Home » রোনাল্ডোর ইশারা, উত্থান নতুন তারকা ৱ্যামোসের

রোনাল্ডোর ইশারা, উত্থান নতুন তারকা ৱ্যামোসের

পুরন্দর চক্রবর্তী, সময় কলকাতা :

এককথায় অবিশ্বাস্য এবং ফুটবলের যেকোনো রূপকথাকে হার মানায়। রোনাল্ডো নেই তো কি  হয়েছে, তাঁর বদলে খেলতে নেমে বিশ্বকাপে  হ্যাটট্রিক করে ফেললেন পর্তুগালের  তরুণ এক স্ট্রাইকার যার দেশের হয়ে সে অর্থে আন্তর্জাতিক খেলার বিশেষ অভিজ্ঞতাই ছিল না। নবীন  স্ট্রাইকারের আশ্চর্য উত্থানের পেছনে  রয়েছে  ততোধিক আশ্চর্য এক ঘটনা।

 

কাতার বিশ্বকাপে কোয়ার্টার ফাইনালে যাওয়ার শেষ খেলায় মঙ্গলবার মাঠে নেমেছিল পর্তুগাল। অনেককেই আশ্চর্য করে ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডোকে বাদ দিয়ে পর্তুগাল সুইজারল্যান্ড এর বিরুদ্ধে প্রথম এগারোকে মাঠে নামায় । আশ্চর্যজনক ভাবে দেখা যায়  রোনাল্ডোর পরিবর্তে ২১ বছর বয়সী গঞ্জালো ৱ্যামোস দেশের হয়ে প্রথম একাদশে জায়গা পেয়েছেন । সুযোগ পেয়েই তা বিন্দুমাত্র হাতছাড়া না করে  তাকে  পুরোমাত্রায় কাজে লাগান ৱ্যামোস। চতুর্থ ম্যাচ খেলতে নেমে তার চতুর্থ টাচে অবিস্মরণীয় গোল করেন গঞ্জালো রামোস। ম্যাচে হ্যাট্রিকও পেয়ে যান তিনি।পর্তুগাল ৬-১ গোলে সুইজারল্যান্ডকে হারায় ।৭২ মিনিটে পর্তুগালের কোচ ফারনান্ডো স্যান্তোস র‍্যামোস কে তুলে শেষ কুড়ি মিনিট খেলার সুযোগ করে দিলেন বিশ্ব ফুটবলের সর্বকালের অন্যতম শ্রেষ্ঠ তারকা ফুটবলার ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডোকে । ততক্ষণে ৫-১ গোলে এগিয়ে গেছে পর্তুগাল। সামান্য সময় সুযোগ পেয়ে  রোনাল্ডো এদিন একটি গোলও করেছিলেন যা কিনা অফসাইডের জন্য বাতিল হয়ে যায়। অন্যদিকে হ্যাটট্রিক করে  খবরের শিরোনাম উঠে এলেন তরুণ উদীয়মান স্ট্রাইকার গঞ্জালো র‍্যামোস।

ফুটবল বিশ্ব উত্তর খুঁজছে।রোনাল্ডোর ঠোঁটে আঙ্গুল দিয়ে চুপ করতে বলার ইশারায় কি নতুন দিগন্ত খুলে দিল পর্তুগাল তথা বিশ্ব ফুটবলের? ঘটনা পরম্পরা কি সেদিকেই ইঙ্গিত দিচ্ছে? কেন বাদ দেওয়া হয়েছিল রোনাল্ডোকে? এবার বিশ্বকাপে তো তিনি গোল করেছেন, তাহলে? বয়স হলেও আজও যে কোনও সময় যে কোন ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারেন  রোনাল্ডো, তা সত্ত্বেও কেন তাকে প্রথম একাদশের বাইরে রাখলেন কোচ? এত বড় ঝুঁকি কেন নিলেন ফারনান্ডো স্যান্তোস?

