সময় কলকাতা ডেস্ক, ২৪ অক্টোবর :গোয়েন্দা বই পড়তে কে না ভালোবাসে? পুরোনো বিদেশী গোয়েন্দা বইয়ের বলতে আজকের পাঠকরা মূলত বোঝেন আর্থার কোনান ডায়ালের শার্লক হোমস বা আগাথা ক্রিষ্টির এরকুল পোয়ারো বা মিস মার্পেল কিন্তু গোয়েন্দা সাহিত্য সৃষ্টির সময় থেকে অসংখ্য বিদেশী লেখক জনপ্রিয় রচনা লিখে গিয়েছেন। এদের মধ্যে অন্যতম লেখক হলেন রবার্ট লেসলি বেলাম। আমেরিকান লেখক রবার্ট লেসলির গোয়েন্দা চরিত্র ড্যান টার্নার ছিলেন অত্যন্ত জনপ্রিয়। চল্লিশের দশকে ড্যান টার্নারকে নিয়ে লেখা বইগুলি বেশ সাড়া ফেলে। বাংলা গোয়েন্দা রচনার সঙ্গে ইংরেজি গোয়েন্দা সাহিত্যের একটি দারুণ মিল রয়েছে। বাংলায় শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের ব্যোমকেশ, সত্যজিৎ রায়ের ফেলুদা এবং নীহাররঞ্জন গুপ্তের কিরীটি বেশি জনপ্রিয়। এরা ছাড়া অবশ্যই বিভিন্ন জনপ্রিয় ও শক্তিশালী লেখকের হাত ধরে বিভিন্ন গোয়েন্দা এসেছেন। কিন্তু সাধারণভাবে মানুষ বাঙালি গোয়েন্দা বলতে এই তিনজনকেই চেনেন। তবুও সর্বকালীন জনপ্রিয়তার নিরিখে এঁদের সঙ্গে পাল্লা দিতে পারেন একজনই। তিনি স্বপন কুমারের গোয়েন্দা চরিত্র দীপক চ্যাটার্জি। স্বপনকুমার তাঁর গোয়েন্দা গল্পে দুই যুগ সময় ধরে জনপ্রিয়তার নিরিখে আকাশ ছুঁয়েছিলেন। ছত্রে ছত্রে ছিল রোমাঞ্চ আর উত্তেজনা।
“এক হাতে উদ্যত পিস্তল, অন্য হাতে জ্বলন্ত টর্চ ” – ১৯৫৩ সালে ‘অদৃশ্য সংকেত’ গ্রন্থে সাড়া ফেলে আবির্ভাব হয়েছিল গোয়েন্দা দীপক চ্যাটার্জির। গ্রন্থকার হিসেবে বাঙালির কাছে নতুন স্বাদ বয়ে নিয়ে আসলেন স্বপন কুমার।তিনি তিন দশকের আগে প্রায় হাজারখানেক লেখা উপহার দিয়েছেন পাঠকদের। বইগুলি ছিল ৪৮ থেকে ৬৪ পাতার। গোয়েন্দা দীপক চ্যাটার্জি ও তার সহকারী রতনলালের আকর্ষণ আজও রয়ে গিয়েছে। কাজ করছে নস্টালজিয়া। সেযুগে গোয়েন্দা গল্পে বিপ্লব আনা স্বপন কুমার খালি রহস্য সমাধানে আটকে থাকেননি। স্বপন কুমার অবশ্য তাঁর ছদ্মনাম। গোয়েন্দা গল্প দিয়ে শুরু করেছিলেন -জ্যোতিষশাস্ত্র, চিকিৎসা বিজ্ঞান, হোমিওপ্যাথি, মোটর ড্রাইভিং, সবজি চাষ ইত্যাদি বহুবিদ ধরনের বই লিখেছেন তিনি। নিজ নামে লিখেছেন, ছদ্মনামে লিখেছেন। জ্যোতিষ বিষয়ে শ্রীভৃগু নামে লিখে খ্যাতি পেয়েছেন। জ্যোতিষ চর্চাও করেছেন এক সময়ে। এতসব বিষয়ে লিখতে গিয়ে বইয়ের স্বত্ব, রয়্যালিটি ইত্যাদি বিষয়ের ধার ধারেননি।
বর্তমান প্রজন্মে তাঁর পরিবারের মানুষজনের কাছ থেকে জানা যায়, সেভাবে পাদপ্রদীপের আলোয় না থাকার জন্য তাঁর ব্যক্তিগত মনোকষ্ট ছিল। কিন্তু তিনি যখন লিখেছেন তখন সাহিত্যমূল্য পাওয়ার জন্য তিনি লেখেন নি। গোয়েন্দা রহস্যের বিরাট পটভূমিকা তৈরি করেন নি, জটিল প্লট তৈরি করেন নি।আর এখানেই তাঁর মিল রবার্ট লেসলি বেলামের সঙ্গে। তিনি পাল্প ফিকশন লিখতেন। রচনার সময়কাল ছিল স্বপনকুমারের এক দশক আগেl হলিউড গোয়েন্দা ড্যান টার্নারের সৃষ্টির পাশাপাশি লেখক হওয়ার আগে তিনি লস অ্যাঞ্জেলেসে সংবাদপত্রের রিপোর্টার, রেডিও ঘোষক এবং চলচ্চিত্রের অতিরিক্ত হিসেবে কাজ করেছিলেন। রবার্ট লেসলির মত স্বপনকুমার ও পেশা হিসেবে একাধিক ক্ষেত্রকে বেছে নেওয়া এবং পাল্প ফিকশন বা স্বল্প দৈর্ঘ্যের গোয়েন্দা, সাসপেন্স, থ্রিলার রচনাকে জনপ্রিয় করে তুলেছিলেন। এবং তাঁদের দুজনের কেউই সেঅর্থে সাহিত্যিক খ্যাতি পান নি।
স্বপনকুমারের প্রকৃত নাম ছিল সমরেন্দ্র নাথ পান্ডে। কনৌজ-ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্ম। জন্মভিটে রাজশাহী। চিকিৎসক হতে চেয়েছিলেন, অর্থাভাবে হওয়া হয়নি। স্বপনকুমার, শ্রীভৃগু বা সমরেন্দ্র নাথ পান্ডে – যে নামেই তাঁকে ডাকা হোক – তিনি সারাজীবন সংগ্রাম করেছেন, খ্যাতি আসে নি। তাঁর রচনার সাহিত্যমূল্য নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে তথাপি বাংলা গোয়েন্দা রচনায় দিগন্ত খুলে দিয়েছেন স্বপনকুমার। ২০০১ সালে তিনি প্রয়াত হন। বেঁচে থাকলে ২০২৩ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর ৯৬ বছর পূর্ণ করতেন দীপক চ্যাটার্জির স্রষ্টা স্বপনকুমার। তিনি নেই কিন্তু নস্টালজিয়া রয়েই গিয়েছে।।


More Stories
রবীন্দ্রনাথের পরলোক চেতনা ও প্রেতচৰ্চা
অভিনেতাদের কাছে সেরা-টুকু নেওয়ার মাস্টার আর্ট ছিল সত্যজিৎ রায়ের জানা
বাংলা নববর্ষের ইতিহাস