Home » ক্ষমার রাত শবেবরাত, ফুরফুরা শরীফ ও ঈসালে সাওয়াব

ক্ষমার রাত শবেবরাত, ফুরফুরা শরীফ ও ঈসালে সাওয়াব

সময় কলকাতা ডেস্ক, ৮ ফেব্রুয়ারি: ফুরফুরা শরীফের ঐতিহ্য সুপ্রাচীন। এবার ফুরফুরা শরীফ সেজে উঠেছে রঙে রূপে আর ধর্মীয় আবেগে।  এবছর যেদিন বাঙালি হিন্দুরা  সারা বঙ্গে পালন করলেন দোলযাত্রা,তখন শবে বরাতে বাঙালি মুসলিম উৎসব হিসেবে নয় মুক্তির  রাত ও ক্ষমার রাত হিসেবে পালনে  ব্রতী।  আর ভারতীয় সংস্কৃতিকে যেন আলাদা মাত্রা দিয়েছে একই সাথে উদযাপিত ইসালে সাওয়াব।  ফুরফুরা শরীফে তিনদিন ধরে পালিত হয় ইসালে সাওয়াব। সবমিলিয়ে সবদিক থেকেই আজ বিভিন্ন আঙ্গিকে দিনটি হয়ে উঠেছে সাংস্কৃতিক আর ধর্মীয় ভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। সারাদিনে ধর্মীয় সমাগমের পরে রাত হয়ে ক্ষমার মমতা মাখা। এই রাতে আল্লাহ তাঁর বান্দা অর্থাৎ তাঁর বিশ্বাসীদের ক্ষমা করে দেন। এই রাতের ফজিলত বা উদ্দেশ্য সম্পর্কে আরও এক হাদিসে ব্যাখ্যা এসেছে, যেখানে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘শাবানের মধ্যরাতে আল্লাহ-তায়ালা তাঁর সৃষ্টির প্রতি (রহমতের) দৃষ্টি দেন। মুশরিক ও হিংসুক ব্যতীত সকল বান্দাদের ক্ষমা করেন।’

উল্লেখ্য,শবে বরাত বা মধ্য-শা’বান বা লাইলাতুল বরাত হচ্ছে হিজরী শা’বান মাসের ১৪ ও ১৫ তারিখের মধ্যবর্তী রাতে পালিত মুসলিমদের গুরুত্বপূর্ণ রাত। উপমহাদেশে এই রাতকে শবে বরাত বলা হয়। ইসলামী বিশ্বাস মতে,এই রাতে আল্লাহ তার বান্দাদেরকে বিশেষভাবে ক্ষমা করেন। বিশ্বের বিভিন্ন স্থানের অনেক মুসলমান নফল ইবাদাতের মাধ্যমে শবে বরাত পালন করেন। অনেক অঞ্চলে, এই রাতে তাঁদের মৃত পূর্বপুরুষদের জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়ার জন্য প্রার্থনার আয়োজন করা হয়। বারো শিয়া মুসলিমরা,এই তারিখে মুহাম্মদ আল-মাহদির জন্মদিন উদ্‌যাপন করে। তবে সালাফিরা এর বিরোধিতা করে থাকেন। এই রাতে আল্লাহ তাআলার কাছে নিজের গোনহা সমূহের বা পাপের ক্ষমা চেয়ে, তাওবা করে। ইসলামী ধর্মমতে,এ রাতে বেশি বেশি নফল ইবাদত, কুরআন তেলাওয়াত, কাজা নামাজসমূহ আদায়সহ অন্যান্য জিকির-আজকার করা যেতে পারে। এই রাত ক্ষমার রাত। শবে বরাতের নির্দিষ্ট কোনো ইবাদত বা নামাজ নেই। এদিনে ফজিলত মনে করে ভালো কোনো খাবারের আয়োজন করা বা খাওয়া উচিত নয়, এগুলো বিদআত, ইসলামে এর কোনো ভিত্তি নেই।  অনেকেই রোজা পালন করে থাকেন।এই রাতকে কেন্দ্র করে কোনোরকম আনন্দ উদযাপন, আতশবাজী করা, মসজিদে-কবরস্থানে আলোকসজ্জা করা এসবই বিদআত অর্থাৎ এসমস্ত কার্যকলাপ থেকে বিরত থাকা প্রয়োজন বলা হয়।আর ক্ষমার ধর্মীয় তাৎপর্যপূর্ণ রাত শবেবরাতের সঙ্গে ঈসালে সাওয়াব এবার যেন মিশে গিয়েছে। যদিও প্রতিবার এমনটা হয় না। ঈসালে সাওয়াব এক ধর্মীয় সমাগম যা বাংলা বর্ষপঞ্জি মেনেই হয় । বাংলা ফাল্গুন মাসের ২১,২২,২৩ তারিখে হয়ে থাকে ইসালে সাওয়াব।  এই ইসালে সাওয়াবের সঙ্গে জড়িয়ে আছে ফুরফুরা শরীফের ঐতিহ্য।

