Home » অধীর-গড়ে কি কাপ জিততে পারবেন পাঠান?

অধীর-গড়ে কি কাপ জিততে পারবেন পাঠান?

পুরন্দর চক্রবর্তী, সময় কলকাতা,৭ জুন : চেন্নাইয়ে ২৬ তারিখ আইপিএল ফাইনাল হওয়ার ঠিক ন দিনের মাথায় সারাদেশ জেনে যাবে ভারতে সরকার কে গড়ছে, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আবার কি শপথ নেবেন নরেন্দ্র মোদি?  ঠিক সেদিন আরও একটি কেন্দ্রে ভাগ্য নির্ধারিত হবে এমন দুই প্রতিদ্বন্দ্বী দলের প্রার্থীর যাদের একজন ভারতের এক প্রবীণ রাজনৈতিক নেতা ও অপরজন তারকা প্রার্থী। একজন হলেন কংগ্রেস নেতা অধীর রঞ্জন চৌধুরী।  তিনি টানা পাঁচবার এই কেন্দ্র থেকে জয়ী হয়ে সাংসদ, ১৯৯৯ সাল থেকে জিতেই চলেছেন। প্রথমে আরএসপি তথা বামেদের প্রায় নিশ্চিহ্ন করে ফেলেন বহরমপুরের মানচিত্র থেকে। তারপরে আবার, তৃণমূলের বিরুদ্ধে টানা জিতেছেন। পাঁচবারই রাজ্যের শাসক দলের প্রার্থীরা তাঁর কাছে হার মেনেছে। এবং মার্জিন খুব একটা কম ছিল না। ২০১৯ সালেই একমাত্র তৃণমূলের অপূর্ব সরকার কিছুটা হলেও তাঁকে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতার মুখে দাঁড় করিয়েছিলেন।অধীর চৌধুরীর এবারের প্রতিদ্বন্দ্বী মূলত দুজন। একজন বিজেপির নির্মল কুমার সাহা, কিন্তু অপরজন এই মুহূর্তে তুমুলভাবে আলোচিত। রাজনৈতিক ক্ষেত্রে তিনি নবীন কিন্তু ভারতময় জনপ্রিয়তা। তাঁর নাম ইউসুফ পাঠান। ১৬ বছর আগে এরকম গ্রীষ্মে তিনি প্রায় একার হাতে আইপিএল ট্রফি রাজস্থান রয়্যালসকে তুলে দিয়েছিলেন। ২০০৭ সালের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপেও ওপেন করতে নেমে ১৫ রান করেছিলেন, চ্যাম্পিয়ন হয় ভারত।২০১১ সালে বিশ্বকাপ জয়ী ভারতীয় স্কোয়াডে তিনি ছিলেন। এবারের লড়াই খুব কঠিন ইউসুফ পাঠানের। তাঁর এতকালের জয়ের সঙ্গী ক্রিকেটার একাদশের কেউ পাশে নেই।গুজরাটের ভদোদরা থেকে এসে অধীরগড়ে এসে কাপ জেতা খুব কঠিন ও অনিশ্চিত – তবুও তৃণমূল কংগ্রেস আশাবাদী তাঁর হাত ধরে অধীর গড়ে পালাবদল হবেই। তৃণমূল আশাবাদী, এবার অধীর মিথ মুছে তৃণমূলের হয়ে কাপ জিতবেন ইউসুফ। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য মত প্রকাশ করেছেন শুভেন্দু অধিকারী। তিনি নির্মল সাহার জয়ী হওয়ার আশা প্রকাশের পাশাপাশি জানিয়ে রেখেছেন, বহরমপুরে অধীর চৌধুরীর এবার কোন আশা নেই। “অধীরবাবু তৃতীয় হবেন, ” বলেছেন শুভেন্দু। অর্থাৎ কংগ্রেসের চেয়ে, অধীর চৌধুরীর চেয়ে, তৃণমূলকেএগিয়ে রেখেছেন বিধানসভায় বিরোধী দলনেতা  শুভেন্দু অধিকারী। তাহলে কি পালাবদলের সম্ভাবনা রয়েছে বহরমপুরে? কি বলছে সমীকরণ?

