Home » জাতীয় ক্রীড়া দিবস ও একজন জাদুকর

জাতীয় ক্রীড়া দিবস ও একজন জাদুকর

পুরন্দর চক্রবর্তী,সময় কলকাতা ,২৮ আগস্ট : ভারতের জাতীয় ক্রীড়া দিবস প্রতি বছর ২৯ আগস্ট দিনটিতে পালিত হয়। দিনটি হকির জাদুকর মেজর ধ্যানচাঁদ সিংয়ের জন্মবার্ষিকী স্মরণে উদযাপন করা হয়।জাতীয় ক্রীড়া দিবস সমস্ত ভারতবাসীর কাছে ক্রীড়াবিদদের অবদান, সংকল্প এবং অসাধারণ কৃতিত্ব এবং সমাজ গঠনে তাদের প্রভাব স্মরণ করার কাজ করে।প্রথম জাতীয় ক্রীড়া দিবস পালিত হয়েছিল ২০১২ সালের ২৯আগস্ট এবং তাই এই বছর রাষ্ট্রীয় ক্রীড়া দিবসের দ্বাদশ তম বার্ষিকী।

এবারের জাতীয় ক্রীড়া দিবস উদযাপনের মূল প্রতিপাদ্য হচ্ছে “খেলাধুলা একটি সঠিক এবং উপযুক্ত সমাজের জন্য একটি সক্ষমতা”।

ভারতের জাতীয় ক্রীড়া দিবসের শিকড় লুকিয়ে আছে মেজর ধ্যানচাঁদ সিং-এর মধ্যে , ভারতের সবচেয়ে সম্মানিত ক্রীড়া কিংবদন্তিদের একজন, যিনি হকি খেলার সমার্থক হয়ে উঠেছিলেন।তিনি হকিতে তাঁর শিল্পের মধ্যে দিয়ে মুগ্ধতা এনে দিয়েছিলেন। তাঁর হকির স্টিক ওয়ার্ক এবং গেম সেন্সের মাধ্যমে হকির বিশ্বকে শাসনও করেছিলেন যা তাকে হকির জাদুকর -‘হকি উইজার্ড’ এবং ‘দ্য ম্যাজিশিয়ান’ উপাধিতে ভূষিত করেছিল। ২৯ আগস্ট জন্মদিন তাঁর। ১৯০৫ সালে প্রয়াগে জন্ম ।তাঁর জন্মদিন স্মরণ করে এদিনটিকে জাতীয় ক্রীড়া দিবস হিসেবে পালন করা হয়। এদিন খেলার বিভিন্ন পুরস্কারে ভুষিত হন দেশের সেরা ক্রীড়াবিদ ও ক্রীড়াব্যক্তিত্বরা।কেন এত সুনাম তাঁর? প্রতিভা আর পরিশ্রম দিয়ে ভারতকে জগৎসভায় শ্রেষ্ঠ করে তুলেছিলেন তিনি। পৃথিবী ভারতকে চিনত হকির দেশ হিসেবে, হকির জাদুকরের দেশ হিসেবে।শোনা যায়,দিনের বেলা কর্মজীবনের ডিউটি সেরে চাঁদের আলোর অপেক্ষা করতেন ধ্যানচাঁদ যার প্রকৃত নাম ধ্যান সিংহ।সেনাবাহিনীর ধ্যান সিংহ চন্দ্রালোকিত রাতের অপেক্ষা করতেন হকির স্টিক হাতে, রাতে চাঁদের আলোয় হকির অনুশীলন করবেন।সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়েছিলেন অল্প বয়সে, দিনে সুযোগ পেলেই অনুশীলন করতেন কিন্তু সবসময় কাজের ফাঁকে অনুশীলনের অবকাশ পেতেন না। অথচ তাঁর লক্ষ্য ছিল আরও নিখুঁত হওয়া। সেসময় মাঠে ময়দানে বিদ্যুৎ বাতি আর আলোর রোশনাই তো ছিল না তাই অপেক্ষা করতে হত মাসে কয়েকটি চন্দ্রালোকিত রাতের। চাঁদের আলোয় অনুশীলন করার জন্য মেজর ধ্যান সিংহকে ধ্যানচাঁদ নাম দেয় সহকর্মীরা ।বিফলে যায় নি পরিশ্রম।হকির বল তাঁর বশ্যতা স্বীকার করেছিল যা আঠার মত আটকে থাকত তাঁর হকিস্টিকে।পরবর্তীতে বিশ্বকে মন্ত্রমুগ্ধ করেন ধ্যানচাঁদ।

