Home » ইস্টবেঙ্গলের গোলমেশিন ফ্রেড পুগসলে : ভারতে প্রথম বিদেশী ফুটবলার

ইস্টবেঙ্গলের গোলমেশিন ফ্রেড পুগসলে : ভারতে প্রথম বিদেশী ফুটবলার

সময় কলকাতা ডেস্ক, ১৫ সেপ্টেম্বর : ভারতীয় ফুটবলের ইতিহাস দীর্ঘদিনের। গোরা সাহেবরা  এদেশে ফুটবল চালু করলেও নগেন্দ্র সর্বাধিকারীর মত মানুষদের  সৌজন্যে পায়ে পায়ে ভারতীয় ফুটবল প্রায় দেড়শো বছর হতে চলল। ভারতীয় ফুটবলে  অসামান্য অবদান  রয়েছে অথচ অনেকের নামই উচ্চারণ করা হয় না । আনসাং হিরো হয়েই তাঁরা থেকে গিয়েছেন। এরকমই একজন হলেন অ্যাংলো-বার্মিজ ফ্রেড পুগসলে  । চার বছর ইস্টবেঙ্গলের হয়ে  কলকাতা মাঠ কাঁপিয়েছেন ফ্রেড পুগসলে। তাঁকেই বলা হয় ভারতের  প্রথম বিদেশী ফুটবলার।

১৯৪২ সালে ভারতের প্রতিবেশী দেশ বার্মা যা বর্তমানে মায়ানমার, থেকে কলকাতায় এসেছিলেন ফ্রেড পুগসলে। তাঁর মত গোলমেশিন আগে কখনও ময়দান দেখে নি। ইস্টবেঙ্গলের হয়ে চারটি মরশুম তিনি খেলেছিলেন। তিনি ১৯৪৫ রোভার্স কাপে এক ম্যাচে ইস্টবেঙ্গলের হয়ে  একাই আট গোল করেছিলেন  যা আজও সর্বভারতীয় মেজর টুর্নামেন্টে আজও  রেকর্ড। ৭৮ বছর কেটে গেলেও সেই রেকর্ড অক্ষত। ১৯৪৬ সালে বার্মা ফিরে যান তিনি।

ফ্রেড পুগসলে ভারতে এসেছিলেন ভাগ্যতাড়িত হয়ে এবং বিপর্যস্ত হয়ে। ব্রিটিশ শাসিত বার্মায় একটি অ্যাংলো-বার্মিজ পরিবারে তিনি জন্মগ্রহণ করেন।শৈশবের দিনগুলিতে, যা ছিল তার আকর্ষণ ও প্রথম প্রেম তাকেই জীবনে সঙ্গী করে নেন পুগসলে এবং পরে ১৯৩০  এর দশকের শেষের দিকে রেঙ্গুন-ভিত্তিক একটি স্থানীয় অপেশাদার ক্লাবে যোগদান করেন।

১৯৩৯ থেকে ১৯৪২ সাল পর্যন্ত এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শুরুতে, বার্মা যখন একটি ব্রিটিশ উপনিবেশ ছিল পুগসলে পরিবারের বাসস্থান ও এলাকা  জাপানি বাহিনীর দ্বারা আক্রান্ত হয় । প্রাণে বাঁচতে আরও অনেক বার্মিজ মানুষের সাথে ১৯৪২ সালে প্রতিবেশী দেশ অখণ্ড ভারতে চলে যেতে বাধ্য হন অসহায় পুগসলে। যাত্রাপথ ছিল অত্যন্ত কঠিন।শরণার্থী হয়ে ৫০০ কিলোমিটার সম্পূর্ণ পায়ে হেঁটে, ঘন বন, পাহাড়ের উপর দিয়ে এবং নদী পেরিয়ে মণিপুর হয়ে ভারতে আসেন তিনি।  তাঁর সঙ্গীদের মধ্যে  বেশ কয়েকজন পথেই মারা যান এবং যারা বেঁচে ছিলেন তাদের অনেকেই আহত বা গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন।পুগসলে কন্যা ও মেয়ের হাত ধরে ভারতে কোনওক্রমে পৌঁছে গেলেও ভারত তার কাছে ছিল অজানা। তিনি ছিলেন অসহায়। অবশেষে ফুটবলের মক্কা কলকাতায় এসে পৌঁছে যান তিনি।

পেটের টান ও ফুটবল ভালোবাসার তাগিদে ১৯৪২ সালে তিনি ইস্টবেঙ্গল কর্মকর্তাদের কাছে  গিয়ে  তাঁকে একবার সুযোগ দিতে বলেন। দীর্ঘদিন অর্ধভুক্ত , পথশ্রমিক ক্লান্ত ও পরিশ্রান্ত , সর্বোপরি দুর্বল পুগসলেকে দেখে ভরসা পাচ্ছিলেন না ইস্টবেঙ্গল কর্মকর্তারা। তবুও তাঁকে সুযোগ দিতেই তিনি  খেলোয়াড় হিসেবে নিজের জাত ও দক্ষতা প্রমাণ করেন। সম্পূর্ণ সুস্থ হতে তার কিছু সময় লেগেছিল। তারপরে যতদিন ভারতে ছিলেন ইস্টবেঙ্গলের  হয়ে বিপক্ষের ত্রাস হয়ে উঠেছিলেন পুগসলে। তাঁর ৪৮ টি গোলের নিশ্চিত ভাবে হিসেব পাওয়া গেলেও , আরও বেশি গোল তিনি ইস্ট বেঙ্গলের হয়ে করেছিলেন  বলেই মনে করা হয়।১৯৪২ থেকে ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত ইস্টবেঙ্গলের স্বর্ণযুগে, দুবার কলকাতা লিগ ও দুবার আইএফএ শিল্ড জেতার পেছনে তাঁর প্রধান অবদান ছিল। মজিদ বিশকারের আগে ভারতীয় ফুটবলে এরকম প্রভাব কোনও বিদেশী ফুটবলার ফেলেন নি।

১৯৪৬ সালে দেশের পরিস্থিতি শান্ত হলে তিনি ফিরে যান রেঙ্গুনে যা বর্তমানে ইয়াঙ্গুন। তিনি দেশে ফিরতেই ভারতজুড়ে  বিভিন্ন ক্লাবের  রক্ষণভাগের খেলোয়াড়দের রাতের ঘুম ফিরে আসে। ১৯৫৮ সালে নিজের দেশেই বছর চল্লিশের ফ্রেড পুগসলে অসময়ে প্রয়াত হন।।

About Post Author