Home » খনামিহিরের ঢিপির মাটিচাপা ইতিহাস

খনামিহিরের ঢিপির মাটিচাপা ইতিহাস

পুরন্দর চক্রবর্তী, সময় কলকাতা,২৬ ডিসেম্বর : ভারতের ইতিহাস অত্যন্ত প্রাচীন। প্রাচীনত্বের ঐতিহাসিক নিদর্শন ছড়িয়ে আছে ভারত জুড়ে। ইতিহাস যেখানে অনেক কথা বলতে চায় তেমন নিদর্শন চোখে পড়ে বঙ্গের বিভিন্ন অংশেও । এরকমই এক ইতিহাসের সাক্ষী উত্তর চব্বিশ পরগনার বেড়াচাঁপার খনামিহিরের ঢিপি। এখানের ইতিহাস ঘিরে রয়েছে এমন কিছু ধোঁয়াশা  যার পর্দা উন্মোচনের  প্রচেষ্টা নিম্নলিখিত প্রতিবেদনে।

বলাবাহুল্য, খনা মিহিরের ঢিপিতে ইতিহাস রয়েছে চোখের সামনে, মাটি চাপা রয়েছে আরও অনেক ইতিহাস। ফলে বৈপরীত্য  দুই হাজার বছরব্যাপী বা তারও বেশি সময়কাল ধরে চলে আসা খনা মিহিরের ইতিহাসে।আর এরই ফলশ্রুতি লোককাহিনী ও লোকশ্রুতি  নির্ভর ইতিহাস। খনা মিহিরের ঢিপি নাম যাদের সঙ্গে জড়িয়ে, তাঁদের অস্তিত্ব আদৌ এই অঞ্চলে ছিল কিনা তা নিয়ে ঐতিহাসিক কোনও সত্য আজও প্রতিষ্ঠিত নয়। তবুও খনা মিহিরের ভারতের প্রাচীন ইতিহাসের অঙ্গ, ঐতিহাসিক সম্পদ। প্রাচীন বিলুপ্ত রাজধানী চন্দ্রকেতুগড়ের অংশ  খনামিহিরের ঢিপি। চন্দ্রকেতুগড়ের ইতিহাস অত্যন্ত প্রাচীন।

কলকাতা বা বারাসাত থেকে খুব কাছেই বর্তমান দেগঙ্গা থানার বেড়াচাঁপায় বসিরহাটগামী রাস্তার অদূরে দেখা যাবে এই প্রাচীন ঐতিহাসিক নিদর্শন। প্রকৃত অর্থে খনা মিহিরের ঢিপি বলতে যা দৃশ্যমান তা এখন ইটের ভগ্নাবশেষ যা রয়েছে উত্তর চব্বিশ পরগনার দীর্ঘ এক এলাকা জুড়ে । প্রাচীন বিলুপ্ত রাজধানী চন্দ্রকেতু গড়ের অংশ হিসেবে পরিচিত খনা মিহিরের ঢিপি সংলগ্ন এলাকায় ছিল প্রাচীন এক সমৃদ্ধ সভ্যতা। বিকাশ হয়েছিল এক জনপদের।ইতিহাস যেমন এখানে কথা বলে, ইতিহাস তেমন ভাবেই এখানে মাটি চাপা হয়ে স্তব্ধ রয়েছে।

খনা মিহিরের ঢিপি নাম শুনলে যে খনা মিহিরের সম্পর্কে আগ্রহ জন্মানো স্বাভাবিক। কে ছিলেন খনা কে ছিলেন মিহির ? বলা হয় দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তের সভা আলো করেছিলেন যে নবরত্ন তার অন্যতম বরাহের পুত্র মিহির ও তার স্ত্রী খনার নাম অনুসারে হয়েছে খনা মিহিরের ঢিপি। বলা হয়, গুপ্তবংশের সম্রাট সমুদ্রগুপ্তের নবরত্নের অন্যতম, জ্যোতিষী বরাহের পুত্র মিহির ও পুত্রবধূ খনার বাসস্থান, গবেষণাগার ও মন্দির ছিল এখানেই। মন্দির নিয়ে সন্দেহ নেই, মন্দিরের বিষয়টি ঐতিহাসিক ভাবে স্বীকৃত।

