Home » হাংরি জেনারেশন আন্দোলনের অন্যতম কবি মলয় রায়চৌধুরী প্রয়াত

হাংরি জেনারেশন আন্দোলনের অন্যতম কবি মলয় রায়চৌধুরী প্রয়াত

সময় কলকাতা ডেস্ক,২৮ সেপ্টেম্বর :হাংরি জেনারেশন সাহিত্য আন্দোলনের অন্যতম প্রবক্তা তথা প্রখ্যাত এবং একই সাথে একসময় প্রবল বিতর্কিত কবি  মলয় রায়চৌধুরী শুক্রবার ৮৪ বছর বয়সে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন।”..গভীর শোক এবং অপরিসীম দুঃখের সাথে আমি আপনাকে জানাচ্ছি যে আমার বাবা, মলয় রায়চৌধুরী আজ সকালে মারা গিয়েছেন । তাঁর স্মৃতির আশীর্বাদ হোক এবং তাঁর আত্মা সদগতি লাভ করুক,” কবির পুত্র তাঁর ফেসবুক অ্যাকাউন্টে পোষ্ট করেন ও তাঁর মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করে জানানো হয়, যদিও মৃত্যুর কারণ নিশ্চিত করে জানানো হয়নি।১৯৬৫ সালে  ভারতীয় দণ্ডবিধির ১২০(বি), ২৯২ এবং ২৯৪ ধারায় যে ১১ জন কবির বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হয়েছিল এবং যে ৬ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছিল তাঁদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন মলয় রায়চৌধুরী। বাকি সবাই পরবর্তীতে ছাড়া পেয়ে গেলেও রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র ও সাহিত্য রচনায় অশ্লীলতার দায়ে ১৯৬৭ পর্যন্ত জেলে বন্দি ছিলেন মলয় রায়চৌধুরী।

৭০টিরও বেশি বইয়ের লেখক, মলয় রায় চৌধুরী পশ্চিমবঙ্গের ছাতনায় বনেদি সাবর্ণ রায় চৌধুরী পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছিলেন, যে পরিবারের সঙ্গে বাঙালির বহু ঐতিহ্য জড়িয়ে আছে।তার বাবা,  ছিলেন একজন চিত্রগ্রাহক এবং তার মা অমিতা রায় চৌধুরীর রক্তে ছিল উনবিংশ শতকের  বাঙালি নবজাগরণের রূপকার অন্যতম প্রগতিশীল একটি পরিবারের ঐতিহ্য।

তাঁর দাদা, লক্ষ্মীকান্ত রায় চৌধুরী, কলকাতার একজন চিত্রগ্রাহক ছিলেন যিনি লাহোর মিউজিয়ামের কিউরেটর রুডইয়ার্ড কিপলিং-এর বাবার কাছ থেকে প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন।১৯৬০ এর দশকের গোড়ার দিকে, হাংরিয়ালিজম সহ-প্রতিষ্ঠালাভ করে সাহিত্য ও রাজনৈতিক কর্তৃত্বের প্রতিক্রিয়ায় একটি শৈল্পিক আন্দোলন।আর এই আন্দোলননের সঙ্গে জড়িয়ে ছিলেন মলয় রায় চৌধুরী।আন্দোলনের ইংরেজি নামটি জিওফ্রে চসারের লাইন “ইন দ্য সোয়ার হাংরি টাইম” থেকে নেওয়া হয়েছিল এবং এর দর্শনটি অসওয়াল্ড স্পেংলারের “দ্য ডিক্লাইন অফ দ্য ওয়েস্ট” এর উপর ভিত্তি করে তৈরি হয়েছিল।

১৯৫৯-৬০ সালে ইতিহাসের দর্শন এবং মার্ক্সবাদের উত্তরাধিকার  লেখা নিয়ে কাজ করার সময় হাংরি আন্দোলনের প্রয়োজন মলয় রায়চৌধুরী অনুভব করেন, ষাটের দশকে শুরু হয় আন্দোলন যা প্রবলভাবে বাংলা সাহিত্য সংস্কৃতিকে নাড়া দিয়েছিল।সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়, উৎপলকুমার বসু, সুবিমল বসাক, ত্রিদিব মিত্র, ফালগুনী রায়, আলো মিত্র, রবীন্দ্র গুহ, সুভাষ ঘোষ, প্রদীপ চৌধুরী, সুবো আচার্য, অরুপরতন বসু, বাসুদেব দাশগুপ্ত, সতীন্দ্র ভৌমিক, শৈলেশ্বর ঘোষ এই আন্দোলনে মিশে ছিলেন। শক্তি চট্টোপাধ্যায় এই আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত থাকলেও পরবর্তীতে এই আন্দোলন থেকে তিনি বেরিয়ে যান আন্দোলনের অভিমুখ তার পছন্দ না হওয়ায়। পরবর্তীতে এই আন্দোলনের কবিরা এমন সব কবিতা লিখতে থাকেন যেখানে যৌনতার বর্ণনা এমনভাবে উঠে আসে যা বাংলা সাহিত্যে আগে হয়নি।  অথচ সাহিত্যে মনের ভাব প্রকাশের ক্ষুধা, যথার্থ শব্দ প্রয়োগের ক্ষুধা, সৃষ্টির আকাঙ্ক্ষা আর অবদমিত বাসনা পূরণের ক্ষুধা থেকে এই আন্দোলন তৈরি হয়েছিল। মন্ত্রী, বিধায়ক, সাংবাদিক, প্রথাগত সাহিত্যকে আক্রমণ করা হয়েছিল। মুখ্যমন্ত্রীকে আক্রমণ করেও কবিতা লেখা হয়। ১৯৬৩ থেকে ১৯৬৫ পর্যন্ত এই আন্দোলন জোরদার হলেও ১৯৬৫ সালে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হয় একঝাঁক কবিদের বিরুদ্ধে এবং সেখানে মলয় রায়চৌধুরীর কবিতার বিরুদ্ধে ওঠে অশ্লীলতার অভিযোগ। মলয় রায়চৌধুরী ছাড়া পেলেও নিভে যায় আন্দোলনের তীব্রতা। সাহিত্যের প্রচলিত ধারণায় আঘাত করা এই আন্দোলন বাংলা সাহিত্যকে প্রকারান্তরে উপকৃত করেছিল বলেই মনে করেন আজকের সাহিত্য সমালোচকরা। মলয় রায়চৌধুরীর সঙ্গে সঙ্গে বাংলা সাহিত্যের একটি অধ্যায়ের অবসান হল।।

About Post Author