বহরমপুর লোকসভা কেন্দ্রের মধ্যে রয়েছে বড়েয়া, কাঁদি, ভরতপুর, রেজিনগর, বেলডাঙা , নওদা ও বহরমপুর বিধানসভা কেন্দ্র। এই সাতটি বিধানসভা কেন্দ্রের মধ্যে চারটিতে তৃণমূল কংগ্রেস বিধায়ক, দুটিতে বিধায়ক কংগ্রেসের, বহরমপুর বিধানসভা কেন্দ্রে ২০২১ অভাবিত ফল করে জয়ী হয় বিজেপি। বিজেপির বহরমপুরে উত্থান দেখে সুস্পষ্ট যে এবারের লোকসভা ভোটে বহরমপুর লোকসভা কেন্দ্রে বিজেপির নির্মল সাহার সম্ভাবনা একেবারে খাটো করে দেখার কোনও কারণ নেই এবং বহরমপুরে বিজেপির উত্থান একটি অশনি সংকেত কংগ্রেসের কাছে। এর অন্যতম কারণ,বহরমপুর শহর ও লাগোয়া অঞ্চল নিয়ে গড়ে ওঠা বহরমপুর বিধানসভা কেন্দ্রে কংগ্রেসের মনোজ চক্রবর্তীর শোচনীয় পরাজয় এবং তৃতীয় স্থান প্রাপ্তি।অন্যদিকে,তৃণমূল যেহেতু বেশ কিছু বিধানসভা অঞ্চলে নিজেদের মজবুত রেখেছে সেখানে কংগ্রেসের অস্তিত্বও বিপন্ন হয়েছে। উদাহরণ হিসেবে কান্দির কথা বলা যেতেই পারে। এখানের বিধায়ক তৃণমূলের অপূর্ব সরকার। তিনি সহজে নিজের বিধানসভা কেন্দ্রে কংগ্রেসকে  লিড নিতে দেবেন না।২০১৯ সালে লোকসভা নির্বাচনে কাঁদিতে অধীর চৌধুরীর লিড ছিল। এবার পরিস্থিতি বদলেছেন ডেভিড নামে পরিচিত অপূর্ব সরকার। অপূর্ব সরকার ২০১৯ সালে এই শতকে প্রথমবার অধীর চৌধুরীকে কাঁটার টক্কর দিয়েছিলেন বহরমপুর  লোকসভা কেন্দ্রে। প্রথমবার মার্জিন এসে ঠেকে আশিহাজার ভোটে।২০১৪ সালে ইন্দ্রনীল সেন হেরেছিলেন ৩ লক্ষ ৫৭ হাজার ভোটে। অপূর্ব সরকার ইন্ডিয়া জোট গঠনের সময় ‘আমি নই,আমরা তে বিশ্বাসী” তত্ত্বের কথা বলেছিলেন। মূলত অধীর চৌধুরীর আপত্তিতে বঙ্গে কংগ্রেস -তৃণমূল জোট না হওয়ায় আবার অধীর চৌধুরীর তীব্র সমালোচনায় তিনি নামেন। পরিসংখ্যান বলছে  সময়ের সাথে সাথে অধীর চৌধুরীর লড়াই তীব্রতর হওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে। একদিকে বিজেপির উত্থান, অন্যদিকে অপূর্ব সরকার এবং  হুমায়ুন কবিরের  মত নেতাদের অধীর চৌধুরী বিরোধী অবস্থান। অপূর্ব সরকার জানিয়ে দিয়েছেন, এবার অধীর চৌধুরীকে কেউ রক্ষা করতে পারবেন না। তাঁর বক্তব্য, গতবারের মত বিজেপির সঙ্গে গাঁটছড়া বেঁধেও হার বাঁচাতে পারবেন না অধীর চৌধুরী। মাথায় রাখা প্রয়োজন, ২০১৯ সালে বিজেপি বহরমপুর লোকসভা কেন্দ্রে ১১ শতাংশ ভোট পায়।  বহরমপুর বিধানসভা কেন্দ্রে তারা ২০২১ সালে জয়ী। তৃণমূল কংগ্রেস তবুও প্রবল আত্মবিশ্বাসী কারণ এক ধাক্কায় যেমন ২০১৯ সালে ভোট এবং ভোট- মার্জিন কমে যায় অধীর চৌধুরীর, ঠিক সেভাবেই বিজেপি ভোট কাটছে মূলত কংগ্রেসের, এমনটাই মনে করছে তৃণমূল। কারণ লোকসভা ভোটে, বিভিন্ন ইস্যুকেন্দ্রিক মেরুকরণের পরে একদিকে বিজেপির ভোট জমা হওয়ার পাশাপাশি রাজ্যে বিজেপি বিরোধী ভোট মূলত তৃণমূলে রয়েছে বলে বিশ্বাসী তৃণমূল নেতৃত্ব। তৃণমূল যা বলছে,পরিসংখ্যানও সেদিকে কিছুটা হলেও ঝুঁকে আছে। তাহলে কি সত্যি পালাবদলের দিন এল?  বিজেপির ভোট কিছু বিধানসভা কেন্দ্রে বাড়লেও  রেজিনগরের মত জায়গায় ভোট সুইং কখনও বহরমপুর বিধানসভা কেন্দ্রের মত ৩৫ শতাংশ হওয়া সম্ভব নয়। এরকম চিত্র বহরমপুর লোকসভার বিভিন্ন বিধানসভা ক্ষেত্রে। পরিসংখ্যানে অত্যন্ত পরিষ্কার, তৃণমূল বিভিন্ন জায়গায় নিজেদের ভোটবাক্সে খুব বেশি ক্ষয় হতে দেয়নি। প্রথম বা দ্বিতীয় স্থানে তারা থেকেছে।  আর এই মেরুকরণে দিদি বনাম মোদি লড়াইকে জোরদার করতে আনা হয়েছে ইউসুফ পাঠানকে। সমীকরণ এত সরল নয়, তৃণমূল গুজরাটের ইউসুফ পাঠানকে নিয়ে এসেছে অধীর চৌধুরীকে হারাতে এমনটাই বলা হচ্ছে। এই বিষয় যেমন সত্যি, তেমন সত্যি এটাও যে তিনি বিজেপি বিরোধী শক্তির প্রতীক হয়ে উঠতে এসেছেন যাতে বিজেপি বিরোধী ভোট তৃণমূলের পক্ষে এককাট্টা থাকে। পরিষ্কার ভাবে এবং সুস্পষ্ট ভাবে,সংখ্যালঘু ভোট নিজেদের কাছেই রাখতে চায় তৃণমূল।রেজিনগর সহ একাধিক বিধানসভা কেন্দ্রের ভোটে তৃণমূলের এই অঙ্কের ফল মিলেছে। তৃণমূলের বিশ্বাস, কিছু হিন্দু ভোটও তারা টানতে পারবেন। সঙ্গে রয়েছে সংখ্যালঘু ভোট।