উল্লেখ্য,আশুতোষ মিউজিয়ামের নেতৃত্বে ১৯৫৬-৫৭ সালে বেড়াচাঁপায় এই স্তুপ খননের পর পাওয়া গেছে পোড়ামাটির পাত্র, পুঁথি, দামি পাথর, হাতির দাঁতের তৈরি নানাবিধ দ্রব্য, তামার মুদ্রা, পোড়ামাটির পুতুল, বিষ্ণুমূর্তি ইত্যাদি। খননকারীরা জানিয়েছেন, ঢিপিটি আদিতে একটি মন্দির ছিল। প্রায় দেড় হাজার বছর আগের এই মন্দিরের ভিত্তিভূমি ৩০০ ফুট দীর্ঘ, প্রস্থে ১০০ ফুট। চারপাশে ৬৩ ফুট বিস্তৃত খনা মিহিরের ঢিপির দৃশ্যমান অংশ । ঢিপিটি খনন করে ৩৭টি ধাপবিশিষ্ট ইটনির্মিত সুদৃশ্য একটি গহ্বরও আবিষ্কৃত হয়েছে।

তবে ঢিপির নামের তাৎপর্য নিয়ে বিতর্ক বিস্তর।খনার অস্তিত্ব,পরিচয় নিয়েও বহু ব্যাখ্যা আছে ঐতিহাসিকদের মধ্যে।কারও মতে তিনি সিংহলি রাজকুমারী গণিত বিশারদ লীলাবতী।যিনি পরে খনা নামে  খ্যাতি লাভ করেন। অনেকের মতে, খনা শব্দটি ক্ষণ বা ক্ষণজন্মা থেকে উদ্ভূত।বলা হয় এই বিদুষী মহিলার জিভ কেটে নিয়েছিলেন তার স্বামী ও শ্বশুর। কারণ রাজা যে প্রশ্নের সমাধান চেয়েছিলেন সে প্রশ্নের উত্তর দিতে ব্যর্থ হন পন্ডিত বরাহ ও তার পুত্র মিহির। আশ্চর্যজনকভাবে  সেই প্রশ্নের সমাধান করে দেন খনা। তাই খনার উপরে ক্রুদ্ধ হন কুপিত হন বরাহ এবং মিহির। কেটে নেওয়া হয় তার জিহ্বা। বলা হয় সেই থেকেই তার নাম খনা ,খোনা বা বোবা শব্দ থেকে খনা নামটি এসেছে। আর এখানেই মল্লিকা সেনগুপ্ত বা আধুনিক নারীবাদী লেখিকারা সরব। প্রাচীন সময় থেকেই মহিলাদের কণ্ঠরোধ করার প্রথা এই ঘটনার মধ্যে থেকেই প্রকট।সে ইতিহাস প্রাসঙ্গিক হলেও স্বতন্ত্র। খনা সিংহলি ছিলেন নাকি ভারতের অন্য অংশের বাসিন্দা ছিলেন, নাকি বাঙালি ছিলেন এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে বিভক্ত ঐতিহাসিকরা। আর এই জন্যই ঐতিহাসিক সত্য হিসেবে খনা মিহিরের ঢিপি কে খনা বা মিহিরের বাসস্থান হিসেবে ঐতিহাসিক ভাবে মেনে নেওয়া হয় না। খনার অস্তিত্ব নিয়ে যতই মতানৈক্যই থাক না কেন, বেড়াচাঁপার কাছে চন্দ্রকেতুগড়ের এই ঢিপি খনন করে জ্যোতিষশাস্ত্রের সাথে সম্পর্কযুক্ত বিভিন্ন জিনিস যেমন চূণী,পান্না,পোখরাজ,মাটি ও পাথরের ফলকের ওপর রাশিচক্রের খোদাই করা ছবি পাওয়া গেছে।১৯৫৬-৫৭ সালে আশুতোষ মিউজিয়ামের উদ্যোগে খননকার্য চলার পরে আর নতুন করে সে অর্থে খননকার্য হয়নি ।তৎকালীন খননকারীদের মতে,এখানে আসলে একটি মন্দির ছিল এবং সেটি হয়তো বিষ্ণুমন্দির। লোক পরম্পরায় বেড়াচাপার মানুষদের এক বিরাট অংশ খনা মিহিরের ঢিপিকে খনা ও মিহিরের বাসস্থান বলে আজও মনে করেন। তথাপি যেহেতু এখানের  অনেক ইতিহাস অজানা তাই পর্যটকদের আকর্ষণের কেন্দ্র এই খনামিহিরের ঢিপি যার ইতিহাস প্রগাঢ় ভাবে জানতে চান স্থানীয় মানুষ।