এই ঘটনার মূলে পৌঁছতে হলে চলে হতে হবে দক্ষিণ কোরিয়া ম্যাচের দিন যখন ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডোকে কোচ ফারনান্ডো স্যান্তোস তুলে নেন। এই ম্যাচে দক্ষিণ কোরিয়ার কাছে ১-২ গোলে হেরে যায় পর্তুগাল। খেলা শেষ হওয়ার আগেই কোচ  রোনাল্ডোকে তুলে নেন।কোচ যখন রোনাল্ডোকে মাঠ থেকে তুলে নিচ্ছেন, তখন ঠোঁটে আঙ্গুল দিয়ে অঙ্গভঙ্গি করতে দেখা যায় তারকা ফরোয়ার্ডকে । এমনিতেই গুঞ্জন রয়েছে, পর্তুগিজ কোচের সঙ্গে ব্যক্তিত্বের সংঘাত চলছে রোনাল্ডোর। অনেক ফুটবল বিশেষজ্ঞই মনে করেছিলেন রোনাল্ডো  সেদিন কোচের তাঁকে পরিবর্তন করার সিদ্ধান্ত খুশি মনে মেনে নিতে পারেননি। রোনাল্ডো অবশ্য জানিয়েছেন যে,তিনি কোচকে লক্ষ্য করে ইঙ্গিত করেননি। তাকে দক্ষিণ কোরিয়ার এক খেলোয়াড় তাড়াতাড়ি মাঠ ছাড়তে বলায় তিনি নাকি দক্ষিণ কোরিয়ার খেলোয়াড়কেই চুপ করার জন্য ইঙ্গিত করেছিলেন।কিন্তু বাস্তব হল যে,রোনাল্ডোর ইশারা কে কোচ ফারনান্ডো স্যান্তোস মোটেই ভালোভাবে নেননি। তিনি জানিয়েছেন তার বিষয়টি ভালো লাগেনি । তিনি জানিয়েছিলেন ওখানেই বিষয়টি শেষ এবং সুইজারল্যান্ড ম্যাচে কাকে নামাবেন বা কাকে নামাবেন না তা তিনি ম্যাচের আগেই তিনি ঠিক করবেন। ফলে রোনাল্ডো পর্তুগালের প্রথম এগারোয় জায়গা পান কিনা তা নিয়ে ধোঁয়াশা ছিলই। কোচ ও রোনাল্ডোর সংঘাতের বিষয়টি যে শেষ যে হয় নি তা টের পেতে অপেক্ষা করতে হয় সুইজারল্যান্ড ম্যাচে পর্তুগালের  প্রথম একাদশের তালিকা প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত ।সব জল্পনার অবসান হয়ে যায় ম্যাচ শুরু হওয়ার কিছুক্ষণ আগে। চূড়ান্ত দলের রোনাল্ডোর বদলে দেখা যায় গঞ্জালো ৱ্যামোসের নাম। আর নেমেই চমকে দেন র‍্যামোস। ১৭ মিনিটের মাথায় দূর থেকে তার শট জড়িয়ে যায় সুইজারল্যান্ডের জালে। বিশ্বমানের গোল  চোখ জুড়িয়ে দেয় দর্শকদের। এই গোলকে এবার কাতার বিশ্বকাপের এখন পর্যন্ত সেরা গোল বললেও অতিশয়োক্তি হয় না। এরপরে খেলার দ্বিতীয়ার্ধে আরও দুটি গোল করে নিজের হ্যাট্রিকও সম্পন্ন করেন ৱ্যামোস । পর্তুগালের জয় ও ৱ্যামোসের হ্যাটট্রিকের দিনে  ফুটবল বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, খেলার মাঠে জয়ের পাশাপাশি পর্তুগিজ কোচ মাঠের বাইরে তথা ড্রেসিংরুমের যুদ্ধেও জয়লাভ করেছেন।স্যান্তোসের এই যুদ্ধজয় ফুটবলের পক্ষে শুভ বলেই বিশেষজ্ঞরা পরোক্ষে জানিয়েছেন।কোচ রোনাল্ডোকে বসিয়ে ৱ্যামোসকে সিদ্ধান্ত ক্লিক করায় স্যান্তোস অন্তত বার্তা দিয়েছেন কেউ যত বড় তারকা ফুটবলার ই হন না কেন, খেলায় শৃঙ্খলাই শেষ কথা এবং কেউই অপরিহার্য নন।

কোচের সিদ্ধান্তকে সঠিক প্রমাণ করার দায়িত্ব যার উপরে বর্তে ছিল সেই ফুটবলার গঞ্জালো র‍্যামসের পরিচয় কি ? ২১ বছরের ছ ফুট এক ইঞ্চির এই তারকা ফুটবলার মাত্র দু মাস আগে পর্তুগাল দলের ফরওয়ার্ড রাফা সিলভার অবসরের পরে দেশের হয়ে খেলার ডাক পান । সুইজারল্যান্ড ম্যাচ এর আগে  মাত্র তিনটি ম্যাচ দেশের হয়ে খেলেছেন। একটি ফ্রেন্ডলি ম্যাচে নাইজেরিয়ার বিরুদ্ধে একটি গোল করলেও বিশ্বকাপে দুরস্ত, কোন প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচে পর্তুগালের সিনিয়র দলের হয়ে গোল করেন নি তিনি। তবে অনূর্ধ্ব ১৯ ও অনূর্ধ্ব ২১ পর্তুগাল দলের হয়ে চমকপ্রদ সাফল্য রয়েছে ৱ্যামোসের। হ্যাটট্রিক করেছেন দেশের হয়ে দুরকমের বয়স ভিত্তিক আন্তর্জাতিক খেলায়। অনূর্ধ্ব একুশ পর্তুগালের হয়ে ১৮টি ম্যাচ খেলে ১৪ টি গোল করেছেন তিনি।এবার সিনিয়র দলের হয়েও হ্যাটট্রিক সেরে ফেললেন তিনি। মনে করা স্বাভাবিক, পর্তুগিজ  কোচ ও তারকা ফুটবলারের সংঘাতের লগ্নে বিশ্ব হয়তো পেতে চলেছে এমন এক স্ট্রাইকারকে যিনি ফুটবল বিশ্ব শাসন করতে পারেন। এখন দেখার ফুটবল সূর্য রোনাল্ডোর বেলা অবসানের আগে পর্তুগিজ ফুটবলে রোনাল্ডোর প্রকৃত অর্থে উত্তরসূরী হয়ে দেখা দেবেন কি গঞ্জালো ৱ্যামোস?

About Post Author