Home » পঞ্চগ্রাম : সম্প্রীতির দুর্গা,উত্তরণের দিশা

পঞ্চগ্রাম : সম্প্রীতির দুর্গা,উত্তরণের দিশা

সময় কলকাতা ডেস্ক, ৮ অক্টোবর :  পুজো চলেই এল। শরতের নীল আকাশ, কাশবনে হিন্দোল আর আর শিউলি ফুলকে সঙ্গে নিয়ে মা আসছেন মর্ত্যলোকে। মহালয়া সমাগত। পরম্পরা মেনে হবে মা দুর্গার আরাধনা। এই পরম্পরা আজকের নয়। সেই যে ৮৮৭ বঙ্গাব্দে যুদ্ধজয়ের উৎসব উদযাপন করতে রাজা কংস নারায়ণ অধুনা বাংলাদেশের রাজশাহীর তাহেরপুরে দুর্গাপূজো শুরু করেছিলেন তা আজ ছড়িয়ে পড়েছে বিশ্বময় । তবে কিনা প্রথমদিকে অখণ্ড বঙ্গে দুর্গাপুজো হত শুধুমাত্র রাজা,জমিদার, ধনী তথা বনেদি বাড়িতে ।ক্রমেই বারোয়ারি পুজোর ও সার্বজনীন পুজোর চল শুরু হয়। অধিকাংশ বনেদি বাড়ীর পুজোই ২০০ বা ৩০০ বছর আগেকার। বারোয়ারি পূজোর প্রবর্তন হয় হুগলির গুপ্তিপাড়াতে। ১৭৯০ খ্রিস্টাব্দে ১২ জন বন্ধু মিলে শুরু করেছিলেন দুর্গাপুজো। বারো ইয়ারি থেকে বারোয়ারি কথাটি চলে আসছে। বিংশ শতকে জনপ্রিয়তা পায় সর্বজনীন দুর্গোৎসবের যা মূলত বিংশ শতকের প্রথম দশকে শুরু হয়েছিল । ধীরে ধীরে সর্বজনীন দুর্গোৎসব বাংলার নগর ছাড়িয়ে গ্রামগঞ্জেও শুরু হয় । পাড়ায় পাড়ায় আর বিভিন্ন ক্লাবের উদ্যোগে সর্বজনীন দুর্গোৎসবের সংখ্যা এ মুহূর্তে অগণন । তার মধ্যেও বেশ কিছু পুজো তার বিশেষত্বে দর্শককে মুগ্ধ করে বিশেষভাবে।আর যখন পুজোর মধ্যে বয়ে যায় সম্প্রীতির সুবাতাস তখন পুজো অন্য মাত্রা পায়। আর এরকমই এক পুজোর ছবি দক্ষিণ দিনাজপুর জেলার কুমারগঞ্জ ব্লকের পঞ্চগ্রামে। এখানে একই বৃন্তে দুটি কুসুম হিন্দু ও মুসলিম হাতে হাত ধরাধরি করে আয়োজন করে দুর্গাপুজোর।

পুজো এসেছে, দুর্গাপুজোর আবহে অনেক মলিনতা মুছে যাচ্ছে। বিভেদ ঘুচে যাওয়ার লগ্ন দুর্গাপুজো। সম্প্রীতির ও মহামিলনের উজ্জ্বল কোলাজ রয়েছে এই বঙ্গে ছড়িয়ে ছিটিয়ে।মহামিলনের উৎসবমুখর পথ ধরেই দুর্গাপুজোয় ” ধর্ম যার যার উৎসব সবার ” কথাটি ব্যাপ্তি পেয়ে ধর্ম যার যার উৎসব সবার হয়ে ভেসে আছে দক্ষিন দিনাজপুর জেলার কুমারগঞ্জ ব্লকের উদয় গ্রাম পঞ্চায়েতের পঞ্চগ্রামের আকাশে বাতাসে । ৩৫ বছর ধরেই এই গ্রামে হিন্দু মুসলিম দুই সম্প্রদায়ের মানুষজন মিলেমিশে দুর্গাপুজোর আয়োজন করে থাকেন । এই বাংলার সনাতন পুজোর সম্প্রীতির এক অনন্য নজির বাহক পঞ্চগ্রাম । এই গ্রামের বর্তমান পুজোর উদ্যোক্তা যুগ্মভাবে দুই সম্প্রদায়ের মানুষ। তাঁরা জানিয়েছেন, আগে এই গ্রামে কোনও পুজো হত না।কিন্তু পুজো উপলক্ষে যারা কাজ বা অন্য সুত্রে দুরদুরান্তে থাকতেন তারা ছুটিতে গ্রামে এলেও পুজোতে সামিল হতে না পারায় বাঙালির সর্ববৃহৎ উৎসবের আমেজ ও আনন্দ তাঁরা পেতেন না। সেই দুঃখ থেকে মুক্তির পথ খুঁজে বের করেন তাঁরাই।সেদিকে লক্ষ রেখেই বছর ৩৫ আগে গ্রামের সঞ্জয় রাহা ও খলিশ্রুতের নেতৃত্বে দুই সম্প্রদায়ের মানুষ মিলে এই পুজো শুরু হয়।