খনা বা মিহির কি যেখানে থাকতেন? ঐতিহাসিকভাবে  বিষয়টি প্রমাণিত না হলেও  একটি বিষয় অত্যন্ত পরিষ্কার  যে খনা বা মিহিরের সমকালীন এই ঢিপি যাকে  ঐতিহাসিকরা  এখনো পর্যন্ত সূর্য মন্দিরের তকমা দিয়েছেন। তবে সম্পূর্ণভাবে অগ্রাহ্য করা হয় না খনা বা মিহিরের সাথে  এই মন্দিরের যোগ সূত্র। কারণ  ঐতিহাসিকভাবে খনা মিহিরের ঢিপির প্রাপ্ত নিদর্শনের সময়কালের সঙ্গে মিলে যায় বিক্রমাদিত্য বা দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তের রাজত্বের সময়কাল। দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তের রাজত্বকাল ছিল ৩৭৫ খ্রিস্টাব্দ থেকে ৪১৫ খ্রিষ্টাব্দ। আর এই সময়ের সঙ্গে খাপ খেয়ে যায়  বেড়াচাপার খনা মিহিরের ঢিপি নামে পরিচিত প্রাপ্ত নিদর্শন। যদিও বেড়াচাঁপার অদূরে যে অংশে প্রাচীন বিলুপ্ত রাজধানী ছিল সেই চন্দ্রকেতুগড়ের বিকাশ লাভের  সময়কাল আরো অনেক আগের। বেড়াচাঁপা,দেগঙ্গা, হাড়োয়া বিস্তৃত অঞ্চল জুড়ে  ছিল চন্দ্রকেতুগড়ের জনপদ। চন্দ্রকেতু গড়  শুঙ্গ  বংশের সময়কালের বলেই ঐতিহাসিকরা মনে করেন। শুঙ্গ বংশের কথা ধরলে বলা যায় পুষ্য মিত্র শুঙ্গ ১৮৫ খ্রিস্টপূর্বাব্দে মৌর্য রাজবংশের সম্রাট বৃহদ্রথকে হত্যা করে সিংহাসনে বসেন। চন্দ্রকেতু গড় বা বিলুপ্ত রাজধানী শুঙ্গ বংশের সময়ের বলেই ধরা হয় । বলা হয় ২২০০ থেকে ২৩০০ বছর আগেকার ইতিহাস জড়িয়ে আছে চন্দ্রকেতু গড়ের সঙ্গে । তবে খনা মিহিরের ঢিপিকে যা কিনা একটি মন্দিরের অংশ বলেই মনে করা হয় তার প্রাচীনত্ব দেড় হাজার বছরের সামান্য বেশি বলেই মনে করা হয় ।

একসময় অবহেলিত হলেও খুব যত্ন সহকারে বর্তমানে এই খনামিহিরের ঢিপিকে সংরক্ষণ করা হয়। কারন  সার্বিকভাবে এই স্তুপ প্রাচীন বিলুপ্ত রাজধানীর ও তৎকালীন সভ্যতার  অংশ।ঐতিহাসিকের মতে চন্দ্রকেতুগড় যে শুঙ্গ রাজাদের অধীনে ছিল,যাদের নামকরণ হত বৈদিক দেবতাদের বা মিত্রদের নামে,যেমন পুষ্য মিত্র,অগ্নি মিত্র। বেড়াচাপার খনা মিহিরের ঢিপি বা ঐতিহাসিকভাবে কথিত মন্দির থেকে থেকে সূর্যদেবতার মূর্তি না পাওয়া গেলেও কুলঙ্গিতে পদ্মের নকশা পাওয়া গেছে।পদ্ম য সূর্যের প্রতীক, মিহির শব্দের অর্থও  সূর্য।তাই অনেক ঐতিহাসিক এটিকে বৈদিক যুগের সূর্যদেবতার মন্দির বলেছেন।

