সময় কলকাতা ডেস্ক, ৫ জুলাই : মহাভারতের একটি স্তবকে উল্লেখ আছে, পঞ্চপান্ডবের পিতা পাণ্ডুর পত্নী ও নকুল সহদেবের জননী মাদ্রী স্বামীর মৃত্যুর পরে স্বামীর চিতায় স্বেচ্ছা মরণে “সতী” হন। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সদ্য বিধবা নারীদের স্বামীর শবদেহের সাথে মৃত্যুবরণ করার রীতির চৰ্চা দীর্ঘদিনের হলেও সদ্যবিধবা নারীদের মৃত্যুতে বাধ্য করার সনাতনী নজির মেলে না।। মাদ্রীর সহমরণের ঘটনা পৌরাণিক ব্যাখায় বাধ্যতামূলক সতীদাহ প্রথার নজির হিসেবেও ধরা হয় না। এই ঘটনাকে স্বেচ্ছা মৃত্যু হিসেবেই দেখানো হয়েছে যেখানে মাদ্রী স্বামী পান্ডুর মৃত্যুতে নিজেকে দায়ী মনে করেছিলেন। অথচ এই সহমরণের রীতি কালক্রমে সতীদাহ প্রথার রূপ নেয় যেখানে জোর করে পুড়িয়ে মারা হতে থাকে নারীদের ।১৮১৮ সালে বঙ্গে এরকম নথিভুক্ত সতীর সংখ্যা ছিল ৮৩৯। এই সংখ্যা উত্তরোত্তর বাড়তে আরম্ভ করে। এর কারণ ছিল বহুবিধ। বহুআগে স্বেচ্ছায় বা সম্মান রক্ষার কারণে নারীরা সহমরণের পথ বেছে নিলেও পরবর্তীতে জোর করা হত নারীদের।উনিশ শতকের তৃতীয় দশকে লর্ড বেন্টিংকের আমলে সতীদাহ প্রথা রদ নারীদের অধিকার রক্ষার ক্ষেত্রে একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ।

সতীদাহ প্রথা রদের বিরুদ্ধে লন্ডনের প্রিভি কাউন্সিলে মামলা শুরু হয় তখন সনাতন ধর্মের দোহাই দিয়ে এই প্রথাকে পুনর্বহাল করা সম্ভব হয়নি। রাজা রামমোহন প্রমাণ করেছিলেন সনাতন ধর্মের সতীদাহ বলে কিছুই নেই। ১৮২৯ সালের ৪ ডিসেম্বর আইন করে এই প্রথা কে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়।কিন্তু তবুও সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করা সম্ভব হয়নি সতীদাহ প্রথা। বিক্ষিপ্তভাবে তবুও ঘটে যেতে থাকে সতীদাহ।সতীদাহ প্রথা নিষিদ্ধ হওয়ার ১৫৮ বছর পরে ১৯৮৭ সালের সেপ্টেম্বর মাসের ৪ তারিখে রাজস্থানের শিকর জেলায় ১৮ বছরের তরুণী রূপ কানোয়ারকে তার স্বামীর চিতায় পুড়িয়ে মারা হয়। সে সময় ৪৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকে মামলা। যতদূর জানা যায়,রূপ কানোয়ারই ভারতে শেষ সতী।

কবে এল সতীদাহ প্রথা? এই নৃশংস প্রথার প্রচলন কবে শুরু হয় তার সঠিক তথ্য নেই। তবে আগেই আলোচনা করা হয়েছে এক সময়েই প্রথা ছিল কেবলমাত্র স্বেচ্ছায় গৃহীত। আলেকজান্ডারের ভারত আক্রমণের সময় অর্থাৎ ৩২৭ খ্রিস্টপূর্বাব্দে, আলেকজান্ডারের সঙ্গে ভারত ভ্রমণকারী গ্রীক ইতিহাসবিদ অ্যারিস্টোবুলাসের লেখায় বিধবা স্বামীর চিতায় উঠে সহমরণ বা সতীদাহ প্রথার উল্লেখ আছে। ৩১৬ খ্রিস্টপূর্বাব্দে এক গ্রিক সেনাপতির এক ভারতীয় সেনার সহমরণে যাওয়ার উল্লেখ মেলে।যাওয়ার সহমরণের ঘটনা যাই হোক না কেন, আদিকাল থেকে সতীদাহ চলে আসছে এমনটা নয়। স্বামীর সঙ্গে সতী হওয়ার সমর্থন প্রামান্য সনাতন ধর্মগ্রন্থগুলিতে মেলে না। মনুস্মৃতিতে সতীদাহ প্রথার সমর্থন ছিল না।গুপ্তযুগে সহমরণ অন্য রূপে ভারতের মহিলারা বরণ করতেন এমন তথ্য মেলে।বানভট্ট তার লেখা কাদম্বরী তে সতীদাহ প্রথার নিন্দা করেছিলেন।ডান্ডি রচিত দশকুমারচরিত বা বানভট্টের হর্ষচরিতে সহমরণের উল্লেখ রয়েছে। তাঁদের লেখায় নীতিগত বিরোধিতা করা হয়েছে এ ধরনের প্রচেষ্টার।তবুও সে সময় নারীরা স্বেচ্ছায় যে সদ্যপ্রয়াত স্বামীর সঙ্গে প্রাণ বিসর্জন করতেন তারও উল্লেখ রয়েছে। সবচেয়ে বড় উল্লেখ হর্ষবর্ধনের বোন রাজ্যশ্রীর সহমরণে যাওয়ার প্রচেষ্টা। তামিল সাহিত্য বা সঙ্গম সাহিত্য থেকে প্রথম ও দ্বিতীয় শতকে দাক্ষিণাত্যে সহমরনের অন্য রূপের বর্ণনা মেলে। গুপ্ত সাম্রাজ্য এরকম প্রথার প্রচলন পাওয়া যায়। ভারতের বাইরে ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়ায়-ও সহমরণের প্রথম মেলে।