সেই যে শুরু তা এখনও দুই সম্প্রদায়ের মানুষজন মিলেই চলে আসছে। চাদা তোলা থেকে প্যান্ডেল গড়া ও অনান্য কাজে হাত লাগানোর মধ্যে দিয়েই দুই সম্প্রদায়ের এই সম্প্রীতির পুজো জেলার মানুষের নজর কেড়ে নিয়েছে। যা এখন সরকারি পর্যায়েও স্বীকৃতি ও সরকারি সাহায্য আদায় করে নিতে সক্ষম হয়েছে বলে তারা জানিয়েছেন।পাশাপাশি পুজো উপলক্ষে এই গ্রামে রেশ পুজোর পরে থাকে। পুজোর সাংষ্কৃতিক পালা গানের অনুষ্ঠান ছাড়াও মেলা বসে । গ্রামের দুই সম্প্রদায়ের মানুষজন মিলে মিশে আনন্দে উপভোগ করেন পুজোর এই চারদিন। দশমী বিদায়ের সুর বয়ে নিয়ে আসে। প্রতিমা নিরঞ্জন হওয়ার পরে, মিলন মেলা সাঙ্গ হলে দুই সম্প্রদায়ের মানুষজন তাকিয়ে থাকে আগামী বছর মা দুর্গার আগমনের দিকে। উভয় সম্প্রদায়ের মিলন উৎসব হয়ে দুর্গাপুজো শরৎকালে ফিরে আসে বারবার- ঢাকের বাজনা, কাশফুল আর শিউলিফুলকে সঙ্গে নিয়ে।

তারাশঙ্কর বন্দোপাধ্যায় তাঁর পঞ্চগ্রাম উপন্যাসে যে গ্রামীণ বঙ্গের ছবি তুলে ধরেছিলেন তা হাজার হাজার বছর ধরে অকৃত্রিম। জীবনের দুঃখ কষ্টের মাঝে দিনশেষে, গ্রামের চণ্ডীমণ্ডপের চাতালে সবাই সমবেত হয়ে আনন্দের অনুসন্ধানই ছিল সেই উপন্যাসের উপজীব্য ।একইরকম তাৎপর্যপূর্ণভাবেই হাজারবছর ধরে গ্রাম বাংলার অভিন্ন জীবনধারা ফুটে উঠেছে দক্ষিণ দিনাজপুরের গ্রাম পঞ্চগ্রামেও। বঙ্গের বৃন্তের দুটি কুসুমের মধ্যে যুগ যুগ ধরে চলে আসা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি যা বিভেদ ও হানাহানির কারণে কোথাও কোথাও ক্ষুন্ন হয় তার থেকে উত্তরণের দিশা দিয়েছে দক্ষিণদিনাজপুরের পঞ্চগ্রাম। মাধ্যম – দশভূজার বন্দনা।

ধর্ম যার যার উৎসব সবার কথাটুকু স্রেফ কেতাবি হয়ে থাকে অধিকাংশ সময়। সেখান থেকে উত্তরণ ঘটে না আমাদের। হানাহানি আর বিভেদের বাতাবরণে পুজোর অর্থ সংকুচিত হতে থাকে। দুর্গা পুজোর মাহাত্ম্য যে অসুর নাশ যার অর্থ অশুভ বিনাশ তার প্রকৃত দিশা দেখাচ্ছে দক্ষিণ দিনাজপুরের পঞ্চগ্রাম। দুর্গাপুজোর মধ্যে দিয়ে সম্প্রীতি আর ভালোবাসার পথে উত্তরণের দিশা দেখাচ্ছে পঞ্চগ্রামের জাত ভেদাভেদহীন দুর্গাপুজোর আয়োজকরা।

About Post Author