পরিশ্রমের পাশাপাশি ঈশ্বরদত্ত প্রতিভা ‘হকির জাদুকর’ করে তুলেছিল ধ্যানচাঁদকে। দেশকে হকিতে অসংখ্যবার গৌরব এনে দিয়েছেন। প্রথম শ্রেণীর প্রতিযোগিতামূলক হকিতে প্রায় ৫০০ গোল করেছেন তিনি। তিনবার অলিম্পিকে ভারতের সোনা জেতার কারিগর তিনি।
১৯২৮ থেকে ১৯৫৬ হকিতে স্বর্নযুগ ছিল ভারতের। টানা ছবার সোনা জেতে ভারত। কথিত আছে ১৯৩৬ সালে বার্লিনে শেষ যেবার তিনি অলিম্পিকে তাঁর হকির যাদু দেখিয়েছিলেন, সেবার তাঁর স্টিকওয়ার্ক দেখে মন্ত্রমুগ্ধ হন স্বয়ং হিটলার। ধ্যানচাঁদকে নাকি নাগরিকত্ব দিতেও চেয়েছিলেন তিনি । সত্যি ও কল্পনার মিশেলে কত কথা তাঁকে ঘিরে! তবে ভারত ১৯৫৬ সালের পরে দ্রুত তাঁদের হকির আধিপত্য হারাতে থাকে। ১৯৬৪ সালের পরে আর একবারই অলিম্পিকে সোনা যেতে ভারত। ভারতের ব্যর্থতা বিষন্ন করত ।১৯৮০ মস্কো অলিম্পিকের সোনাজয় দেখে যাওয়া হয় নি তাঁর।লিভারের অসুখে ভুগছিলেন, ১৯৭৯ সালে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন ধ্যানচাঁদ। একরাশ হতাশা বুকে নিয়ে চলে যান তিনি। অর্থ তাঁকে শেষ দিকে অসুবিধায় রেখেছিল, কিন্তু রোগ বা অর্থের অভাব নয়, তাঁকে প্রকৃত পীড়া দিয়েছিল ভারতীয় হকির মানের অবনমন। মন্ট্রিওল অলিম্পিকে ভারত চূড়ান্ত খারাপ ফল করায় তিনি বলেছিলেন, খেলোয়াড়দের নিষ্ঠা নেই, ভারতের হকি ‘খতম’ হয়ে গেছে। সত্যি তো, হকিতে চাঁদের আলোর দিন আর নেই। বিগত চল্লিশ বছরে অলিম্পিকে ভারত সেরা হতে পারে নি। শোনা যায়, হকি নিয়ে হতাশার কথা উচ্চারণ করতে করতেই তারার দেশে চলে যান হকির জাদুকর । তাঁর মৃত্যুর বহুবছর পরেও তাঁর যৌবনের গৌরবগাঁথা আর তাঁর শেষের দিনের আক্ষেপ চর্চায় মনে হয় – তিনি আকাশের চাঁদ হয়ে আজও যেন ভারতের হকির অস্তমিত গৌরব ফিরে পাওয়ার আশায় মর্ত্যলোকের দিকে তাকিয়ে আছেন। যে ক্রীড়াবিদের জীবন-যৌবন-মৃত্যু সবকিছুর সঙ্গে জড়িয়ে আছে খেলা, ভারতের গৌরব জড়িয়ে আছে যার সাথে, তাঁর জন্মদিন ছাড়া জাতীয় ক্রীড়া দিবস পালনের সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব ছিল না।

About Post Author