন্য মনোনীত করা হলেও পছন্দের প্রার্থীর জন্য নির্বাচন থেকে স্বেচ্ছায় সরে দাঁড়ান তিনি।১৯৭০থেকে ১৯৭২ থেকে ফ্রান্সে চিলির রাষ্ট্রদূত ছিলেন তিনি।১৯৭৩ সালে প্রষ্টেটের ক্যান্সার ধরা পড়ে কবির।১৯৭৩ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে তাঁর মৃত্যু হয়। তাঁর মৃত্যু নিয়েও গুঞ্জন ছড়ায়।তাঁর মৃত্যু স্বাভাবিক ছিল না বলেও কিছু মানুষ ধারণা করতে থাকেন। তাঁকে গুপ্তহত্যা ও বিষপ্রয়োগের অভিযোগ করার অভিযোগ ওঠে। চিলির জেনারেল পিনোচেটের হাত রয়েছে মৃত্যুতে এরকম অভিযোগও ওঠে। ২০১৩ সালে নেরুদার মৃত্যুর ৪০ বছর পরে চিলির আদালতের নির্দেশে তদন্ত শুরু হয়। পাঁচ বছর তদন্তের পরে আদালতের রায় ছিল যে,নেরুদার খুনের প্রমান মেলে নি।

প্রায় সমগ্র জীবনে ও মৃত্যুর পরেও বিতর্ক পাবলো নেরুদাকে তাড়া করে গেলেও পাবলো ছিলেন কবিদের প্ৰিয় কবি। বাংলা সাহিত্যের দুই শ্রেষ্ঠ কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায় ও সুভাষ মুখোপাধ্যায় ছাড়াও বহু বিখ্যাত বাঙালি কবি সাহিত্যিক পাবলো নেরুদার কবিতা বাংলায় অনুবাদ করেছেন। পাবলো নেরুদার কবিতায় যে আবেগ ও প্রাণ তাকে অস্বীকার করা পাঠকের পক্ষে অসম্ভব। তাঁর কবিতা হৃদয় ছুঁয়ে পাঠককে মন-কেমনের দেশে নিয়ে যাবেই।

“ব্যাপার হল এত বেশি বাঁচবার পরেও
আমি আরও সেই পরিমান বেশি বাঁচতে চাই
আগে কখনও মনে হয়নি আমার এত সুরেলা গলা
কখনও আমি পাই নি এত বেশি চুম্বন

বরাবরের মতই এখন এটা অসময়
ঠিকরানো আলো যেন মৌমাছির ঝাঁক

দিনটার সঙ্গে আমি একা থাকতে চাই
আমাকে জন্মাবার অনুমতি দাও”

[অনুবাদ সুভাষ মুখোপাধ্যায় ]

About Post Author