পুরন্দর চক্রবর্তী, সময় কলকাতা ডেস্ক :
“দু আঁখে কাজল অতি দেখিতে উত্তম/
চলন খঞ্জন পাখি পাইবে শরম/
হাতে পদ্ম পায় পদ্ম কপালে রতন জ্বলে/
পীরকে দেখিয়া প্রজা ধন্য ধন্য করে।” লোককাব্যে এভাবেই বর্ণিত পীর একদিল শাহ ছিলেন চতুর্দশ শতাব্দীর মানুষ। মঈনুদ্দিন চিস্তির সঙ্গে তিনি আরব থেকে তাঁর ৩৯ জন সতীর্থর সঙ্গে ভারতে আসেন। এঁদের মধ্যে তিনি ও আরও একুশ জন বঙ্গের বিভিন্ন প্রান্তে। একদিল শাহ এসেছিলেন তৎকালীন আনোয়ারপুর পরগনায় যা আজকের দিনের বারাসাত।তাঁরা প্রত্যেকেই ছড়িয়ে দিয়েছিলেন শান্তির বার্তা। পীর একদিল শাহ তাঁর ব্যতিক্রম নন। পীর হজরত একদিল শাহ, তাঁর ভাবনা এবং তাঁর তৎকালীন বিচরণভূমি, বাসগৃহ ও দরগার বর্তমান অবস্থা তুলে ধরতেই আজ আমাদের ইতিহাসের বিশেষ অনুষ্ঠান।
শান্তির প্রতীক পায়রা। সকাল থেকে সন্ধ্যা – যেকোনো সময় যে কেউ দেখতে পাবেন প্রাচীন দরগাটিতে শয়ে শয়ে পায়রা উড়ছে। ঝাকে ঝাঁকে পায়রাকে দেখতে পাবেন পবিত্র স্থানটিতে। যার চির বিশ্রামের স্থান এই দরগা তিনি ছিলেন শান্তির দুত আর তাই তার মৃত্যুর প্রায় ৮০০ বছর পরেও তার বাসগৃহ, বিচরণভূমি ও সমাধিস্থলের আশেপাশে শান্তির প্রতীক হিসেবে পরিচিত পায়রার আনাগোনা লেগেই থাকে।আমরা যার কথা আজ আলোচনা করছি সেই পীর হজরত একদিল শাহ ছিলেন প্রকৃত অর্থেই শান্তির বার্তাবাহী। তিনি ছিলেন মনুষ্যত্বের পূজারী। তিনি ছিলেন প্রাচীন অখন্ড বঙ্গের বুকে সর্বধর্মের সম্প্রীতির ভিত গড়ার কারিগর। তাই শান্তির প্রতীক পারাবতদের কলতানে অহরহ মুখরিত হয় পীর একদিল শাহের দরগা। ইতিহাস বলে, পীর একদিল শাহের পূর্ব নাম ছিল আহমদ উল্লা। বাংলার মানুষ তাকে ভালবেসে এক দিল বা অভিন্ন হৃদয় উপাধি দেয় বলেই অনুমান করা হয়। আরবের বাগদাদ থেকে মইনুদ্দিন চিশতির যে ৪০ জন শিষ্য ভারতে এসেছিলেন তার অন্যতম তিনি। খুব অল্প বয়সে আহমদ উল্লা মইনুদ্দিন চিশতির শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন। এদের মধ্যে ২২ জন শিষ্য বা আউলিয়া ইসলাম ধর্ম প্রচারের জন্য ছড়িয়ে পড়েন বঙ্গে। একদিল শাহকে প্রেরণ করা হয় আনোয়ারপুর পরগনায় যা কাজীপাড়া বলে খ্যাত হয়। পরবর্তীতে এই আনোয়ারপুর পরগনার নামই হয়ে উঠে বারাসাত। একদিল শাহ সহ মইনুদ্দিন চিশতির শিষ্যদের বা আউলিয়াদের ভারত আগমন কালে জনৈক রাজা পৃথ্বীরাজের কথা লোকমুখে আজও শোনা যায়। সেক্ষেত্রে তিনি যদি পৃথ্বীরাজ চৌহান হন তাহলে বলতে হয় মোহাম্মদ ঘুরীর সমসাময়িক ছিলেন পীর একদিল শাহ। অর্থাৎ একদিল শাহের আলোচনা প্রসঙ্গে যতই অনেক ক্ষেত্রে তাঁকে চতুর্দশ শতকের লোক বলা হোক তার ভারত আগমন খুব সম্ভবত দ্বাদশ শতকের শেষ ভাগে হয়েছিল। কারণ মনে রাখতে হবে মইনুদ্দিন চিশতির প্রয়াণ ঘটে ১২৩৫ খ্রিস্টাব্দে। শোনা যায় মইনুদ্দিন চিশতির আগমনকে খুব সন্তুষ্ট চিত্র গ্রহণ করেননি পৃথ্বীরাজ চৌহান। একথা উল্লেখযোগ্য যে পৃথ্বীরাজ চৌহান মাত্র ৪৩ বছর বেঁচে