প্রসঙ্গত, উল্লেখযোগ্য ফুরফুরা দরবার শরিফ বা সিলসিলা-ই-ফুরফুরা শরীফ বা ফুরফুরা মাজার শরীফ ভারতের পশ্চিমবঙ্গের হুগলি জেলার একটি ইসলাম ধর্মীয় দরবার শরীফ ও আত্ন্যাধিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। সাধারণভাবে বলা হয় ,দেশের অন্যতম সম্মানের,পবিত্রতার দিক থেকে উল্লেখযোগ্য মাজার।  এই মাজারটি হুগলি জেলার জাঙ্গিপাড়া ব্লকের ফুরফুরা গ্রামে অবস্থিত। ফরাহ্‌ শব্দ থেকে উৎপত্তি ফুরফুরা শব্দটার। বলা হয় ফরাহ্‌-পূর্ণ আনন্দ।  হুগলি জেলা সম্পর্কিত বিভিন্ন তথ্যমূলক গ্যাজেটে ও ঐতিহাসিক গ্রন্থে  ফুরফুরা শরীফকে  বহু প্রাচীন সময় থেকেই  মুসলিমদের পবিত্র তীর্থস্থান নামে অভিহিত করেছ। ১৩৭৫ সালে মুকলিশ খান নির্মিত মসজিদ কেন্দ্র করে এই দরবার শরীফের যাত্রা শুরু হয়। মৌখিক রীতি অনুসারে ১৩৫০ সালের দিকে বাগদি (বার্গা ক্ষত্রিয়) রাজা এখানে রাজত্ব করত। রাজত্বকালে শাহ কবির হালিবি ও করমুদ্দিন নামে দুই মুসলিম সৈন্য এই ক্ষত্রিয় রাজার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে পরাজিত করে, উভয় দলনেতাই যুদ্ধে নিহত হয়েছিল। তাঁদের সমাধি হিন্দু ও মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের নিকট খুব পবিত্র বলে বিবেচিত হয়। ফুরফুরা শরীফের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্থান হজরত আবু বকর সিদ্দিক (রাঃ) এবং তার পাঁচ ছেলের মাজার শরীফ (মাজার)। পীর আবু বকর সিদ্দিকী ছিলেন একজন সামাজিক ও ধর্মীয় সংস্কারক,তাকে মোজাদ্দেদ জামান বা যুগের সমাজ সংস্কারক বলা হয়। তিনি দাতব্য প্রতিষ্ঠান,অনাথ ও দুঃস্থদের আশ্রয়,এতিমখানা, চিকিৎসা কেন্দ্র, মাদ্রাদ্রাসা, বিদ্যালয় ও শিক্ষাকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তিনি নারী শিক্ষায়ও রেখেছিলেন বিশেষ অবদান । তিনি সিদ্দিকা উচ্চ বিদ্যালয় নামে ফুরফুরা শরীফে মেয়েদের জন্য একটি স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন। সিদ্দিকী সামাজিক অপরাধ দূর করার লক্ষ্যে বহু সামাজিক কর্মকান্ডের সাথে জড়িত ছিলেন, এসব কাজের মধ্যেই সমস্ত জীবন ব্যয় করেছেন।