ধীরে ধীরে সহমরণ একটি নৃশংস প্রথার রূপ নিতে থাকে। জোরপূর্বক স্ত্রীকে স্বামীর শবদেহের সাথে স্ত্রীকে জীবন্ত দগ্ধ করার প্রথা দেখা যেতে থাকে। খ্রিস্টীয় ষষ্ঠ শতকে বিক্ষিপ্তভাবে স্বামীর সঙ্গে স্ত্রীকে পুড়িয়ে মারার প্রথা চালু হতে থাকে বলেই ঐতিহাসিকরা মনে করেন। সপ্তম থেকে অষ্টম শতকের স্ত্রীকে পুড়িয়ে মারার প্রথা অল্পবিস্তর ভারতে প্রচলিত হয়ে ওঠে। আরো ২০০ বা ৩০০ বছর পরে যোদ্ধা সম্প্রদায়দের মধ্যে মূলত রাজপুতানায় সতীদাহ প্রথা রীতিমত চালু হয়ে যায় । এর সঙ্গে মর্যাদার প্রশ্ন প্রাথমিকভাবে জড়িত ছিল। বলা হয় অপমান বা সম্ভ্রমহানি থেকে রক্ষা পেতেও প্রাণ বিসর্জন বা জওহরের দিকে ঝুঁকতেন যোদ্ধা সম্প্রদায়ের বিবাহিতা বা স্বামীহারা নারীরা। কাশ্মীরে এক সহস্র বছর আগে সহমরণের প্রথা প্রচলিত ছিল বলে ঐতিহাসিকরা প্রমাণ দেখিয়েছেন। বঙ্গে উপনিবেশিক সময়ে এই প্রথার রমরমা বাড়তে থাকে।অষ্টদশ শতকেও এই প্রথা যথেষ্ট চলছিল।