ইতিহাস আশ্রিত উপন্যাসে  মিসেল ঘটে সত্য ও কল্পনার। ঐতিহাসিকভাবে স্বীকৃত নয় এমন অনেক  বিষয়বস্তু ঐতিহাসিক উপন্যাসে  উঠে আসে। ঐতিহাসিকও উপন্যাসের সত্যতা কোনভাবেই  নিশ্চিত নয়। যেমন,শ্রীপারাবতের উপন্যাসে এই ঢিপিকে খনা মিহিরের ঢিপি আর তাঁদের চন্দ্রকেতুর সমসাময়িক বলেছেন।উপন্যাসের প্রয়োজনে খনা মিহির চন্দ্রকেতুর সময় উজ্জ্বয়িনী থেকে পালিয়ে আসেন বলা হয়  তবে  নিশ্চিতভাবে  ঐতিহাসিক সত্যতা  এই উপন্যাসে রয়েছে তা বলা সম্ভব নয় । খনা,মিহির গুপ্তযুগের চরিত্র আর চন্দ্রকেতু ত্রয়োদশ শতাব্দীর। তবে মন্দিরটি গঠনশৈলীর সাথে গুপ্তযুগের আর্কিটেকচার সারনাথ ও নালন্দার মিল আছে।কালীপ্রসন্ন চট্টোপাধ্যায়ের “ক্ষণা-মিহির” নামক উপন্যাসে তাঁদের দেউলিয়া আসার উল্লেখ না থাকলেও গোটা বঙ্গদেশে শুধু এই স্থানকে কেন্দ্র করেই খনা-মিহিরের বাসস্থানের লোককথা প্রচলিত। বাণী বসুর খনা মিহিরের ঢিপিতেও একাধিক কথা উঠে আসলেও  সত্য বা মিথ্যা নিরূপণ করা দুরূহ।

তবে একথা  উল্লেখ করা অত্যন্ত প্রয়োজন যে,খনার মত চরিত্র কিংবদন্তি হয়ে ওঠার অন্যতম প্রধান কারণ দীর্ঘ সময় ধরে প্রচলিত থাকা বিশ্বাস।বাংলার প্রকৃতি, লোকাচার, গূঢ় অথচ সঠিক গণনাকে প্রচলিত ছড়ার আকারে বাংলা ভাষায় প্রবাদে পরিণত হওয়া কোনো একটি বিশেষ সময়কালের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা সম্ভব করছিল না ।খনার অস্তিত্ব নিয়ে যতই বিতর্ক থাকুক না কেন এই খনা-মিহিরের ঢিপির ইতিহাস ও কিংবদন্তির মিশেলে প্রত্নতাত্ত্বিক ক্ষেত্র হিসেবে আজও অবাক করে দেয় সাধারণ মানুষ,আগ্রহী পর্যটক ও ইতিহাসপ্রেমীদের । খনা মিহিরের ঢিপি সার্বিকভাবে চন্দ্রকেতুব্বরের অংশ যে চন্দ্রকেতুগড় এক বিলুপ্ত রাজধানী। বেড়াচাঁপা,দেগঙ্গা হাড়োয়া সহ চন্দ্রকেতু গড়ের ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা বহুস্থান থেকে প্রাপ্ত ঐতিহাসিক নিদর্শন নিয়ে রাজ্য সরকারের তরফে একটি মিউজিয়াম গড়ে তোলা হয়েছে। এখানে দর্শকরা অতীত ইতিহাসের বহু নিদর্শন চাক্ষুষ করার সুযোগ পান।  লোকমুখে বয়ে আসা প্রচলিত  জনশ্রুতি কীভাবে ইতিহাসের উপাদান হয়ে উঠতে পারে খনা-মিহিরের ঢিপি তার একটি প্রকৃষ্ট উদাহরণ। মন্দির বা খনা- মিহিরের গৃহ যে ইতিহাসের সাক্ষী বেড়াচাপার স্তুপ হোক না কেন – সবকিছুর উর্ধ্বে ‘খনা মিহিরের ঢিপি’ বর্তমান সময়ে প্রাচীন ইতিহাসের অন্যতম একটি উপাদান যার বহু তথ্য অজানা। এখানের ইতিহাস ঘিরে কৌতুহল ও জিজ্ঞাসার নিরসনের জন্য আজও রয়েছে  প্রতীক্ষা।।

About Post Author