ছিলেন এবং ১১৯১ সালে মোহাম্মদ ঘুরীকে পৃথ্বীরাজ চৌহান পরাস্ত করলেও ১১৯২ খ্রিস্টাব্দেই তরাইনের দ্বিতীয় যুদ্ধে মৃত্যু হয় পৃথ্বীরাজ চৌহানের। এই সময়কাল অত্যন্ত সুনির্দিষ্টভাবে প্রমাণ করে দ্বাদশ শতকের শেষ ভাগে মইনুদ্দিন চিশতী ও তার অনুচরদের ভারত প্রবেশ হয়েছিল। যেহেতু লোক শ্রুতি অনুযায়ী কিশোর বয়সে আনোয়ারপুর নামে পরিচিত তৎকালীন বারাসাতে ছোট মিয়া বা ছোটেমিয়ার বাড়িতে বসবাস শুরু করেন একদিল শাহ তাই একথা অনেকটাই নিশ্চিতভাবে বলা যায় আটশো থেকে সাড়ে আটশ বছর আগের সময়কালে মইনুদ্দিন চিশতী ধর্ম প্রচারের উদ্দেশ্যে তার অল্প বয়সী শিষ্যদের পাঠিয়েছিলেন বঙ্গ তথা ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে। এদের সঙ্গে ভারতবাসীর কোন যুদ্ধ হয়নি,দুয়েকক্ষেত্রে মতের দ্বন্দ্ব হলেও সরাসরি কোন বিরোধ বাঁধেনি । বরং অত্যাচারী মুসলিম সম্ভ্রান্তদের সঙ্গেই বিরোধ হয়েছে। কারণ মুসলিম শাসকদের অনুগ্রহপ্রাপ্তরা সে সময় অনেকেই ছিলেন অত্যাচারী।একদিল শাহের মত মানুষরা নিয়োজিত ছিলেন শুধু ইসলাম ধর্মপ্রচারে নয় , তাঁরা এসেছিলেন সৌভ্রাতৃত্বের ও শান্তির বাণী নিয়ে। আজকে আমরা যে মানুষটির আলোচনা করছি সেই একদিল শাহ বারাসাত তথা বঙ্গের ইতিহাসের অত্যন্ত গভীরে ছড়িয়ে আছেন। বারাসাত বা আনোয়ারপুর তখন গ্রাম এবং জঙ্গলে পরিপূর্ণ। এই সময় সুবর্ণবতী বা সূক্ষ্মবতী যা কিনা বর্তমানের প্রায় মজে যাওয়া সুটি নদী নামে পরিচিত তা বয়ে যেত খরস্রোতা হয়ে। এই সুটি নদীর অদূরে কাজীপাড়ায় বিচরণ ক্ষেত্র ছিল পীর একদিল শাহের। অলৌকিক জনশ্রুতি এবং মানবিক উপাদানে ভরপুর কাজি একদিল শাহকে ঘিরে আবর্তিত ইতিহাসের।বহু লোকশ্রুতি একদিল শাহকে ঘিরে।

আজও বারাসাতের কাজীপাড়ায় সযত্নে রক্ষিত ৮০০ বছরের ইতিহাসের সাক্ষী পীর একদিল শাহের দরগা বা মাজার। যে ছোটোমিয়া বা ছোটে মিয়ার বাড়িতে তিনি আশ্রয় নিয়েছিলেন সেই ছোট মিয়ার মাজারও রয়েছে রয়েছে। রয়েছে একটি ছোট্ট সমাধি। কথিত আছে এটি পীর একদিল শাহের অত্যন্ত স্নেহাস্পদ জীব পোষা শালিক পাখির মাজার।একথা বলাই বাহুল্য পীর শান্তির প্রতীক হলেও ছিলেন অত্যাচার অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার। শোনা যায়, শ্রীকৃষ্ণপুরের প্রতিপত্তিশালী জনৈক চাঁদ খার অত্যাচারের বিরুদ্ধে তিনি রুখে দাঁড়িয়ে ছিলেন। চাঁদ খার অন্যায় কার্যাবলী কে তিনি ইসলাম ধর্মমতের অনুসারী মনে করেন নি। এক দিল শাহ বিশ্বাসী ছিলেন মানুষের প্রতি মানুষের ভালোবাসার বন্ধনে।