তৃণমূলের ভাবনা হয়তো পদ্মফুল শিবিরকেও ভোটে লড়ার রসদ দিচ্ছে।ভোট কাটাকাটির তত্বও বিজেপিকে হয়তো অক্সিজেন দিচ্ছে, বহরমপুরের বিগত বিধানসভার ফল হয়তো বিজেপিকে আশাবাদী করছে। শুভেন্দু আক্রমণ করছেন ইউসুফ পাঠানকে বহিরাগত তত্ব সাজিয়ে। বিজেপি ভাবতে শুরু করেছে যে , মেরুকরণ, মোদি এবং প্রার্থীর ভালোমানুষের তকমা বিজেপির অনুকূলে আশ্চর্য ভাবে পঞ্চাশ -পঞ্চাশ হিন্দু ও সংখ্যালঘু ভোটে বিভক্ত এই কেন্দ্রে ম্যাজিক ঘটাতে পারে।

ইউসুফ পাঠান  এসেই বহিরাগত থিওরিকে ওভার বাউন্ডারি মেরেছিলেন নরেন্দ্র মোদির ভিন রাজ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার তত্ত্ব তুলে। তিনি এবারের ভোটে পরিশ্রম করছেন, প্রথমে স্থানীয় তৃণমূলের বিরোধিতা পেলেও  এই মুহূর্তে জেলার সমস্ত তৃণমূল নেতা- নেত্রী এবং বিধায়ক তাঁর পাশে। ইউসুফ পাঠান  প্রার্থী না হলে অন্তত তিনজন তৃণমূলের হয়ে প্রার্থী হতে তোড়জোড় শুরু করেছিলেন। গোষ্ঠী কোন্দলের আশঙ্কায় জল ঢেলেছেন ইউসুফ। পাশাপাশি, ভালো সংখ্যায় সংখ্যালঘু ভোট পাওয়ার আশা রাখছে তৃণমূল। তৃণমূল মনে করছে অধীর চৌধুরীকে ধরাশায়ী করার ফর্মুলা তারা পেয়ে গিয়েছে। এই ভাবনার আরেকটি কারণ,২০১৯ সালে ডেভিড চারটি বিধানসভা কেন্দ্রে লিভ নিয়েও যে তিনটি বিধানসভা কেন্দ্রে অধীর চৌধুরীর কাছে হেরে দ্বিতীয় হন, তার একটি বহরমপুর যেখানে বিধানসভা ভোটে পদ্ম ফুটেছে ইতিমধ্যেই, বড়েয়া বাদ দিলে অন্যটি কাঁদি যার দায়িত্বে স্বয়ং ডেভিড।

অধীর চৌধুরী কি ভাবছেন? আগের বার লোকসভা ভোটে একাধিক বিধানসভা কেন্দ্রে  তাঁর আধিপত্য খর্ব হওয়ার পরে তাঁকে কার্যত হাহাকার করতে দেখা গিয়েছিল। বলেছিলেন, ভোটাররা তাঁকে ভুল বুঝেছে। এবার পরিস্থিতি আরও জটিলতর। বামেদের ওপরে ভরসা তাঁকে করতেই হচ্ছে। এই মুহূর্তে তৃণমূল কংগ্রেস যে তথাকথিত তাঁর গড় ভেঙে জয় আনতে মরিয়া তাও তিনি বিলক্ষণ জানেন। তবুও তিনি অধীর চৌধুরী। মুর্শিদাবাদ জেলার বেতাজ বাদশা তিনি। নখ-দাঁতের জোর কমলেও সিংহ যে সিংহই থাকে তা বোঝানোর মাহেন্দ্রক্ষন এবারের লোকসভা ভোট। হতে পারে, জিতবেনই অধীর চৌধুরী – একথা বলার মত তার অনুকূলে পরিসংখ্যান নেই এই মুহূর্তের নিরিখে। তবুও  ধার ও ভারে তিনি পিছিয়ে আছেন একথা বলারও উপায় নেই। ভোটদান শেষ না হওয়া জনপ্রিয় সদ্য প্রাক্তন ক্রিকেটার ইউসুফ পাঠান কি মিথ ভাঙতে পারবেন? ফলে, ভারতের চোখ বহরমপুরে, কাঁটার টক্করও বহরমপুরে!

 

About Post Author