কি কারন ছিল এই সহমরণ বা সতীদাহ প্রথার? আগেই উল্লেখ করা হয়েছে প্রাথমিকভাবে স্বামীর সঙ্গে মৃত্যুবরণ স্বেচ্ছা নির্ধারিত থাকলেও পরবর্তীতে সহমরণ পরিবর্তিত রূপ নেয় সতীদাহতে যেখানে পুড়িয়ে মারা হত নারীদের। এর কারণ খুঁজতে গিয়ে ঐতিহাসিক রোমিলা থাপার ইঙ্গিতবাহী ও তাৎপর্যপূর্ণ ভাবে বলেছেন, নারীদের ‘সতী’ হওয়ার প্রথার উত্থানের কারণ “পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নারীর অধস্তনতা”, “আত্মীয়তার ব্যবস্থার পরিবর্তন” এবং “নারী যৌনতার উপর নিয়ন্ত্রণ” । অন্যদিকে রাজপুত সম্প্রদায়ের মধ্যে ও উচ্চবর্ণের হিন্দুদের মধ্যে সতীদাহ প্রথা পুড়িয়ে মারার চেয়েও সম্মান রক্ষার রীতি হিসেবেই প্রচলিত ছিল। এই প্রথা যোদ্ধা শ্রেণী থেকে ব্রাহ্মণ ও অন্যান্য শ্রেণীর মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। মধ্যযুগীয় সময়ে বিধবাদের লজ্জাজনক পরিণতি থেকে মুক্তির পথ হিসেবে সতীদাহ কে পথ হিসেবে ভাবা হয়েছিল এবং এর কারণ ছিল নারীদের সমাজে ক্রমাগত পিছিয়ে পড়া অবস্থান। নারীদের সমাজে মর্যাদা এমনকী পরিবারেও ধীরে ধীরে বিরল হয়ে উঠছিল, বিধবাদের অবস্থান ছিল আরও করুণ।ঔপনিবেশিক যুগে সতীদাহ প্রথা নতুন করে ডালপালা ছড়াতে থাকে। ঔপনিবেশিক বেঙ্গল প্রেসিডেন্সিতে উল্লেখযোগ্য ভাবে মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ে সতীদাহ প্রথায় মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ে । কেন নারীদের মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়া হচ্ছিল তার বিভিন্ন ব্যাখা মেলে । তাত্ত্বিকভাবে বলা হত সতীদাহ হিন্দু ধর্মগ্রন্থ দ্বারা সমর্থিত অর্থাৎ পালনীয়।নারীদের পুরুষ শাসিত সমাজে অধীনে রাখা এবং রক্ষণশীল ভাবে তাকে বলিকাঠে চড়ানো হত তাঁর তথাকথিত ধর্ম ও শালীনতা বজায়। তবে এই যুক্তিগুলির চেয়ে অনেক বেশি বাস্তবসম্মত বা গভীর অর্থ ছিল বিধবার সম্পত্তি গ্রাস করার মধ্যে।সতীদাহ প্রথা আত্মীয় বর্গ ও প্রতিবেশীদের কাছে তাদের সম্পদ বৃদ্ধির উৎস হয়ে ওঠে । যেকোনও বিধবার স্থাবর অস্থাবর সম্পত্তি দখলের মোক্ষম একটি পথ ছিল সতীদাহ। ধর্মের অনুশাসন দেখিয়ে হিন্দু আইনের অধীনে তার মৃত স্বামীর সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হওয়ার অধিকার থাকা বিধবা নারীর অস্তিত্ব মুছে দেওয়ার পথ ছিল সতীদাহ। বহু ক্ষেত্রেই বিধবা স্ত্রী তথা প্রয়াত স্বামীর উত্তরাধিকারীকে নির্মূল করতে সাহায্য করেছিল সতীদাহ। আর এই বর্বর প্রথার বিরুদ্ধে বঙ্গ থেকে রুখে দাঁড়ানোর প্রয়াস জারি হয়।
কলকাতার হিন্দুসমাজের একাংশ ১৮১৯ সালে তৎকালীন গভর্নর জেনারেল হেস্টিংসকে সতীদাহ প্রথা রদ করতে আবেদন পেশ করেছিলেন, এবং অনেকেই এই প্রথার বিপক্ষে সোচ্চার হয়েছিলেন। ১৮২৯ সালের ৪ ডিসেম্বর ব্রিটিশ ভারতের বেঙ্গল প্রেসিডেন্সীতে সতীদাহ প্রথাকে আনুষ্ঠানিকভাবে বাতিল ঘোষণা করা হয়।এসময় বঙ্গের গভর্নর ছিলেন লর্ড উইলিয়াম বেন্টিংক। অবশ্য আইনি যে প্রক্রিয়া তা ব্রিটিশরা কার্যকর করলেও এক বাঙালি সমাজ সংস্কারক ছিলেন সতীদাহ প্রথা উচ্ছেদের মুল কান্ডারি।রাজা রামমোহন রায়ের সামাজিক আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতেই। এই নির্দেশকে মানে নি তৎকালীন সমাজের একাংশ এবং এই আইনকে চ্যালেঞ্জ করে লন্ডনের প্রিভি কাউন্সিলে মামলাও করে এই বর্বর প্রথা ধারক ও বাহকদের মুখপাত্ররা। যদিও তারা হালে পানি পায়নি।প্রিভি কাউন্সিল ১৮৩২ সালে বেঙ্গলের গভর্নর লর্ড উইলিয়াম বেন্টিংকের ১৮২৯ এর আদেশ বহাল রাখেন। খুব অল্পসময়ের মধ্যে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনে থাকা ভারতের সর্বত্র সতীদাহ প্রথাকে নিষিদ্ধ বলে ঘোষণা করা হয়। নারীদের সমাজে মূল স্রোতে ফিরে আসার একটি বড় অধ্যায় বিধবাদের বাঁচার রাস্তা করে দেওয়া। আত্মীয় ও প্রতিবেশীদের নজর এড়িয়ে,মৃত মানুষের সম্পত্তির প্রতি লুব্ধ দৃষ্টি থেকে বিধবা নারীদের বাঁচার রাস্তা করে দেয় সতীদাহ প্রথা রদ হওয়ার আইন । নারীদের ওপরে তথাকথিত জোর করে আরোপিত ‘যৌনতায় নিয়ন্ত্রণ’ ও ‘পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নারীদের অধস্তনতা’ থেকেও উনবিংশ শতকে মুক্তির প্রথম পদক্ষেপ ছিল সতীদাহ প্রথা রদ।


More Stories
আসন বাড়িয়ে সংবিধান সংশোধনী তথা মহিলা সংরক্ষণ বিল আনতে ব্যর্থ কেন্দ্র
গ্রেফতার অজি ক্রিকেট তারকা ওয়ার্ণার
জ্ঞানেশ কুমারের অপসারণ কতটা সম্ভবপর?