যে ঘাটে স্নান করতেন পীর একদিল শাহ, সেটির আজ ভগ্ন দশা হলেও তাও এখনও দেখা যায়। প্রাচীন প্রাচীন বাসস্থানের সবই প্রায় সময়ের সাথে সাথে ভেঙে পড়েছে। মনে করা হয়,তার মৃত্যুর দিন ছিল পৌষ সংক্রান্তির ঠিক আগে। তাঁর প্রয়াণ দিনটির স্মরণে শীতকালে আজও আট দিনব্যাপী মেলা তথা উরুশ উৎসব চলে। এ সময় হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে আসেন তার দরগায়। তার জীবদ্দশাতেও হিন্দুদের অবারিত দ্বার ছিল একদিল শাহের কাছে। তিনি সমাজের উচ্চ নীচ ভেদাভেদ দূর করার চেষ্টা করে এসেছেন। হিন্দু মুসলিম ঐক্যের প্রমাণ মেলে তার কাজ কর্মে।রাজা রামমোহন রায়ের পূর্বপুরুষ ও বংশধররা ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছেন পীর একদিল শাহের ইতিহাসের সঙ্গে। মুসলিম মানুষদের পাশাপাশি বহু খ্যাতনামা হিন্দুর পদার্পণ ঘটেছে এই দরগায়। এই দরগাহ হয়ে উঠেছে সর্ব ধর্মের মিলন মেলা। পীরবাবা অলৌকিক শক্তি সম্বন্ধে আজও বহু কাহিনী প্রচলিত। এর টানে আজও রোগ ব্যাধি থেকে মুক্তি বা মুশকিল আসানের আশায় মানুষ ছুটে আসেন দরগায়। অথচ ঐতিহাসিক ভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পীর একদিল শাহের দরগার রক্ষণাবেক্ষণের জন্য যে কমিটি বহুদিন ধরে সচেষ্ট তাঁরা তাঁদের সীমিত সামর্থ্যের ইতিহাস কে ধরে রাখার চেষ্টা করছেন। তারা এই প্রাচীন ঐতিহ্যকে আরো সঠিকভাবে রক্ষণাবেক্ষণের জন্য বারাসাত পুরসভার কাছে আবেদন জানিয়েছেন।এর বেশি আর তাঁরা এগোতে পারেন নি।২০০ বছর, ২৫০ বছর বা ৩০০ বছর আগের ইতিহাস ঠাঁই পেয়েছে হেরিটেজের তালিকায়।বিখ্যাত ইতিহাস আশ্রিত স্থানগুলিকে রাখার জন্য যে হেরিটেজ কমিটি রয়েছে তাঁদের নজর পড়ে নি পীর একদিন শাহের দরগা ও তার চারপাশে ছড়িয়ে থাকা ভগ্নপ্রায় নিদর্শনে । বহু মানুষ আসেন তার নামাঙ্কিত মসজিদে, বা পাশের স্কুলে পড়তে আসে ছাত্র-ছাত্রীর দল। শান্তির পূজারী এবং সে সময়ের সমাজ সংস্কারক একদিল শাহ না পেয়েছেন পাঠ্য বইয়ে স্থান,না তাঁর দরগা পেয়েছে উপযুক্ত ঐতিহাসিক মর্যাদা। তাঁর দরগা রক্ষণাবেক্ষণ করেন গুটি কয়েক স্থানীয় মানুষ । সরকারি অনুদান নেই , ইতিহাস ও সময়ের চিহ্ন ধরে রাখার কোনও সরকারি চেষ্টা হয় না, খেদ স্থানীয় মানুষদের।

উত্তর চব্বিশ পরগনা জেলার বারাসাতে পীর হজরত একদিল শাহের দরগা ও তার লাগোয়া অঞ্চল ঘিরে ছড়ানো ছেটানো রয়েছে আটশো বছরের ইতিহাস। স্থানীয় মানুষ জানেন এই স্থানের মাহাত্ম্য। তাঁরাই রক্ষা করে চলেছেন ইতিহাস ও ইতিহ্য। পীর একদিল শাহ প্রদর্শিত সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি, ভাতৃত্ববোধ ও মনুষ্যত্বের জাদু কাঠির ছোঁয়া আজও মুছে যায় নি। আজও একদিল শাহের বিচরণ ক্ষেত্রের সংলগ্ন এলাকায় সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি অটুট। সেই ধারা রয়ে গেলেও সময়ের সাথে সাথে ইতিহাস কে যেভাবে বাঁচানো দরকার অর্থাৎ প্রাচীন সময়ের চিহ্ন আরো সঠিক তত্ত্বাবধানের অভাবে দ্রুত মুছে যাচ্ছে পীর হজরত একদিল শাহের স্মৃতি বিজড়িত স্থান থেকে। স্থানীয় মানুষের চাইছেন সরকারি ভাবে ঐতিহাসিক স্থানকে যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া হোক।।


More Stories
বাংলা নববর্ষের ইতিহাস
আরেক অভিনেতা প্রণবের অকালপ্রয়াণ
বেজি কি সাপের বিষে কাবু হয় না?