আবু বকর সিদ্দিকী একজন শিক্ষানুরাগী ব্যক্তি ছিলেন। ফুরফুরা শরিফের মাদ্রাসা দরিদ্র ছাত্রদের তিনি বিনা মূল্যে বা অতি সামান্য মূল্যে বোর্ডিং সুবিধা দিয়ে সাহায্য করেছিলেন। তিনি অনেক ইসলামি পত্রিকা এবং সংবাদপত্রের পৃষ্ঠপোষকতাও করেছেন। পত্রিকাগুলোর মধ্যে সাপ্তাহিক বাংলা পত্রিকা মুসলিম হিতৈষি অন্যতম। তার পরবর্তী পীর সন্তানেরা এসকল কর্মকান্ড অব্যাহত রেখেছিলেন। এছাড়াও আবু বকর একজন দেশপ্রেমিক ছিলেন, তিনি ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনকে বেগবান করতে সক্রিয় ছিলেন। তার ভক্তের পরিধি পশ্চিম বঙ্গ, বিহার আসাম, ও বাংলাদেশ (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান) জুড়েও ছিল। এসব একালায় মুসলিমদের বাইরেও তার ভক্ত ছিল।  তার এবং তার পরবর্তী পীরসমূহের কার্যক্রম বিভিন্ন বুদ্ধিজীবী ও আলেম কর্তৃক প্রশংসিত হয়ে থাকে। পীরের তৈরিকৃত মাদ্রাসা একসময় পশ্চিমবঙ্গের অন্যতম বিদ্যাকেন্দ্রে পরিণত হয়। পূর্ববঙ্গের প্রসিদ্ধ ফরায়েজী আন্দোলনের প্রবর্তক হাজী শরীয়তুল্লাহ ফুরফুরাতে এসে আরবি ও ফার্সী ভাষা শিক্ষাগ্রহণ করেন।

 

এই দরবারের সব কার্যক্রমের মধ্যে উরসের মেলা সবচেয়ে দৃষ্টি আকর্ষণীয় বিষয়। এই মেলায় লক্ষাধিক লোকের সমাগম ঘটে থাকে। মেলাটি ফুরফুরা শরীফের মেলা বা দাদাপীরের উরস উৎসবের মেলা নামেও পরিচিত। তবে আবু বকর সিদ্দিকী এই ধর্মীয় সমাগমের নাম দিয়েছিলেন ঈসালে সাওয়াব। বর্তমানে এই মেলা মূল পীরের নাতনীরা আয়োজন করে থাকে। এই সময় মেলায় মুরিদান গানের শিক্ষা চলে,মেলায় খেলাফত প্রাপ্ত আলেমগণ মুরিদদের দাদাপীরের সিলসিলা মতে ইসলামি জ্ঞানের দীক্ষা দান করেন। ফুরফুরা শরীফের মসজিদ প্রাঙ্গণে সন্ধ্যায় একসাথে কয়েক লক্ষ মানুষের ঢল নামে।  উৎসবের দিনে পীরের মূল মাজার ও মেলার দেড়-মাইল দূর থেকে মানুষজনের ভিড় শুরু হয়। বিভিন্ন ধরনের দোকান,খাদ্যসামগ্রী, মাথার নক্সাদার টুপি, তসবী, চা-পান-মিষ্টির বাজার বসে। এই মেলা গ্রামের অর্থনৈতিক উন্নয়নেও ভূমিকা রেখেছে। ভারতীয় ধর্মীয় সংস্কৃতির কেন্দ্রটি এসময় বয়ে আনে অর্থনৈতিক সংস্কার। উল্লেখযোগ্য ভাবে এবছর ফুরফুরা শরীফে ইসালে সাওয়াব ও শবেবরাতের সাথে ইতিহাস, সংস্কৃতির সাথে ধর্মীয় আবেগের মেলবন্ধন ঘটিয়েছে অসামান্যরূপে।

About Post Author